Published : 03 Sep 2025, 01:36 PM
নির্ধারিত তারিখেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন করার সবুজ সংকেত দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।
ডাকসু নির্বাচন স্থগিতের যে আদেশ হাই কোর্ট দিয়েছিল, তা আটকে দিয়েছিল আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। বুধবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সেই আবেদন শুনে চেম্বার আদালতের সিদ্ধান্তই বহাল রেখেছে।
এর ফলে ৯ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত তারিখে ডাকসু নির্বাচন করতে আর কোনো বাধা থাকল না বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির জানিয়েছেন।
দুপক্ষের শুনানি শেষে আদেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, “হাই কোর্টের আদেশের বিষয়ে চেম্বার আদালতের আদেশ বহাল রইল। একইসঙ্গে হাই কোর্টের আদেশ আগামী ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত থাকবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সভাপতি এস এম ফরহাদের ডাকসুর জিএস পদে প্রার্থিতার বৈধতা প্রশ্নে করা এক রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে সোমবার এ নির্বাচন দুই মাসের জন্য স্থগিত করে দেয় হাই কোর্ট। সেই সঙ্গে ফরহাদের বিষয়ে ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালকে।
ওই আদেশের পর শিক্ষার্থীরা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখালে তাৎক্ষণিকভাবে হাতে লেখা আবেদন নিয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। চেম্বার আদালত সিএমপি ফাইল বা সিভিল মিসলেনিয়াস পিটিশন আবেদন করার নির্দেশনা দিয়ে ওই আবেদনের শুনানি পর্যন্ত হাই কোর্টের আদেশ স্থগিত করে দেয়।
সে অনুযায়ী মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিএমপি দাখিল করলে তা শুনানির জন্য পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন চেম্বার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির, জিএস প্রার্থী এস এম ফরহাদের পক্ষে ব্যারিস্টার ইমরান আব্দুল্লাহ সিদ্দিকী, রিটকারীর পক্ষে আইনজীবী এহসানুল করিম এবং ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
আদেশের পর শিশির মনির বলেন, “ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী আর কোনো আইনি বাধা থাকল না। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর ফ্রি, ফেয়ার এবং ইমপার্শিয়াল ওয়েতে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করবেই।”
এর আগে শুনানির শুরুতে শিশির মনির আদালতকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ৫০ বছরে ডাকসু নির্বাচন হয়েছে ৩৭ বার। আর একাত্তরের পর এই ৫৪ বছরে ডাকসু নির্বাচন হয়েছে মাত্র ৭ বার।
“রিটকারী বি এম ফাহমিদা আলমের এই রিট করারই কোনো অধিকার (লুকাস স্ট্যান্ডাই) নেই। কারণ যার বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ করেছেন নির্বাচনে প্রার্থিতায় তার পদ এবং রিটকারীর পদ একই নয়। তাই তিনি কোনোভাবেই সংক্ষুব্ধ নন।
“আবার আবেদনের কোথাও তিনি পিআইএল (পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন বা জনস্বার্থে মামলা) উল্লেখ করেননি। এ ছাড়া তিনি নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল বা উপাচার্য বরাবর কোনো আবেদনও করেননি এস এম ফরহাদের প্রিার্থিতা বাতিলের জন্য। এসব ফোরাম থাকার পরও তিনি সেখানে যাননি, চলে এসেছেন হাই কোর্টে।”
এরপর রিটকারীর পক্ষে শুনানিতে আসেন অ্যাডভোকেট এহসানুল করিম।
তিনি বলেন, “রিট আবেদনকারী নির্বাচন বন্ধ করতে আবেদনে বলেননি। তিনি নির্দষ্ট একজন প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের আবেদন করেছেন।”
