ত্রিমুখী আক্রমণে দ্বিতীয় দিনের বিজ্ঞাপন তাইজুল-মিরাজ-নাঈম

সিলেট টেস্টে স্পিনারদের দারুণ বোলিংয়ে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে লিডের আশা জাগিয়েছে বাংলাদেশ।

শাহাদাৎ আহমেদ সাহাদশাহাদাৎ আহমেদ সাহাদসিলেট থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 29 Nov 2023, 02:45 PM
Updated : 29 Nov 2023, 02:45 PM

‘বাঁহাতিটা কষ্ট করে খেলছে, কতক্ষণ আর খেলবে…’- স্লিপ থেকে বলা নাজমুল হোসেন শান্তর কথাটি শোনা গেল স্টাম্প মাইকে। যে বাঁহাতি ব্যাটসম্যানকে নিয়ে বলছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক, সেই ডেভন কনওয়ে খেলতে পারেন স্রেফ আর এক ওভার। কনওয়ের মতো নিউ জিল্যান্ডের অন্যদেরও দিতে হয় এমন পরীক্ষা। নিখুঁত বোলিংয়ে তাদের বেশির ভাগেরই উপস্থিতি কঠিন করে তোলেন বাংলাদেশের স্পিনাররা। 

নতুন-পুরাতন দুই বলেই দারুণ বোলিংয়ে ৪টি করে উইকেট নিয়ে দিনের সেরা বোলার তাইজুল ইসলাম। স্রেফ ১টি করে শিকার ধরলেও সারা দিন দারুণ বোলিং করেন মেহেদী হাসান মিরাজ, নাঈম হাসানরা। হাত ঘোরানোর সুযোগ পেয়ে খণ্ডকালীন বাঁহাতি স্পিনার মুমিনুল হকও পান উইকেটের দেখা।

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ম্যাচের প্রথম দিন শেষেই মাহমুদুল হাসান জয় বলেছিলেন, লিড পাওয়ার জন্য স্পিনারদের দিকে তাকিয়ে থাকবেন তারা। পর দিন এই আস্থার পূর্ণ প্রতিদানই দিয়েছেন স্পিনাররা। তাদের সৌজন্যেই প্রথম ইনিংসে লিডের আশা জাগিয়েছে বাংলাদেশ। 

ম্যাচের দ্বিতীয় দিন সফরকারীদের ৮ উইকেটের ৭টি নিয়েছেন স্পিনাররা। ৮৪ ওভারের মধ্যে ৭৩টিই করেছেন তারা। উইকেটে সাহায্য যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে তাইজুল-নাঈমদের কার্যকরিতা। 

একাদশে পেসার স্রেফ একজন হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই নতুন বল নিতে হতো এক স্পিনারকে। সেই দায়িত্ব এবার পান মিরাজ। টানা ৯ ওভারের স্পেলে দুই ওপেনারের কঠিন পরীক্ষা নিয়ে কনওয়েকে ফেরান এই অফ স্পিনার। ছোট ছোট টার্নের সঙ্গে কখনও কখনও সোজা যাওয়া ডেলিভারিতে ল্যাথামকেও খুব একটা স্বস্তিতে থাকতে দেননি তিনি। 

মিরাজের আগেই অবশ্য উইকেটের কলামে নাম তোলেন তাইজুল। ত্রয়োদশ ওভারে প্রথম বোলিংয়ে এসে তিনি ফেরত পাঠান ল্যাথামকে। প্রথম সেশনের বাকি অংশ নির্বিঘ্নে কাটান কেন উইলিয়ামসন ও হেনরি নিকোলস। 

দ্বিতীয় সেশনে শরিফুল ইসলাম এই জুটি ভেঙে দেওয়ার পর বাকি অংশজুড়ে স্পিনারদের দাপট। উইলিয়ামসন ব্যাটিংয়ে নামার সঙ্গে সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক শান্ত বলতে থাকেন, ‘এটা (উইলিয়ামসনের উইকেট) তোমার তাইজুল… এটা তোমার।’

