Published : 22 Aug 2022, 08:49 PM
ডিমের অস্বাভাবিক মূল্য বাড়ানোর পেছনে জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন।
সোমবার ঢাকার মতিঝিলে ফেডারেশন ভবনে নিত্যপণ্যের মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এই দাবি জানান।
সভায় ভোক্তা প্রতিনিধি ছাড়াও ডিম ও পোল্ট্রি শিল্পের বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। আলোচনায় ডিমের মূল্য বেড়ে যাওয়ার জন্য সরাসরি এ খাতের বড় উৎপাদক করপোরেট কোম্পানিগুলোকে দায়ী করেন আড়তদাররা।
কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা এর বিরোধিতা করলেও প্রতিউত্তরে তেমন শক্ত যুক্তি দেখাতে পারেননি।
আলোচনায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, “তিন দিনের অভিযানে ডিমের দাম প্রতি ডজনে ৩০ টাকা থেকে ৩৫ টাকা পড়ে গেল। এতে কী প্রমাণ হল? প্রমাণ হল যে এখানে মেনিপুলেট করা হয়েছে। গত ১০/১২ দিনে কোনো একটা গ্রুপ বা একাধিক গ্রুপ এই কাজটি করেছে।
“বাজার থেকে ভোক্তাদের পকেট কেটে একটা বড় ধরনের মুনাফা করেছে। সেই মুনাফা যাতে আর না করতে পারে এবং এ পর্যন্ত যা করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে আমরা অ্যাকশনে যাব। এতদিন জরিমানা করেছি এবার মামলা মোকদ্দমায় চলে যাব।“
এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, “আজকের আলোচনায় যা বোঝা গেল, করপোরেটরাই তো সব করছেন। কয়েকজনের জন্য আজ সবাই প্রশ্নের মুখে। সামান্য কয়েকজন ব্যবসায়ী সুযোগ নিয়েছেন।”

তিনি বলেন, ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর যদি কাউকে দোষী হিসাবে পেয়ে থাকে, তাহলে তাদের যেন শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়।
“ব্যবসায়ীদের কোনো সমস্যা থাকলে সেটাও চিহ্নিত করতে হবে। গুটিকয়েক লোক পুরো ব্যবসায়ী সমাজকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেবে এটা হতে পারে না। কেউ যদি সত্যিকার অর্থেই ডিমের কারসাজির সঙ্গে জড়িত থাকে, তার বিরুদ্ধে আপনারা কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।”
পোল্ট্রি খাতের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা এফবিসিসিআইয়ের কাজে সহযোগিতা করছে না বলেও অভিযোগ করেন সভাপতি।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশেন সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সভাপতি মশিউর রহমানকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “মশিউর ভাইকে লাইভস্টক বিষয়ক চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়েছিলাম। কিন্তু উনি একটা মিটিংও ডাকেন নাই। উনারা লাভ, ব্যবসা ও প্রফিট নিয়ে ব্যস্ত।”
এ খাতে বেশ কিছু ‘অস্পষ্টতা’ রয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ওই অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে এ ধরনের অনিয়ম হচ্ছে।
“এখানে কয়েকটি কোম্পানির একচেটিয়া প্রভাব রয়েছে। তারাই ডিম উৎপাদন করে, তারাই ফিড উৎপাদন করে। তারাই দাম ঠিক করে।
“সমস্যা হচ্ছে, আমাদের দেশে যে ফিড তৈরি করছে, সেখানে কাঁচামালে মনোপলি হচ্ছে, কেউ ফিডে মনোপলি করছে, কেউ ডিমে মনোপলি করছে। এই মনোপলিটা ভেঙে দেওয়া দরকার।”
জসিম উদ্দিন বলেন, “ফিডের কাঁচামাল আসে তেলের ক্রাশিং মেশিনের বর্জ্য থেকে। দেখা গেছে, তেলের চেয়ে বর্জ্য বিক্রিতে তাদের লাভ বেশি। সেখানে হাত দেওয়া দরকার। তারা যদি এভাবে বেশি দামে বর্জ্য বিক্রি করে, তাহলে আমদানি উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক।“
সাত টাকার ডিম হঠাৎ ১৫ টাকা হয়ে যাবে কেন- সেই প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, “এখন তো মনে হচ্ছে কাজী ফার্ম এই ঘটনা ঘটাইছে। কাজী ফার্ম সমিতির সভাপতি। উনার লোকরা যদি এই ঘটনা ঘটিয়ে থাকে, তাহলে উনি কোথায় ছিলেন? আমরা যা বুঝলাম, সাভারের ঘটনা কাজী ফার্মের লোকই তো ঘটাইছে। ৩/৪ দিনে কোটি কোটি টাকা হাতায়া নিয়ে যাবেন, এটা তো হতে পারে না। যে নিয়মিত ১৮ হাজার ডিম কেনে, সে বেশি দাম দিয়ে একদিনে দুই লাখ ডিম কেন কিনবে?”

