বুয়েটে ‘সহাবস্থান’ চায় ছাত্রদল

“ছাত্রদল একটি গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠন হিসেবে সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাজনীতি চর্চা এবং ক্যাম্পাসগুলোতে সকল রাজনৈতিক দলের সহাবস্থানে বিশ্বাসী,” বলেন ছাত্রদল সভাপতি।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 April 2024, 11:23 AM
Updated : 3 April 2024, 11:23 AM

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্ররাজনীতি নিয়ে দ্বিমুখী অবস্থানের মধ্যে ক্যাম্পাসে ‘ছাত্র সংসদ নির্বাচন ও রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনগুলোর সহাবস্থানের’ দাবি জানিয়েছে ছাত্রদল।

বিএনপির এই ছাত্র সংগঠনটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেছেন, “জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এখন দেশের গণতন্ত্রকামী ছাত্র-জনতার কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছাত্র সংগঠন। আমরা বুয়েটসহ দেশের সকল ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচন ও সহাবস্থান দাবি করছি।

“ছাত্রদল একটি গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠন হিসেবে সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাজনীতি চর্চা এবং ক্যাম্পাসগুলোতে সকল রাজনৈতিক দলের সহাবস্থানে বিশ্বাসী। এটাই আমরা চাই।”

বুয়েটের ছাত্ররাজনীতি নিয়ে আলোচনার মধ্যে ঢাকার সেগুন বাগিচায় সাগর-রুনি হলে ছাত্রদলের অবস্থান তুলে ধরেন সভাপতি রাকিব।

বুয়েট শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে হলেও সেখানে ছাত্ররাজনীতির পক্ষেই কথা বলেন ছাত্রদল সভাপতি। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গেও তিনি একাত্মতা পোষণ করেন।

রাকিবের ভাষ্য, বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ক্যাম্পাসে ‘অপরাজনীতির বিরুদ্ধে’ তাদের চলমান আন্দোলনের প্রতি ছাত্রদল সংহতি প্রকাশ করছে।

“আমরা আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু আমাদের রাজনীতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্যে, সাধারণ জনগণের জন্য। আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। বুয়েটের ক্যাম্পাসে ‘ছাত্রলীগের আধিপত্যবাদকে কেন্দ্র করে’ সাধারণ শিক্ষার্থীদের যে মনোভাব গড়ে উঠেছে, ‘অপরাজনীতির বিরুদ্ধে’ যে জনমত গড়ে উঠেছে সেটির পক্ষে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।”

বুয়েটের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ‘ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে’; সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রদলের সংহতি কেন- এমন প্রশ্নে সভাপতি বলেন, “বুয়েট ক্যাম্পাসে কী ধরনের রাজনীতি চর্চা হবে সেটি বুয়েটের শিক্ষার্থীরা সিদ্ধান্ত নেবে।”

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর বুয়েটের শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র আবরার ফাহাদকে রাতে ছাত্রলীগের এক নেতার কক্ষে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। সেই ঘটনায় ক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে বুয়েট। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বুয়েটে নিষিদ্ধ হয় ছাত্র রাজনীতি। এরপর থেকে গত সাড়ে চার বছর প্রকৌশল শিক্ষার এই বিদ্যাপীঠে ছাত্র সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধই ছিল। এর মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতিসহ একদল নেতাকর্মী বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলে নতুন করে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা।

ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ নেতাদের সমাগম ঘটানোর কারণ হিসেবে পুরকৌশল বিভাগের ২১তম ব্যাচের ছাত্র ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ইমতিয়াজ হোসেন রাহিমের হলের সিট বাতিল করা হয়। এরপর বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি ফেরানোর দাবিতে পাল্টা কর্মসূচি দেয় ছাত্রলীগ।

বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্যে সোমবার বুয়েটে ছাত্র রাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ হোসেন রাহিমের দায়ের করা রিটের শুনানির পর হাই কোর্ট বুয়েটে রাজনীতি নিষেধাজ্ঞার আদেশ স্থগিত করে।

এর দুদিন পর সংবাদ সম্মেলন করে বুয়েটে ‘সুস্থ ধারার ছাত্র রাজনীতির পক্ষে’ নিজেদের অবস্থান জানাল ছাত্রদল।

‘সুস্থ ধারার ছাত্র রাজনীতি’

ছাত্রদল রাজনীতির বিপক্ষে নয় জানিয়ে সংগঠনটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম বলেন, “আমরা সুস্থ ধারার ছাত্র রাজনীতির পক্ষে। কিন্তু গত ১৬ বছর ধরে ছাত্রলীগ যে ধরনের অপরাজনীতি প্রতিষ্ঠা করেছে জবরদখলভাবে, সেখানে তো অন্য কোনো বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোর কোনো দায়ভার নেই। বিশেষ করে ছাত্রদল তো একেবারেই নেই।

“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হলগুলোতে আমাদের একজন কর্মীকেও থাকতে দেওয়া হয় না। সেহেতু এই হলগুলোকে গেস্টরুম নির্যাতন, ক্যাম্পাসে চাঁদাবাজি এগুলোর সঙ্গে বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে ন্যূনতম কোনো দায়ভার নেই, কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আমরা অপরাজনীতির বিপক্ষে।”

বুয়েটের রাজনীতির প্রসঙ্গে রাকিব বলেন, “বুয়েটে ছাত্রলীগের কার্য্ক্রম চালু করার পদক্ষেপ প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ। সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই কারণে শঙ্কিত যে ছাত্রলীগের কার্য্ক্রম পুনরায় চালু হলে তাদেরকে পড়াশোনা এবং ক্লাস পরীক্ষা বাদ দিয়ে ছাত্রলীগের মিছিল-মিটিং, গেস্ট রুমে হাজিরা দিতে হবে। তাদের কর্মসূচি না গেলে শারীরিকভাবে নির্যাতিত হতে হবে। যে কোনো মুহূর্তে তাদের যে কারো জীবন ছাত্রলীগের নির্যাতনে শহীদ আবরারের মত মর্মান্তিক পরিণতি নেমে আসতে পারে।”

ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, “আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পরে একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ থাকবে। এটির পরিপ্রেক্ষিতে আদালত যে রায় দিয়েছে আমরা আদালতের রায়ের প্রতি গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল। আমরা মনে করি যে, আদালত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। কিন্ত বুয়েটে রাজনীতি থাকবে কি থাকবে না, ছাত্র লীগের রাজনীতি চলবে কি চলবে না, এই সিদ্ধান্ত বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা নেবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।”

বুয়েটে ছাত্রদল কমিটি দেবে কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “সেখানকার কমিটির বিষয়ে সেখানকার শিক্ষার্থীরাই নির্ধারণ করবে। তারা যদি মনে করে, তারা যদি আমাদেরকে স্বাগত জানায়, আমরা সেখানে সাংগঠনিক কর্ম তৎপরতা বাড়াব।”

আরেক প্রশ্নে জবাবে ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম জানান, বুয়েটের দীর্ঘদিন ধরে তাদের কোনো কমিটি নেই।

“ওই ঘটনার (আবরার হত্যাকাণ্ড) পাঁচ-ছয় মাস আগে পাঁচজনের একটি কমিটি ছিল, এখন তাদের কোনো কার্য্ক্রম নেই।”

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহিয়া, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম, সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান, দপ্তর সম্পাদক মোহা. জাহাঙ্গীর আলম, প্রচার সম্পাদক শরিফ প্রধান শুভ উপস্থিত ছিলেন।