দিনের শেষ দিকে দারুণ ডেলিভারিতে তাইজুলই ফেরান সেঞ্চুরি করা উইলিয়ামসনকে। তবে দ্বিতীয় সেশনে তাকে আউট করার একাধিক সুযোগ তৈরি করেন নাঈম হাসান। প্রথমে তাইজুল, পরে শরিফুল ছেড়ে দেন ক্যাচ। 

গত বছরের মে মাসের পর প্রথমবার টেস্ট খেলতে নেমে নাঈমও ছিলেন বেশ কার্যকর। টানা এক জায়গা ধরে রেখে বোলিং করে যান তিনি। রান আটকে ব্যাটসম্যানকে হাঁসফাঁস করতে বাধ্য করার পরিকল্পনার অনেকটা বাস্তবায়ন করে দেন এবারের জাতীয় ক্রিকেট লিগে সর্বোচ্চ ৩৬ উইকেট পেয়ে দলে ফেরা অফ স্পিনার। 

বরাবরের মতোই টার্ন, বাউন্স ও ফ্লাইটের অনুপম প্রদর্শনী মেলে ধরেন তাইজুল। ম্যাচের দুই দিনে দুই দলের সাত স্পিনারের মধ্যে তিনিই উইকেট থেকে আদায় করে নেন সবচেয়ে বেশি টার্ন। দ্বিতীয় সেশনে টানা কয়েক ওভারে নিখুঁত টার্নে ব্যাটসম্যানকে বেকায়দায় ফেলেন বাঁহাতি এই স্পিনার। 

পুরোনো বলে ফ্লাইট দিয়ে বড় বড় টার্ন আদায় করা তাইজুল দিনের শেষ দিকে দ্বিতীয় নতুন বল নেওয়ার পর হয়ে ওঠেন আরও দুর্বার। প্রথম ওভারেই অফ স্টাম্পে পিচ করে লাইন ধরে রাখা ডেলিভারিতে বোকা বনে যান উইলিয়ামসন। বোল্ড হয়ে ড্রেসিং রুমে ফেরার সময় বারবার পেছন ফিরে যেন তিনি বোঝার চেষ্টা করেন ওই বলের কারিশমা! পরে ইশ সোধিকেও ফেরান তাইজুল।

৮৪ ওভারের মধ্যে তাইজুল একাই করেন ৩০টি। তার শিকার ৪ উইকেট। মিরাজ, নাঈম বা মুমিনুলও খরচ করেন ওভারপ্রতি তিনের কম রান। প্রথম দিন বাংলাদেশ নেয় ওভারপ্রতি সাড়ে তিনের বেশি রান।

বাংলাদেশের এমন বোলিংয়ের প্রায় পুরোটাই খুব কাছ থেকে দেখেন উইলিয়ামসন। ত্রয়োদশ ওভারে ব্যাটিংয়ে নেমে ২৮৯ মিনিট ক্রিজে থেকে ১০৪ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। চ্যালেঞ্জটা সবচেয়ে বেশি সামলাতে হয়েছে তাকেই। দিনের খেলা শেষে নিউ জিল্যান্ড ক্রিকেটের ভিডিও বার্তায় তাইজুল-মিরাজদের দারুণ প্রশংসা ফুটে উঠল তার কণ্ঠে।

“তারা (বাংলাদেশের স্পিনার) এই কন্ডিশনের সঙ্গে খুব পরিচিত। তারা খুব নিখুঁত। সবাই (ব্যাটসম্যানকে) ভিন্ন ভিন্ন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। আজকে প্রত্যেকে দুর্দান্ত ছিল। অনেক বেশিই চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করেছে তারা। এখানে খেলার ব্যাপারে বেশ ভালো শিক্ষাও তারা দিয়েছে।”

