Published : 17 Apr 2026, 08:20 AM
স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধুর নামে বছর ছয়েক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, ক্ষমতার পালাবদলে সেই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে।
আর সমাজে নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠা নিয়ে শিক্ষালয়টিতে যে গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে, সেটির নাম থেকে ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা’ বাদ দিয়ে নতুন নাম রাখা হয়েছে; সেই সঙ্গে স্থবির রাখা হয়েছে এর কার্যক্রম।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর পিস অ্যান্ড লিবার্টি’। বঙ্গবন্ধুর জীবন, দর্শন, রাজনীতি, সমাজ নীতি এবং বাঙালি জাতির পরাশক্তির হাত থেকে মুক্তি লাভ ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তার অবদান চর্চায় এটি প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৪টি ‘বঙ্গবন্ধু বক্তৃতামালা’ আয়োজন করে এ ইনস্টিটিউট। এর মধ্য ১২টি বক্তৃতার সংকলন প্রকাশ করা হয়। বাকি ১২টি বক্তৃতা নিয়ে ২০২৪ সালে আরেকটি বই প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে তা আর আলোর মুখ দেখেনি।
বঙ্গবন্ধুর জীবন, কর্ম এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি ও স্বাধীনতার ধারণার ওপর আগ্রহী গবেষকদের জন্য এমফিল এবং পিএইচডি প্রোগ্রাম পরিচালনার উদ্যোগ ছিল, তবে তা বাস্তবায়ন হয়নি। এ ইনস্টিটিউট প্রবর্তন করেছিল ‘বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক’।

ওই বছরই ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন’ ও ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলন’ করার কথাও ছিল। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে ইনস্টিটিউটে পরিচালক না থাকায় সেসব উদ্যোগ আর আলোর মুখ দেখেনি। প্রতিবছর গবেষণা বরাদ্দ হলেও সেই টাকা ফেরত গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাগারে।
হিসাব পরিচালক দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২০২২ অর্থবছর থেকে বঙ্গবন্ধু গবেষণা ইনস্টিটিউটকে গবেষণা বাজেট দেওয়া শুরু হয়। সেই বছর বরাদ্দ পাওয়া ৮ লাখ টাকার মধ্যে ব্যয় হয়েছিল আড়াই লাখ টাকার মতো। পরের অর্থবছরে সমপরিমাণ বরাদ্দ থাকলেও তা ব্যবহার করা হয়নি। ওই বছর একটি ব্যাংকের অনুদানে চলে কার্যক্রম। এরপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যয় হয় সাড়ে ৪ লাখ টাকার মতো।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইনস্টিটিউটে নতুন কাউকে পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া না দেওয়া হলেও আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়। ২০২৪-২৫ ও ২৫-২৬ অর্থবছরে ৩০ লাখ টাকা করে বাজেট দেওয়া হলে কার্যক্রম না থাকায় তা ফেরত গেছে।

বঙ্গবন্ধু ইনস্টিটিউটকে দুবছর ধরে ‘ফেলে রাখা’কে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে বর্ণনা করেছেন সেখানকার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ফকরুল আলম।
তার কথায়, “এভাবে একটা গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে ফেলা রাখা অন্যায়। আমি শুধু একটা কথায় বলতে চাই, দুঃখজনক।”
সেখানকার গবেষণাকর্মের সঙ্গে এক সময়ে সম্পৃক্ত কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা রাজনৈতিক বাস্তবতায় কথা বলতে চাননি।
কেবল একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, “বাংলাদেশ নামের সাথে বঙ্গবন্ধু শব্দটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাকে ছাড়া এ দেশকে কল্পনা করা যায় না।
“সেখানে এভাবে তার নাম থাকায় একটা গবেষণা ইনস্টিটিউট অকেজো ফেলে রাখা প্রশাসনের প্রতিহিংসামূলক আচরণকে প্রতিফলিত করে।”
তিনি এও বলেন, “কারোর যদি বঙ্গবন্ধুকে পছন্দ না হয়, তাহলে কেন পছন্দ করছে না—সেটা নিয়েও গবেষণা হতে পারে। এভাবে একটা ইনস্টিটিউট নিষ্ক্রিয় থাকা শুধু প্রতিহিংসার প্রতিফলন না, এটা রাষ্ট্রীয় অর্থেরও অপচয়।”

যোগাযোগ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বীর আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “একটা সরকার গেলে আরেক এসে বিগত সরকারের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়, বাদ দিয়ে দেয়—এটা তো সবারই জানা। সেই আগের মত হিস্ট্রি রিপিট হচ্ছে; নতুন কিছু না।”
তিনি বলেন, “যারা এরকম ইনস্টিটিউশন বানায়, তাদের মাধ্যমে এক ধরনের সস্তা মানসিকতা কাজ করে। তারা কখনো প্রতিষ্ঠান বানানোর আগে চিন্তা করে না, এটা সাসটেইনেবল কি না। একটা দলীয় নাম দিয়ে কিছু একটা বানিয়ে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় করে। এর পরিণতি তো দেখতেই পাচ্ছেন।
“তাই বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান দাঁড়ায়নি। সবাই নিজের মত করে এসে দলীয়করণ করতে চায়; যেটা নিয়ে আগের সরকার ও বর্তমান সরকারের কোনো পার্থক্য নেই।”
বাজেট বরাদ্দ দিয়েও কেন কোনো কাজ হয়নি, এ প্রশ্নের উত্তরে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “প্রথমত সেখানে যে বাজেটটা দেওয়া হয়েছে, তা তো বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই আছে। এখন সেখানে পরিচালক না থাকলে কাজ করবে কীভাবে? আগে যিনি উপাচার্য ছিলেন, তিনি সেখানে পরিচালক দেননি।
“এখন নতুন উপাচার্য মহোদয় এসেছেন, তিনি বিবেচনা করবেন।”
ওয়েবসাইটের সব তথ্য গায়েব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে বঙ্গবন্ধু ইনস্টিটিউটের পাতা সচল থাকলেও সব তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, ইনস্টিটিউটের নোটিস থেকে শুরু করে বক্তৃতাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের তথ্য ওয়েবসাইটে মিলত। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেসবের আর পদচিহ্ন নেই।

