একক ভর্তি পরীক্ষা চালু হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বকীয়তা, স্বাতন্ত্র্য ও স্বায়ত্তশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বলে মনে করেন শিক্ষামন্ত্রী।
Published : 05 Apr 2023, 09:39 AM
দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় মিলে সরকার যখন একটি ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে, ঠিক সেসময়ে গুচ্ছ ভর্তি পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে যেতে সরব হয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্বকীয়তা’ ধরে রাখতে আসন্ন ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষ স্বতন্ত্র ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে সোমবার তারা উপাচার্যের কাছে ধরনা দেন। ১০ এপ্রিলের মধ্যে সেই দাবি পূরণের ‘আশ্বাসও মিলেছে’ বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
একইদিন একক ভর্তি পরীক্ষা আয়োজন বিষয়ক নীতি-নির্ধারণী সভায় বসে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন- ইউজিসি। সেখানে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি।
এ পদ্ধতির বাস্তবায়ন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বকীয়তা, স্বাতন্ত্র্য, স্বায়ত্তশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বলে আশ্বস্ত করেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের স্বার্থেই একক ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গত ১৫ মার্চ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সভায় আলাদা ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে ২০ মার্চ গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের সঙ্গে সভায় ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ জানান, এই পদ্ধতি থেকে বের হয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
কী হতে পারে?
ইউজিসি সদস্য ও গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন, গত ২৭ ফেব্রুয়ারিই উপাচার্যদের সঙ্গে বৈঠকে বলা হয়েছিল- গত বছর যারা গুচ্ছে ছিল তাদের গুচ্ছে থাকতে হবে।
“২০ মার্চের সভায় আমরা ওই মেসেজটাই দিয়ে দিয়েছি।”
ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, যিনি এ সিদ্ধান্তে দ্বিমত না করে ‘সংকট আছে, চেষ্টা করছেন’-এমন কথা তুলে ধরেছিলেন বলে জানান অধ্যাপক আলমগীর।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, উপাচার্য তাদের আশ্বাস দিয়েছেন ৫ অথবা ৬ এপ্রিল অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সভায় নিজস্ব পদ্ধতির পরীক্ষার জন্য ভর্তি কমিটি গঠন করা হবে। ৮ এপ্রিল সিন্ডিকেটে সেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ৯ অথবা ১০ এপ্রিল ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।
সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে সোম ও মঙ্গলবার মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও উপাচার্য অধ্যাপক ইমদাদুল হকের সাড়া মেলেনি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, এ প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষালয়টির কোষাধ্যক্ষ কামালউদ্দীন আহমদ সোমবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সিন্ডিকেট যা বলবে, তাই হবে।”
তবে এই বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসা যে কঠিন হবে, সেটি গত ১২ মার্চ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছিলেন তিনি।
“যেহেতু মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী উনারা চান (গুচ্ছ ভর্তি), আমাদের তো এটার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।”
এ অবস্থায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এবারের ভর্তি পরীক্ষার কী হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা মিলছে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আবুল কালাম মো. লুৎফর রহমান মনে করেন, ইউজিসি গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে ‘সরকারের অভিপ্রায়’ বাস্তবায়নের যে পরামর্শ দিচ্ছে, তা এবার ধরে রাখতে গেলে কেবল আইন পরিবর্তনের মাধ্যমেই সম্ভব।
“কোন প্রক্রিয়ায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন করবে, সে ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এখন ইউজিসি বা মন্ত্রণালয় যদি চায়, তাহলে আইন পরিবর্তন করতে হবে। আগে হয়ত সুযোগ ছিল, কিন্তু একাডেমিক কাউন্সিলে সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ায় আর সুযোগ নেই। সিন্ডিকেট যদি মনে করে কিছুটা ব্যত্যয় ঘটাবে, তাহলে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে ব্যাক করতে হবে।”