রিট আবেদনকারীর পক্ষে হাই কোর্টের আদেশের একটি ‘পরিবর্তনের’ আবেদন করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “এ বিষয়টি তদন্ত করে এক বা দুই দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে পারে। সেক্ষেত্রে যদি ওই প্রার্থী নির্দোষ প্রমাণিত হন, তাহলে নির্বাচন করবেন, আর দোষী হলে প্রার্থিতা বাতিল হবে।”
এ পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি তাকে প্রশ্ন করেন, তারা হাই কোর্টে আদেশ দেওয়ার পর সেটা বলেননি কেন।
তখন এহসানুল করিম বলেন যে তিনি হাই কোর্টে শুনানি করেননি। এ সময় তিনি জ্যোতির্ময় বড়ুয়াকে দেখিয়ে দিয়ে বলেন, যে তিনি হাই কোর্টে শুনানি করেছেন।
এরপর এস এম ফরহাদের পক্ষে শুনানিতে আসেন ব্যারিস্টার ইমরান আব্দুল্লাহ সিদ্দিকী। তিনি বলেন, এই পর্যায়ে হাই কোর্টের আদেশ ‘মোডিফিকেশনের’ সুযোগ নেই।
কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে বলতে গিয়ে তিনি ডাকসুর গঠনতন্ত্রের বিধি ৮ (পি) তুলে ধরেন। সেখানে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে উপাচার্য বরাবর অভিযোগ জানাতে পারেন। কিন্তু রিট আবেদনকারী কোনো আবেদন করেননি। সরাসরি এসেছেন হাই কোর্টে।
পরে আবার এহসানুল করিম উঠে এস এম ফরহাদের বিষয়ে তদন্তের আবেদন করেন। আবারও বলেন, তারা নির্বাচন বন্ধের পক্ষে নন।
৫ অগাস্টের আগে এস এম ফরহাদ ‘ছাত্রলীগের কমিটিতে’ ছিলেন, এর পরও তিনি কীভাবে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থী হলেন– এমন প্রশ্ন তুলে তার প্রার্থিতা চ্যালেঞ্জ করে রোববার একটি রিট মামলা হয়। তিন বাম সংগঠন সমর্থিত ‘অপরাজেয় ৭১-অদম্য ২৪’ প্যানেলের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক প্রার্থী বি এম ফাহমিদা আলম এ মামলা করেন।
রিট আবেদনকারী বিএম ফাহমিদা আলম সোমবার সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, “ফরহাদের অবস্থান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং ফরহাদ নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন, তার কোনো পদত্যাগের প্রমাণ আমরা পাইনি।”
ফরহাদের কর্মকাণ্ড ডাকসুর গঠনতন্ত্রের সঙ্গে ‘সাংঘর্ষিক’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “টিএসসিতে তারা রাজাকারদের ছবি টানিয়েছিল। তাদেরকে জাতীয় বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার যে প্রচেষ্টা ছিল, সেটি ডাকসুর মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশের সঙ্গে বিরোধিতা করে।”
এ রিট মামলা ডাকসু নির্বাচন ‘বানচাল করার জন্য নয়’ দাবি করে তিনি বলেন, মামলা করার পর থেকে বিভিন্ন ‘বট অ্যাকাউন্ট’ থেকে তিনি বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন।
এর আগে সোমবার মামলা হওয়ার পর ফরহাদ এক ফেইসবুক পোস্টে লিখেছিলেন, “আমার প্রার্থিতাকে চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়েরকারী বামজোটের নেত্রীকে তার উদ্যোগের জন্য শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
“বিভিন্ন দল কর্তৃক দীর্ঘ সময় ধরে ছবি এডিট করে, ভিডিও বানিয়ে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করার চেয়ে আপনার আইনি উদ্যোগ তুলনামূলক ভালো অ্যাপ্রোচ। বাধা, ষড়যন্ত্র কিংবা অপকৌশল মাড়িয়েই আমাদের নিয়মিত পথচলা; এই যাত্রায় আমরা থামব না, ইনশাআল্লাহ।”
ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের প্যানেলে ভিপি পদে লড়ছেন সাদিক কায়েম। আর 'অপরাজেয় ৭১-অদম্য ২৪' নামে প্যানেলে ভিপি পদপ্রার্থী হয়েছেন মো. নাইম হাসান হৃদয়। জিএস পদে লড়ছেন এনামুল হাসান অনয়।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের একাংশ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-বিসিএল (বাংলাদেশ জাসদের ছাত্র সংগঠন) এর সমন্বয়ে এ প্যানেল গঠন করা হয়েছে।