আসিফ মাহতাবকে পুনর্বহালের দাবিতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ

নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে এক আলোচনায় সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান বইয়ের 'শরীফার গল্প' নামের একটি অংশ ছিঁড়ে আলোচনায় আসেন আসিফ মাহতাব।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 23 Jan 2024, 03:35 PM
Updated : 23 Jan 2024, 03:35 PM

পাঠ্যবই ছিঁড়ে আলোচনায় আসা খণ্ডকালীন শিক্ষক আসিফ মাহতাবকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী। 

মঙ্গলবার তারা ঢাকার মেরুল বাড্ডায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাসের অডিটোরিয়ামের সামনে বিক্ষোভ করেন। তাদের হাতে থাকা ব্যানারে লেখা ছিল ‘ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস কমিউনিটি’। 

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্ষোভের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসেন আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিরা। সেই আলোচনা 'ফলপ্রসূ না হওয়ায়' পরে তারা ক্লাস বর্জন এবং ব্র্যাকের পণ্য বর্জনের ডাক দেন। 

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি মারুফ বলেন, “আমরা ব্র্যাকের সব ধরনের কার্যক্রম, বিকাশ, ব্র্যাক ব্যাক, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি বয়কটের ডাক দিচ্ছি। সমকামিতার বিপরীতে আপনারা ভয়েস রেইজ করুন। নেশন ওয়াইড যেন এই সমকামিতার বিষয়ে সবাই সচেতন হয়, আমরা সেটা চাই।” 

আসিফ মাহতাব ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক ছিলেন। গত শুক্রবার রাজধানীতে নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে এক আলোচনায় সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান বইয়ের 'শরীফার গল্প' নামের একটি অংশ ছিঁড়ে ফেলে তিনি আলোচনায় আসেন। 

'শরীফার গল্প' নামের ওই অংশটি ‘তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া’ জনগোষ্ঠীকে নিয়ে একটি সচেতনতামূলক পাঠ।তবে আসিফ মাহতাবের দাবি, এর মাধ্যমে সমকামিতাকে ‘উসকে দেওয়া হচ্ছে’। 

এ নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় নানা আলোচনার মধ্যে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সোমবার এক বিবৃতি দিয়ে জানায়, আসিফ মাহতাবের সঙ্গে বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো চুক্তি নেই। 

বিবৃতিতে বলা হয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য ‘একটি নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তি এবং সহিষ্ণুতা বজায় রাখতে’ দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। 

এরপর আসিফ মাহতাব এক ফেইসবুক পোস্টে লেখেন, “আমাকে এইমাত্র ফোন করে জানানো হয়েছে যে, আমি যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর ক্লাস না নিতে না যাই। আমি জানি না হঠাৎ করে এই সিদ্ধান্ত তারা কেন নিল। আমাকে কোনো কারণ তারা দেয়নি।” 

এর প্রতিবাদে মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাড্ডা ক্যাম্পাসের সামনে জড়ো হয় একদল শিক্ষার্থী। তাদের হাতের ব্যানার-প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল ‘সে নো টু এলজিবিটিকিউ’, ‘উই ডোন্ট প্রমোট এলজিবিটিকিউ’। 

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় সমকামিতাকে সমর্থন করছে কিনা, দিনভর বিক্ষোভে সে প্রশ্নও রাখেন তারা। পরে সন্ধ্যায় তারা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। 

আলোচনা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকের সামনে বিক্ষোভকারীরা জানান, আসিফ মাহতাবের বিষয়ে তারা কথা বলেছেন, তবে কর্তৃপক্ষ তাদের দাবি মেনে নেয়নি। 

কর্মসূচির সাথে থাকা শিক্ষার্থী ফ্রান্সিস ফরিদ বলেন, “কোন সুস্পষ্ট জবাব দিতে পারেনি আমাদের। তারা পক্ষে কিংবা বিপক্ষে এ ব্যাপারে কিছু জানাতে পারেনি।” 

কর্মসূচির আহ্বায়ক মুনতাসীর মামুন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আসিফ মাহতাব স্যারকে চাকরিচ্যুতির জন্য আমরা আন্দোলনে নেমেছি। আমরা ব্র্যাকের অবস্থান জানতে চাই সমকামিতা নিয়ে। আমরা চাচ্ছি না কোনো ধরনের সমকামিতা ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে থাকুক।” 

বৈঠকের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, “ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ, প্রক্টর ও রেজিস্ট্রারসহ কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০-৭০ জন শিক্ষার্থীর আলোচনা হয়েছে। দুই ঘণ্টাব্যাপী ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। আলোচনার পরই শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে সরে যায়।” 

'শরীফার গল্প' এবং উদ্ভূত আলোচনা নিয়ে মঙ্গলবার সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকেও প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা। 

উত্তরে তিনি বলেন,“গল্পটি উপস্থাপনার ক্ষেত্রে যদি এমনভাবে উপস্থাপন হয়ে থাকে যে, যেখানে এই ধরনের বিভ্রান্তি এবং বিতর্ক সৃষ্টির প্রয়াস থেকে থাকে, তাহলে এ গল্পের উপস্থাপন পদ্ধতি পরিবর্তন করা যায় কি না এই বিষয়ে আমরা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করব। 

“মূল লক্ষ্য একটি জনগোষ্ঠীর প্রতি সহমর্মিতা, তাদের যে নাগরিক অধিকার রয়েছে, তাদের প্রতি সম্মান রেখে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে যদি ভিন্ন কোনো সুযোগ থেকে থাকে, সেখানে বিশেষজ্ঞরা মতামত দেবেন। এটা যেহেতু বিশেষায়িত বিষয়। আমরা পলিসি লেভেল মন্ত্রী সেটি নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না।” 

ধর্মের বিষয়ে একটি গোষ্ঠী ‘সবসময় এমন বিরোধিতা করে’ মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, “আমাদের দেশে একটি গোষ্ঠী নানান বিষয়ে ধর্মকে ব্যবহার করে হোক বা আমাদের ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে হোক, নানান সময়ে অরাজকতা করা বা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার একটি প্রবণতা তাদের মধ্যে আছে। গতবছরও সেটা ছিল। একটি সংগঠন থেকে কিছুদিন আগে আমার কাছে কিছু সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল, কওমি মাদ্রাসার কিছু শিক্ষকগণ এসেছিলেন। 

“সেখানে তারা দাবি করেছেন, এখানে ট্রান্সজেন্ডার শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে। বিভ্রান্তি সৃষ্টির বিষয়টি তারা আমাদের নজরে এনেছিলেন। তবে আমরা যখন আলোচনা করেছি তখন দেখেছি শব্দটা ট্রান্সজেন্ডার নয়, শব্দটা থার্ড জেন্ডার অর্থাৎ তৃতীয় লিঙ্গ। এটা আইনত স্বীকৃত যে, তারা তৃতীয় লিঙ্গ সমাজে হিজড়া নামে পরিচিত তারা। তারা আমাদের দেশের নাগরিক। তাদের নাগরিক অধিকার রয়েছে।”