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ৩৮ ধারা অনুযায়ী, অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশ ছাড়া শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।
ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নানও বলছেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছ পদ্ধতি থেকে বের হয়ে যেতে চাইলে ইউজিসির ধরে রাখার সুযোগ নেই।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইউজিসি আপিল করতে পারে, কিন্তু বাধ্য করতে পারে না। বাধ্য যদি করতে হয়, সেটা সরকার চেষ্টা করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আইনকানুন আছে, তাদের কোথাও কোথাও ক্ষমতা দেওয়া আছে।”
ইউজিসি চেয়ারম্যান গুচ্ছ পদ্ধতি থেকে ‘বের হয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই’ বললেও এ পদ্ধতির পরীক্ষা আয়োজক কমিটির অধ্যাপক আলমগীর বলছেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন তারা।
“এখনও সময় আছে, দেখা যাক উনারা কী সিদ্ধান্ত নেন। এটা উনাদের বিষয়।”
কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সমন্বিত বা গুচ্ছ ভর্তি পদ্ধতি থেকে বের হতে চাইলে ইউজিসির যে জোর করার সুযোগ নেই তা মানছেন অধ্যাপক আলমগীরও।
তার ভাষ্য, “জোর করে কাউকে রাখা যাবে না, জোর করা গেলে তো অন্যদেরও (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) আনা যেত।
“সিদ্ধান্ত তো তারাই নিয়েছে, তারা গুচ্ছে থাকবে। এখন কোনো ব্যর্থতার কারণে তারা যদি বের হয়ে যেতে চায়, তারা বলতে পারবে।”
আসন ফাঁকা থাকছে, সেশনজটের শঙ্কা
ভর্তীচ্ছুদের ভোগান্তি কমাতে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে গুচ্ছ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া শুরু হয়, এখন ২২টি বিশ্ববিদ্যালয় এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত আছে। শুরু থেকে গুচ্ছ পদ্ধতির নেতৃত্বে ছিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এখন বলছেন, গুচ্ছে যাওয়ার আগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ভর্তীচ্ছুদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হত। সেখানে এখন কয়েক মাস ধরে মেধা তালিকা দিয়েও আসন পূর্ণ করা যাচ্ছে না। এতে করে যোগ্য শিক্ষার্থী না পাওয়ার পাশাপাশি বিলম্বিত ভর্তি প্রক্রিয়ার কারণে সেশনজটেরও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হয় গত বছরের ১৩ অগাস্ট। শূন্য আসন পূরণ করতে ২১ জানুয়ারি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে নবম মেধা তালিকা প্রকাশ করা হয়। পরে সব আসন পূরণ না করেই ২২ জানুয়ারি স্নাতক প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হয়।
সাড়ে পাঁচ মাসেও আসন পূরণ না হওয়ায় তাৎক্ষণিক শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য ২৯ জানুয়ারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষ। তখন এ ইউনিটে ১৪০ টি, বি ইউনিটে ১৩টি এবং সি ইউনিটে ১টি আসন ফাঁকা ছিল।
ওই বিজ্ঞপ্তিতে ভর্তীচ্ছুদের গণহারে ডেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন পূর্ণ করা হয় ৩১ জানুয়ারি, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষাবর্ষের (২০২২-২৩) ভর্তি আবেদন শুরু হয় ২৭ ফেব্রুয়ারি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, তাৎক্ষণিক ভর্তিতে সব আসন পূর্ণ হলেও অনেকে ভর্তি বাতিল করে চলে যাচ্ছেন। এখন সবচেয়ে বেশি ৩২টি আসন ফাঁকা রয়েছে বিজ্ঞান এবং লাইফ অ্যান্ড আর্থ সায়েন্স অনুষদে।
এজন্য ভর্তি প্রক্রিয়াকে দায় দিচ্ছেন ওই দুই অনুষদের ভর্তি কমিটির সমন্বয়ক অধ্যাপক মো. শাহজাহান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যার ভালো মেরিট, সে সব বিশ্ববিদ্যালয়েই চান্স পাচ্ছে। কিন্তু একটির বেশি সিটে তো সে ভর্তি হবে না; তাও আসনগুলো ধরে রাখছে। যদি একটা সীমা নির্ধারণ করে দিত যে, এ কয়টা মাইগ্রেশন এরপর ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ফেলতে হবে, তাহলে সে বাধ্য হত স্থির হতে।
“সেটা বলা হয়নি, তাই সেটা চলতেই আছে। একটা ফিক্সড করে ফেললে তার হাত থেকে অনেকগুলো আসন বেরিয়ে আসত। তখন সেই পরিমাণ স্টুডেন্টকে ডাকা যেত। এভাবে দেরিটা হয়েছে।”