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেলের পরিচালক অধ্যাপক মোসাদ্দেক হোসেন কামাল তুষার বলেন, “আমাদের ইনস্টিটিউট ও সেন্টারগুলোর অ্যাডমিনদের ডোমেইন অ্যাকসেস দেওয়া আছে। এখন সেখান থেকে তারা চাইলে পরিবর্তন করতে পারেন। এসব বিষয় আইসিটি সেল দেখে না।”
বঙ্গবন্ধু ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক আবুল বারকাত কারাগারে থাকায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
দুবছর ধরে স্থবরিতা, নেই কোনো কর্মকর্তাও
ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক আবুল বারকাত গত বছরের জুলাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার পর নতুন করে কাউকে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার আগেও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম এক ধরনের স্থবির হয়ে পড়েছিল।
হিসাব পরিচালকের বাজেট বই অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ ইনস্টিটিউটের বেতন বাবদ ব্যয় দেখাচ্ছে ২১ লাখ ৯৩ হাজার। একজন গবেষক বাদে সেখানে বর্তমানে কেউ নেই।
ইনস্টিটিউটে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলেন, তাদের বদলি করে দেওয়া হয়েছে অন্য দপ্তরে। ফলে পুরো ইনস্টিটিউটে এখন শূন্যতা বিরাজ করছে।

কর্মকর্তাদের কেন বদলি করা হয়েছে, জানতে চাইলে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা আসলে প্রয়োজনের ভিত্তিতে কোথায় লোক সংকট আছে, সেটা দেখেছি। এ ইনস্টিটিউটে যেহেতু কাজ হচ্ছে না, তাই সেখানকার কর্মকর্তাদেরকে অন্য জায়গায় দেওয়া হয়েছে।”
এখন নতুন কাউকে পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হবে কি না, এ প্রশ্নের উত্তরে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি তো নতুন এসেছি। আমি এ বিষয়ে জানি না।
“এখন সেটা কী অবস্থায় আছে, বিধি কী বলে—সব দেখে ব্যবস্থা নেব।”
‘বঙ্গমাতা’ নাম বাদ, নিষ্ক্রিয় গবেষণা কেন্দ্র
সমাজে নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২২ সালে যাত্রা করে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা সেন্টার ফর জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা’ বাদ দিয়ে নতুন নাম করা ‘সেন্টার ফর জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’।

২০২৫ সালের ২৭ অগাস্ট নাম বদলানো হয় বলে জানিয়েছেন গবেষণা কেন্দ্রের বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক সানজীদা আখতার।
নাম বদলানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি এ সেন্টারে জয়েন করেছি এ বছরের জানুয়ারি মাসে। তাই এ সেন্টারের নাম পরিবর্তনের বিষয়ে আমি জানি না।”
সেখানকার সাবেক এক গবেষক বলেন, “এ সেন্টারে অসংখ্য কাজ হয়েছে। যেখানে অনেক গবেষণা সেন্টার নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছিল, তখন আন্তর্জাতিক সম্মেলন থেকে শুরু করে অনেক কাজ হয়েছে।
“যদি কাজে কোনো অসংগতি থাকে, সেটা তদন্ত করে বর্তমান প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে পারে। এভাবে নাম পরিবর্তন করা তো প্রতিহিংসামূলক সংস্কৃতি।”
পটপরিবর্তনের পর কেন্দ্রটির কোনো কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি বলে জানিয়েছেন পরিচালক অধ্যাপক সানজীদা আখতার।
তিনি বলেন, “আমি আসার পর একটা জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে আবার রোজা ছিল। এছাড়া আমাদের গভর্নিং বডি ঠিক করা নিয়ে কাজ চলছে। আমরা আশা করি আগামী কয়েকদিনের মধ্যে সব হয়ে যাবে।”
কেন্দ্রটি নিয়ে বর্তমান প্রশাসনের পরিকল্পনা জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। আমার দেখতে হবে।”

এখানকারও তথ্য গায়েব
বঙ্গবন্ধু ইনস্টিটিউটের মতোই নারী গবেষণা কেন্দ্রটির তথ্যও ওয়েবসাইট থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর হওয়া আন্তর্জাতিক সম্মেলন, গবেষণা ও প্রকাশনা মেলা, তিনটি বক্তৃতা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির তথ্য সেখানে ছিল।
তথ্য মুছে ফেলার ঘটনা জানতে সাবেক পরিচালক অধ্যাপক তানিয়া হককে একাধিককার ফোন দিলেও তার সাড়া মেলেনি।
আর বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক সানজীদা আখতারের, এ বিষয়ে তার কোনো ধারণা নেই।