Published : 27 Dec 2025, 01:01 PM
দল এগিয়ে যাচ্ছিল জয়ের দিকে আর গ্যালারিতে থাকা ইংলিশ সমর্থকরা উল্লাস করছিলেন গানে গানে। লেগ বাই বাউন্ডারিতে জয় নিশ্চিত হতেই সেই গান রূপ নিল গর্জনে। ধারাভাষ্যকক্ষ থেকেও ভেসে এলো চিৎকার, “অবশেষে… ৫ হাজার ৪৬৮ দিন, ১৫ বছর আর ১৮ টেস্ট পর অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট ম্যাচ জয় ইংল্যান্ডের…।”
ম্যাচের বয়স স্রেফ দুই দিন। কিন্তু ফয়সালা হয়ে গেল তাতেই। প্রথম দিনের ২০ উইকেট পতনের নাটকীয়তায় যে আভাস মিলেছিল, তা বাস্তবতার রূপ পেল শনিবার। সিরিজের প্রথম টেস্টের মতো চতুর্থ টেস্টও শেষ দুই দিনেই। পার্থক্য ম্যাচের ফলে। পার্থে জিতে অ্যাশেজ ধরে রাখার অভিযান শুরু করেছিল অস্ট্রেলিয়া, সিরিজ হেরে গেলেও মেলবোর্নে জিতে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হলো ইংল্যান্ডের।
বক্সিং ডে টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে ৪ উইকেটে হারাল ইংল্যান্ড।
অস্ট্রেলিয়াতে তাদের সবশেষ জয়টি ছিল ২০১১ সালের জানুয়ারিতে, সিডনিতে যে টেস্ট জিতে স্মরণীয় এক সিরিজ জয় নিশ্চিত করেছিল অ্যান্ড্রু স্ট্রাউসের দল।
সেই টেস্টের পর ১৮ টেস্টের ১৬টি ইংল্যান্ড হেরেছে, দুটি ড্র করেছে। অবশেষে একটি জয় তাদের ধরা দিল।
অস্ট্রেলিয়ায় চতুর্থবারের সফরে ১৮ টেস্ট খেলে প্রথম জয়ের স্বাদ পেলেন ইংল্যান্ডের ইতিহাসের সফলতম ব্যাটসম্যান জো রুট।
পার্থ টেস্ট শেষ হয়েছিল ৮৪৭ বলে। মেলবোর্নে খেলা হলো ৫ বল বেশি। অ্যাশেজে একই সিরিজে একাধিক টেস্ট দুই দিনে শেষ হলো ১৩৭ বছর পর!
মেলবোর্নের পেস-স্বর্গ উইকেটে ইংল্যান্ডের এই জয় সাজিয়ে দেন পেসাররা। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে ১৫২ রানে থামিয়েও লিড নেওয়া যায়নি ব্যাটিং ব্যর্থতায়। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে গুটিয়ে দেন তারা ১৩২ রানেই।
ব্রাইডন কার্স শিকার করেন চার উইকেট, অধিনায়ক বেন স্টোকস তিনটি।
তবু ১৭৫ রানের লক্ষ্য ছিল অনেক কঠিন। অস্ট্রেলিয়া লড়াই করেছেও বেশ। তবে আগ্রাসী শুরুর পর কয়েক দফায় হোঁচট খেলেও শেষ পর্যন্ত জিততে পেরেছে ইংল্যান্ড।
প্রথম ইনিংসে ৪২ রানের লিড পাওয়া অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় দিন শুরু করে বিনা উইকেটে ৪ রান নিয়ে। ওপেনিংয়ে নামানো স্কট বোল্যান্ডের চমক টেকেনি বেশিক্ষণ। তিনে নেমে জেইক ওয়েদেরল্ড বোল্ড হয়ে যান স্টোকসের বল ছেড়ে দিয়ে।
রান খরায় থাকা মার্নাস লাবুশেন ধরা পড়েন স্লিপে। রুটের নেওয়া ক্যাচ নিয়ে যদিও সংশয় তৈরি হয়েছিল। বারবার রিপ্লে দেখে আউট দেন তৃতীয় আম্পায়ার। তাতে স্পষ্টতই অসন্তুষ্ট ছিলেন লাবুশেন। সিরিজে প্রথম ইনিংসে ৬৫ রান করার পর বাকি ৫ ইনিংস মিলিয়ে তার রান ৪৯।
আরেক প্রান্তে রান বাড়ানোর কাজটি করছিলেন মূলত ট্রাভিস হেড। প্রতিকূল উইকেটেও নিজের মতোই ব্যাট করে এগোচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু ৪৬ রানে অসাধারণ এক ডেলিভারিতে তাকে বোল্ড করে দেন কার্স, যেটিতে ব্যাটসম্যানের করার ছিল সামান্যই।
এরপর এক প্রান্ত আগলে রাখেন স্টিভেন স্মিথ। কিন্তু অন্য প্রান্তে দাঁড়াতে পারেননি কেউ। শর্ট বলে শূন্য রানে ফেরেন উসমান খাওয়াজা, আলগা শটে উইকেট হারান ফর্মে থাকা অ্যালেক্স কেয়ারি।
স্মিথ আর ক্যামেরন গ্রিনের জুটির সময় একটু আশা দেখে অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু ১৯ রান করে বাজে শটে উইকেট বিলিয়ে দেন গ্রিন।
৩১ রানের সেই জুটিই অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের সেরা!
