Published : 19 Oct 2023, 08:52 AM
বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রার পর ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও আবাসন সঙ্কটের সমাধান না হওয়ায় আক্ষেপ রয়ে গেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী কলেজটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রার পর দেড় যুগ পেরিয়ে এলেও শিক্ষার্থীদের সেই দাবি পূরণ হয়নি আজো।
কেরানীগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাসের কাজে ধীরগতি, নতুন হল নির্মাণ ও পুরনো হলগুলো সংস্কার না করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদাসীনতাকে দায়ী করছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা।
এমন পরিস্থিতিতে এ বছর বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালনের প্রস্তৃতি নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এবার দিবসটি পড়েছে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে। তাই দিবস পালন করা হচ্ছে বৃহস্পতিবার।
আবাসনের দাবি
২০০৫ সালের ২০ অক্টোবর এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাতটি অনুষদের আওতায় ৩৬টি বিভাগ এবং দুটি ইনস্টিটিউটে পড়ছেন প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থী।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রার শুরুর পর থেকেই ছাত্রাবাসসহ অন্যান্য সুবিধা না থাকায় আন্দোলন করে আসছিলেন শিক্ষার্থীরা।
লাগাতার আন্দোলনের পর ২০১৪ সালে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছাত্রী হল নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এটিই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র হল। লিয়াকত এভিনিউয়ের সেই হলে ২০২২ সালের মার্চে ৬২৪টি আসনের বিপরীতে ১২০০ জন ছাত্রীর থাকার ব্যবস্থা হয়।

শিক্ষার্থীদের আবাসনসহ নানা সংকট সমাধানে ২০১৯ সালের ৯ অক্টোবর কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়ায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস স্থাপনে ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়নের জন্য প্রকল্প অনুমোদন করে একনেক।
প্রায় ২০০ একর জমিতে এক হাজার ৯২০ কোটি ৯৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকার এ প্রকল্প ২০২০ সালের অক্টোবরের মধ্যে বাস্তবায়ন করার কথা ছিল।
তবে নতুন ক্যাম্পাসের ২০০ একর জমির মধ্যে ২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ১৮৮ দশমিক ৬০ একর জমি বুঝিয়ে দেয় ঢাকা জেলা প্রশাসন। চলতি বছর বাকি জমিও বুঝে পায় বিশ্ববিদ্যালয়। তবে এখনো শেষ হয়নি সীমানপ্রাচীরের কাজও।
২০১৪ সালে হল আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শিক্ষার্থীদের আবাসনের ব্যবস্থা হোক, এটা নিয়ে তাদের সদিচ্ছার অভাব আছে। তারা সরকারের সাথে সেভাবে যোগাযোগ মেইনটেন করে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না, যাতে আবাসন সঙ্কট দূর হয়। সরকার ফান্ড দিয়েছে কিন্তু কাজটা তো করে দেবে না, কাজটা বিশ্ববিদ্যালয়কেই করতে হবে।
"শিক্ষকদের নেতৃত্বে যারা আছেন, প্রশাসন, তারা শুধু নিজেদের বিষয় নিয়েই ভাবেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্কট নিয়ে ভাবেন না।"

স্নাতক চূড়ান্ত পর্যায়ের শিক্ষার্থী কামরুল হাসান বলেন, “এমন ধীরে কাজ হয় তা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে দেখিনি; শুধু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েই তা দেখছি।
"আমরা যে কী কঠিন জীবনযাপন করি পুরান ঢাকার মেসে, তা কেউ আন্দাজ করতে পারবে না। জানি না এখান থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তি কবে মেলবে। শুধু শুনি হল হবে, আর হয় না। আর নতুন হল তৈরি করতে সময় লাগলে, পুরাতন হলগুলাওতো সংস্কার করতে পারে।"
বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন শিক্ষার্থী ফাহাদ হাসান বলেন, "আমার ভাইও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। তখন থেকেই শুনছি নতুন ক্যাম্পাসে হল হবে। কিন্তু এখন আমারও এসে মেসে থাকতে হচ্ছে। স্যারদের কাছে দাবি জানাই, দ্রুত যেন হল নির্মাণ করা হয়। এভাবে থাকা যায় না।”
স্নাতক তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার বলেন, "আমাদের একটা হল হয়েছে ঠিকই। কিন্তু এখনও সবার থাকার ব্যবস্থা হয়নি। আশা করি আমাদের এ দাবি দ্রুতই বাস্তবে পরিণত হবে।"
বর্তমানে ছাত্রদের আবাসন সঙ্কটকে সবচেয়ে বড় বলে মানছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির কোষাধ্যক্ষ কামালউদ্দীন আহমদও।
“এ সমস্যাটা যদি দূর করা যায় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়টি আরো উন্নত হবে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও এরকম সুবিধা ভোগ করেন। শিক্ষকরা চিন্তা করবেন, গবেষণা করবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাস্তাতেই তো শিক্ষকদের সব সময় চলে যায়।"

এ সমস্যা মোকাবেলা করতে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, "দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ আমরা অনেকটা এগিয়ে রেখেছি। আগামী বছরের মাঝামাঝিতে স্ট্রাকচারাল ডিজাইন শেষ করা যাবে। আগামী দুই বছরে এক-দুইটা হল নির্মাণ শেষ করার টার্গেট আমাদের।"
দ্রুত নির্মাণ শেষ করতে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তিনি।
তিনি বলেন, "নির্বাচনের পর আমরা সম্মীলিতভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে চাই। কীভাবে দ্রুত শেষ করা যায়, এটার জন্য একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার। ফাইল চালাচালি করে, সচিবালয়ে দৌড়াদৌড়ি করে এ কাজ শেষ করতে অনেক সময় লাগবে।"

পুরনো হল
পুরান ঢাকার বিভিন্ন পরিত্যক্ত বাড়িতে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থীরা যেসব ছাত্রাবাস তৈরি করেছিলেন, ১৯৮৫ সালের পর থেকে সেগুলো একে একে স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে চলে যেতে থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের কয়েক দফা আন্দোলনের মুখে হল উদ্ধারে সরকার একাধিক কমিটি গঠন করলেও বেদখল হওয়া ১১টি হলের মধ্যে দুটি ছাড়া বাকিগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
অর্ধযুগের বেশি সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী ও কর্মচারী এসব পুরনো ভবনে থাকলেও কোনোটিই বসবাসের উপযোগী নয়।
হল উদ্ধারে নেতৃত্ব দেওয়া সাবেক ছাত্রনেতারা বলছেন, শিক্ষার্থীদের তীব্র আবাসন সংকট থাকার পরও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় এসব স্থাপনার উন্নয়ন হয়নি।
আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, সরকারের বরাদ্দ ও নির্দেশনা ছাড়া হলগুলোর পরিকল্পনায় যেতে পারছেন না তারা।