উইলিয়ামসনের মতো একই মূল্যায়ন লুক রনকিরও। নিউ জিল্যান্ডের ভারপ্রাপ্ত কোচ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তিন স্পিনারের ভিন্ন ভিন্ন ধরনের বোলিং কঠিন করেছে তার দলের ব্যাটসম্যানদের কাজ।

“নতুন বলে মেহেদী (মিরাজ) কিছু টার্ন পাচ্ছিল, কিছু আবার সোজা যাচ্ছিল। সারা দিনই তারা চাপ সৃষ্টি করেছে। নাঈমও অসাধারণ ছিল। চা বিরতির সময় এসে নাঈমের বোলিংয়ের বিপক্ষে পাল্টা আক্রমণের পথ খোঁজার চেষ্টা করছিল কেন (উইলিয়ামসন)।”

“প্রত্যেক স্পিনার ভিন্ন ধরনের বোলিং করে। আমার মতে, প্রতিপক্ষ হিসেবে এমন কিছু পাওয়া দুর্দান্ত। এমন ভিন্ন ভিন্ন বোলার আছে, যারা চাপ তৈরি করতে পারে, কাজটা কঠিন করে তুলতে পারে। এটাই টেস্ট ক্রিকেট, তাই নয় কি? শেষ দিকে দ্বিতীয় নতুন বলে দ্রুত কিছু উইকেটের মাধ্যমে তারা ফলও পেয়েছে। আমার মতে যা দিন বদলে দিয়েছে ।”

তাইজুল, মিরাজ, নাঈমদের এমন বোলিংয়ের পেছনে বড় অবদান বাংলাদেশের স্পিন কোচ রাঙ্গানা হেরাথের। এই টেস্ট দিয়েই শেষ হচ্ছে বিসিবির সঙ্গে তার চুক্তি। ফেরার আগে শিষ্যদের দারুণ বোলিংয়ের দিন সংবাদ সম্মেলনে তিনিও প্রশংসা করলেন তার স্পিনারদের।

“আমার মতে, সব স্পিনার দারুণ বোলিং করেছে। আমরা হয়তো আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করতে পারতাম। শেষ পর্যন্ত আমরা ৮ উইকেট নিয়েছি। আমাদের জন্য এটি ভাল দিন।”

সারা দিন তাইজুলের যে কোনো ভালো ডেলিভারির পর উইকেটের পেছন থেকে তাকে ‘রাঙ্গা’ ‘রাঙ্গা’ নামে ডেকে উজ্জীবিত করেন নুরুল হাসান সোহান। এমন ডাকের পেছনের গল্প জানা যায়নি। তবে দীর্ঘ দিন একসঙ্গে কাজ করার পর তাইজুলের সাফল্যে নিজের উচ্ছ্বাস আড়াল করলেন না হেরাথ।

“সাকিব খেলুক বা না খেলুক, তাইজুল সব সময় বড় ভূমিকা রাখে। একইসঙ্গে আক্রমণাত্মক ও রক্ষণাত্মক দায়িত্ব পালন করে। সে সবসময় নিজের লাইন-লেংথে নির্ভর করে। সে আমাদের মূল স্পিনার। সে অনেক চাপ তৈরি করেছে। তার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও বোঝাপড়া দারুণ। তাকে আজকে ৪ উইকেট পেতে দেখে আমি খুশি।”

তাইজুলের দিনে দুর্ভাগা নাঈমের কথাও ভোলেননি বাংলাদেশের স্পিন কোচ। 

“নাঈম বেশ কিছু দিন পর খেলতে নেমেছে। তো আজকে তার ভালো বোলিং গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সে বেশ ভালো চাপ সৃষ্টি করেছে। আমি দেখেছি, ভালো লাইন ও লেংথে বোলিং করে সে আত্মবিশ্বাস পেয়েছে। বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় একজন সে।”