এফবিসিসিআই সভাপতির ভাষায়, “উনারা উনারা দাম ঠিক করে, এটাকে একটা রেগুলেশনের মধ্যে আনা উচিত। কনভেনশনাল ব্যবসার মধ্যে করপোরেটরা ঢুকছে। ব্যক্তি কখনও দেশের চেয়ে বড় হতে পারে না, সে যেই হোক। ব্যক্তিকে দেশের চেয়ে বড় করা যাবে না। ভোক্তা অধিদপ্তর, কম্পিটিশন কমিশন, এফবিসিসিআইয়ের দায়িত্ব আছে।”
এফবিসিসিআইয়ের জ্যেষ্ঠ সহ সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, বাজারে ‘কারসাজির’ জন্য ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
“মানুষের কাছে ব্যবসায়ীদের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। ডিমের বাজারে যদি কোনো অনিয়ম, আইনবিরোধী কাজ হয়ে থাকে, তাহলে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। এসব কার্যক্রমে এফবিসিসিআই পাশে থাকবে।”
ভোক্তা কণ্ঠের সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নানের দাবি, ১৪ দিনে ডিমের বাজার থেকে বাড়তি ২৬৮ কোটি টাকা এবং ব্রয়লার মুরগির বাজার থেকে ২২৫ কোটি টাকা ভোক্তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে।
খামারি থেকে সংগ্রাহক হয়ে ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত ‘চারটি স্তরে’ এই বাড়তি টাকা আদায় করা হয়েছে এবং এক দিনের বাচ্চার বেচাকেনাতেও ‘মূল্যবৃদ্ধির কারসাজি’ হয়েছে বলে তার অভিযোগ।
করপোরেটদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
মতবিনিময় সভায় কাজী ফার্মসহ বড় করপোরেট কোম্পানিগুলো ‘মূল্য বাড়াতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে’ বলে আড়তদাররা জোরালো অভিযোগ করেন।
এর জবাবে বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও প্যারাগনের প্রতিনিধি মশিউর রহমান বলেন, “এই খাত এখন অনেক বড়। কিন্তু এত বড় খাতকে সুশৃঙ্খল করার জন্য আরও কিছু আইনকানুন দরকার। আইন থাকলে এমন অগোছালো অবস্থা হত না।”

তিনি বলেন, “গত দুই সপ্তাহে হঠাৎ করে ডিমের দাম কীভাবে বাড়ল সেটাই দেখার বিষয়। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পর পর ৩/৪ দিন পণ্য পরিবহন স্তিমিত হয়েছিল। এর ফলে মুরগি মরেছে, ডিম নষ্ট হয়েছে। এর ফলে দামও বেড়েছে। কিন্তু দাম বৃদ্ধির ফলে যে অস্বাভাবিক মুনাফা করা হয়েছে, সেটা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। কারা করেছে তাদের চিহ্নিত করা উচিত।”
বড় কোম্পানিগুলো বাজার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখার সক্ষমতা রাখে না বলে তিনি দাবি করলেও তা নাকচ করেন ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।
মশিউর বলেন, দৈনিক চার কোটি ডিম উৎপাদন হয়। সেখানে বড় কোম্পানিগুলো ৩০ লাখ ডিম উৎপাদন করে।
“সাড়ে চার কোটির মধ্যে ৩০ লাখ ডিম মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ হয়। তারা কীভাবে বাজার মেনিপুলেট করবে?”
এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, কয়েক দিন আগে ক্ষুদ্র ডিম উৎপাদনকারীরা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে একটা অনুষ্ঠানে দাবি করেছেন, বড় কোম্পানিগুলো মোট উৎপাদনের ৬০ শতাংশের যোগান দেয়।
এককভাবে একটি খামারে দৈনিক ৩০ লাখ ডিম উৎপাদন হয় বলে তথ্য উত্থাপন করেন ভোক্তাকণ্ঠের সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান।
ডিমের দাম ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে নির্ধারণ করে- এমন অভিযোগ ‘মিথ্যা’ দাবি করে ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও কাজী ফার্মসের পরিচালক কাজী জাহিন হাসান বলেন, “প্রতিদিন আমাদের ওয়্যারহাউজগুলোতে নিলাম তুলে বিক্রি করা হয়। প্রতিদিন আমাদের ৬ লাখ ডিম বিক্রি হয়। ক্রেতারা প্রতিদিন আমাদের কাছে প্রাইস পাঠায়, আমরা সে অনুযায়ী ডিম দিই।
“আমরা তো উচ্চ মূল্যে বিক্রি করার চেষ্টা করব। কিন্তু আমরা অন্য কোনো কোম্পানির সঙ্গে যোগসাজশ করে দাম বাড়াচ্ছি না।“
কয়েক দিন সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার কারণেই ডিমের দাম বেড়ে গেছে বলে দাবি করেন কাজী ফার্মসের পরিচালক।
তার দাবি, বর্তমান ফিডের খরচ হিসাব করলে সাধারণ খামারির উৎপাদন খরচ হয় প্রতি ডিমে ৯ টাকা ৫০ পয়সা। বড় ফার্মে উৎপদন খরচ হয় ৯ টাকা। তিন স্তরে লভ্যাংশ দেওয়ার পর কোনো অবস্থাতেই ডিমের দাম ১০ টাকা ৫০ পয়সার কম হয় না।
তেজগাঁও বহুমুখী সমিতির মোহাম্মদ হানিফ মিয়া বলেন, “করপোরেট কোম্পানি আমাদের সহযোগী। সকালে করপোরেট কোম্পানিগুলো একটা রেট ঘোষণা করে। সে অনুযায়ী সারাদিন আমাদের ট্রাকগুলো গ্রামের খামারগুলো থেকে ডিম সংগ্রহ করে রাতে ঢাকায় আসে। সেখানে আমরা হাজারে ২০ টাকা আড়তদারি রেখে ডিমটা বিক্রি করি। বাকি দাম পায় খামারিরা।”
কাপ্তান বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মাসুদ বলেন, “এক সময় আমরা ডিমের দাম নির্ধারণ করলেও বর্তমানে আমরা কোনো ডিমের দাম নির্ধারণ করি না। দাম ঠিক করে প্যারাগন, কাজী, পিপলসসহ অন্যান্য কোম্পানি। প্যারাগন, কাজী ও পিপলস মিলে ১১ টাকা ৮০ পয়সার রেটটা দিয়েছে।”
সভায় প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জিনাত সুলতানা, এফবিসিসিআই সহসভাপতি সালাউদ্দিন আলমগীর, মো. আমিন হেলালী, মো. হাবীব উল্লাহ ডন, মহাসচিব মোহাম্মদ মাহফুজুল হক উপস্থিত ছিলেন আলোচনায়।