Published : 19 Jan 2025, 08:30 PM
পাঠ্যবই থেকে বাদ দেওয়া ‘আদিবাসী’ শব্দযুক্ত চিত্রকর্ম ফেরাতে ও আদিবাসীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছে ‘বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ’।
রোববার শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে এসব দাবি জানানো হয়।
সমাবেশে বক্তারা হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার এবং আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানান।
‘বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামে’র তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপায়ন খীসার সঞ্চালনায় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের সভাপতিত্বে সমাবেশে ৬ দফা দাবি তুলে ধরা হয়।
এর মধ্যে এনসিটিবির সামনে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নাগরিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার দ্রুত উচ্চ পর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত ও জড়িতদের শাস্তি, আহতদের রাষ্ট্রীয় খরচে চিকিৎসা, জড়িতদের পেছনে থাকাদের বের করে আইন অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা, পাঠ্যপুস্তকে আদিবাসীদের যথাযথ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কিত অধ্যায় সংযুক্তের দাবি জানানো হয়েছে।
চিত্রকর্ম প্রত্যাহারের ফলে ‘জুলাই অভ্যুত্থানকে অসম্মানিত করার প্রচেষ্টা’ হয়েছে তুলে ধরে জড়িতদের ছাত্র-জনতার কাছে ক্ষমা চাওয়া, চিত্রকর্ম পুনঃস্থাপন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও হামলা প্রতিরোধ করতে না পারার ব্যাখ্যা দেশবাসীর কাছে তুলে ধরার আহ্বানও জানানো হয়েছে সমাবেশ থেকে।
সমাবেশে গণফোরামের সভাপতি পরিষদের সদস্য সুব্রত চৌধুরী বলেন, “এখানে চারিদিকে সাঁজোয়া যান। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পরে এমন দৃশ্য দেখতে পারব, তা কখনো কল্পনা করি নাই। এখানে আমাদের নিরাপত্তা নেই।”
‘স্টুডেন্ট ফর সভরেন্টি’কে লাঠিয়াল বাহিনী আখ্যা দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে অতীতের সরকারের মতো লাঠিয়াল বাহিনীর ব্যবহার করা চলবে না। এটি করে অতীতেও কেউ টিকতে পারেনি, আপনারাও পারবেন না।”
সংবিধান সংস্কারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “সংবিধানের যে চার মূলনীতি ছিল, সেটাই থাকবে। অধ্যাপক রীয়াজ বলেছেন, ‘আমরা সবাই এক’, তার কথা ও কাজে মিল পাচ্ছি না। এ দেশের তরুণরা যে গ্রাফিতি এঁকেছে সেটাই বাংলাদেশের ইতিহাস। সেটি মুছে ফেলা যাবে না। যারা বলেছিলেন সংবিধান ছুঁড়ে ফেলতে হবে, পুনর্লিখন করতে হবে সেটি হবে না, দয়া করে আগুন নিয়ে খেলবেন না।”
সমাবেশে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সহ সাধারণ সম্পাদক গজেন্দ্রনাথ মাহাতো বলেন, “বাংলাদেশের বাকি সব জেলা সিভিল প্রশাসনের হাতে থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনও সেনা শাসন চলছে। কোথায় কোথায় বৈষম্য হচ্ছে সেটা এই সরকারের নজরে আছে কি না, আমরা বুঝতে পারছি না। তারা আসলে কী বৈষম্য দূর করবেন, সেটাও আমাদের ধারণার বাইরে।
“আন্দোলনরত আদিবাসীদের ওপর যে হামলা হয়েছে, তা নিয়ে সরকারের কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা আমরা দেখতে পেয়েছি। আমাদের মনে হয়, প্রশাসনের কিছু লোকও এর সঙ্গে জড়িত।”
আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অলীক মৃ বলেন, “সংক্ষুব্ধ ছাত্র জনতার আন্দোলনে ‘স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি’র হামলার দিন পুলিশের ভূমিকা নিষ্ক্রিয় ছিল না কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিমুখে পদযাত্রায় আবার পুলিশ হামলা চালায়। লাঠিচার্জ ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে। আমরা মনে করি, এই রাষ্ট্র ও সরকার ইচ্ছে করে আমাদের ওপর হামলা করিয়েছে।”
“এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী রাখা যাবে না, সেই রকম একটা পরিস্থিতি তারা সৃষ্টি করছে। যারা এ দেশের বৈচিত্র্যকে নষ্ট করতে চায়, তারাই আজকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করতে চায়।”
সমাবেশে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “স্টুডেন্ট ফর সভরেন্টিকে আপনারা অনেকে ভূঁইফোঁড় সংগঠন বলছেন, তারা ভূঁইফোঁড় না, তারা একটি ‘পরিকল্পিত সংগঠন’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের কাছ থেকে শুনেছি, এই সংগঠনের নেতারা সেই মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধের সংগঠনের নেতারাই।”
দীপায়ন খীসা বলেন, “ড. ইউনুস বলেন, আমাকে নিয়োগদাতা হলো শিক্ষার্থীরা। এই শিক্ষার্থীদের একজন রূপাইয়া শ্রেষ্ঠা আন্দোলনে মোহাম্মদপুরের পিটুনি খেয়েছিল, এখন মতিঝিলের পিটুনি খাচ্ছেন। এর মাধ্যমে মনে হচ্ছে ডক্টর ইউনুস শিক্ষার্থীদের ভুলে যাচ্ছেন।”
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, “স্বাধীন দেশে ‘জাতীয়তাবাদ’ কিংবা ‘উগ্র জাতীয়তাবাদ’ এক ধরনের উগ্রতা। ১৪ জানুয়ারির হামলায় রুপাইয়া শ্রেষ্ঠাসহ আমার সাংবাদিকতা বিভাগের ৩ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। হকিস্টিক ও স্ট্যাম্পের মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে সহিংসতা তো পতাকারও অবমাননা।”
“৫ অগাস্টের পর ২ হাজার ৬১ স্থানে সংখ্যালঘুদের বাড়ি ঘরে আক্রমণ হয়েছে। তারা আতঙ্কে থাকেন, কখন তাদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, কখন ধর্ষিতা হতে হয়। এটা বোঝার জন্য সংবেদনশীল মন প্রয়োজন, বর্তমান সরকার প্রধানের মধ্যে সেরকম সংবেদনশীলতা আমরা লক্ষ করছি না,” ভাষ্য অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের।
বিভিন্ন দেশের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা তাদেরকে আদিবাসী বলছি, আদিবাসিন্দা নয়। ইতিহাস পড়লে জানা যাবে, বাঙালিদেরও অনেক আগে কয়েকটি জাতিগোষ্ঠীর বসবাস ছিলো এ দেশে। এরা আদিবাসিন্দাও বটে, তবে তারা সেটা দাবি করছে না।”
এছাড়াও সমাবেশে সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খান, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, ঢাবির নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন, ঢাবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম বক্তব্য রাখেন।