লোয়ার অর্ডারে লড়াই করতে পারেননি কেউ। অধিনায়ক স্মিথ অপরাজিত রয়ে যান ৩৯ বলে ২৪ রানে।
ব্যাটসম্যানদের দুঃস্বপ্নের উইকেটে ১৭৫ রানের লক্ষ্য সহজ ছিল না মোটেও। তবে বেন ডাকেট ও জ্যাক ক্রলির আগ্রাসী শুরু বিশ্বাস জোগায় ইংল্যান্ডকে। সপ্তম ওভারেই দলকে পঞ্চাশ রান এনে দেন দুজন। অতিরিক্ত মদ্যপানের অভিযোগে তদন্তের মুখে থাকা বেন ডাকেট সিরিজে প্রথমবার স্পর্শ করেন ৩০ রান।
২৬ বলে ৩৪ রান করা ডাকেটকে দুর্দান্ত এক ইয়র্কারে বোল্ড করে দেন মিচেল স্টার্ক।
ইংল্যান্ড চমক দেখায় কার্সকে তিনে নামিয়ে। তবে কাজে লাগেনি সেই ফাটকা। তাকে ফিরিয়ে চার বছর পর টেস্ট উইকেটের দেখা পান জাই রিচার্ডসন।
লাঞ্চের পর ইংল্যান্ডকে অনেকটা এগিয়ে নেন জ্যাক ক্রলি ও জেকব বেথেলের জুটি। ৪৭ রানের এই জুটিতেই অনেকটা নিশ্চিত হয় ইংলিশদের জয়।
ক্রলি ৩৭ রান করে বিদায় নেন স্কট বোল্যান্ডের বলে। ৪৬ বলে ৪০ রানের কার্যকর ইনিংস খেলে উসমান খাওয়াজার রিফ্লেক্স ক্যাচে ফেরেন বেথেল।
দলের জয় পর্যন্ত টিকতে পারেননি জো রুট ও বেন স্টোকসও। অস্ট্রেলিয়া লড়াই চালিয়ে যায়। তবে শঙ্কা উড়িয়ে জিতে যায় ইংল্যান্ডই।
প্রথম ইনিংসের ৫ উইকেটের সঙ্গে দ্বিতীয় দিনে ২টি যোগ করে ম্যাচের সেরা জশ টং।
টেস্টের প্রথম দিনে দর্শকের রেকর্ড হয়েছিল মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে। দ্বিতীয় দিনেও গ্যালারিতে ছিল রেকর্ড দর্শক। প্রথম তিন দিন মিলিয়েও দেড় লাখের বেশি দর্শকের রেকর্ড হবে বলে অনুমান ছিল ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার। কিন্তু তৃতীয় দিন ও বাকি দিনগুলি হারিয়ে গেল ব্যাটিং-প্রতিকূল উইকেট ও ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায়।
পার্থ টেস্ট দুই দিনে শেষ হওয়ায় ৫০ লাখ ডলারের মতো আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার। মেলবোর্নে সেই ক্ষতির অঙ্কটা লাফিয়ে বাড়বে আরও।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস: ১৫২
ইংল্যান্ড ১ম ইনিংস: ১১০
অস্ট্রেলিয়া ২য় ইনিংস: ৩৪.৪ ওভারে ১৩২ (আগের দিন ৪/০) (বোল্যান্ড ৬, হেড ৪৬, ওয়েদেরল্ড ৫, লাবুশেন ৮, স্মিথ ২৪*, খাওয়াজা ০, কেয়ারি ৪, গ্রিন ১৯, নিসার ০, স্টার্ক ০, রিচার্ডসন ৭; অ্যাটকিনসন ৫-১-২০-১, কার্স ১১-৩-৩৪-৪, টং ১১-২-৪৪-২, স্টোকস ৭.৩-১-২৪-৩)
ইংল্যান্ড ২য় ইনিংস: (লক্ষ্য ১৭৫) ৩২.২ ওভারে ১৭৮/৬ (ক্রলি ৩৭, ডাকেট ৩৪, কার্স ৬, বেথেল ৪০, রুট ১৫, ব্রুক ১৮*, স্টোকস ২, স্মিথ ৩*; স্টার্ক ১০-০-৫৫-২, নিসার ৮-১-৫৪-০, রিচার্ডসন ৫.১-১-২২-২, বোল্যান্ড ৯-১-২২-২)
ফল: ইংল্যান্ড ৪ উইকেটে জয়ী
সিরিজ: পাঁচ ম্যাচ সিরিজে অস্ট্রেলিয়া ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে
ম্যান অব দা ম্যাচ: জশ টং