‘নন-ব্র্যান্ডেড’ জুতা কেনা কতটা লাভজনক?

“জামা-কাপড়ের ক্ষেত্রে যাই হোক, জুতাটা আমি সব সময় চেষ্টা করি ব্র্যান্ডের পরতে; ব্র্যান্ডের জুতা টেকসই হয়, দীর্ঘস্থায়ীও।”

মাছুম কামালবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 30 March 2024, 05:49 PM
Updated : 30 March 2024, 05:49 PM

“এই জুতাজোড়া নিছিলাম ৪৫০ ট্যাকা দিয়া। এক সপ্তাহ পইরা ছিঁড়া গেছে। এখন আসছি, দোকানদার ফেরত লয় না। কয়, হ্যার থিকা কিনি নাই। ক্যামনটা লাগে কন?”

গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে একটি জুতার দোকানের সামনে কথা হচ্ছিল বেসরকারি চাকুরে দ্বীন ইসলামের সঙ্গে। হাতে থাকা এক জোড়া জুতা নিয়ে তিনি ‘ঠকে যাওয়ার’ কথা বলছিলেন। 

“একটু সস্তায় পাইছি দেইখা নিছিলাম। এখন মনে হইতাছে ভুলই করলাম। আরেকটু ট্যাকা অ্যাড করলেই ব্র্যান্ডের জুতা কিনতে পারতাম। অন্তত চোখ বন্ধ কইরা বেশি দিন পরতে পারতাম। এই কানে ধরছি। আর কিনুম না।” 

একই এলাকায় জুতা কিনছিলেন রুম্মান নামের এক ব্যক্তি। পোশাক বিক্রয়কেন্দ্রে কাজ করেন তিনি। 

রুম্মান বললেন, “নন-ব্র্যান্ডের জুতা কিনি আসলে দুইটা কারণে। ব্র্যান্ডের জুতার তুলনায় দাম কম, এইটা একটা কারণ। আরেকটা কারণ হচ্ছে চেঞ্জ করে পরা যায়। তবে এসব জুতা লং লাস্টিং হয় না।

“আসলে লসই হয়। ধরেন দুই জোড়া নন-ব্র্যান্ডের জুতা আমি কিনলাম ১৬০০ টাকায়। এই দুই জোড়া সাকুল্যে দেড় বছর পরা যাবে। কিন্তু ব্র্যান্ডের জুতা কিনলে অনায়াসেই দুই বছর পরা যায়। আমি পরেছিও। কিন্তু ওই যে বললাম- একটু চেঞ্জ করে পরা যায়, এজন্যই কিনি আসলে।” 

ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতে এমনকি বিপণিবিতানে নন-ব্র্যান্ডের নানা রঙের নানা নকশার জুতার বিকিকিনি হয়। দামে কম হওয়ায় বিক্রিও হয় দেদারসে। এসবের পাশাপাশি নামি ব্র্যান্ডগুলোর লোগো কপি করা জুতাও চোখে পড়ে ফুটপাত ও দোকানে। 

অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতারা জেনে-বুঝেই এসব জুতা কেনেন। আবার অনেকসময় না জেনেও প্রতারিত হন অনেকেই। 

ফার্মগেটে একটি নামি জুতা কোম্পানির বিক্রয়কেন্দ্রে কথা হচ্ছিল নাজমুল আবেদীনের সঙ্গে। 

বেসরকারি এ চাকুরে বলছিলেন, “আমি সবসময় ব্র্যান্ডের জুতা পরি। একবার উত্তরার একটা লোকাল দোকান থেকে এপেক্সের লোগোওয়ালা জুতা কিনেছিলাম। 

“পরে দুইদিন পর ছিঁড়ে গেল। এপেক্সের আউটলেটে নিয়ে দেখালাম। ওরা বলল, নকল।” 

এমন ঝক্কি এড়াতে ব্র্যান্ডের দোকানে ভরসা রাখেন নিকেতন এলাকার বাসিন্দা তানভীর আহমেদ। 

তার ভাষ্য, “দুটো কারণে আমি ব্র্যান্ডের জুতা ছাড়া পরি না। এক হচ্ছে ব্র্যান্ডের জুতা একটু সফট হয়। পরলে পা ভারী মনে হয় না। আরাম লাগে। দ্বিতীয়ত র‍্যান্ডম ইউজ করা যায়, খুব টেকসই হয়। এজন্য দাম একটু বেশি হলেও আমি সব সময় ব্র্যান্ডের জুতা কিনি।” 

সায়েন্সল্যাব এলাকার নিশাত ইসলামও বলছিলেন, “জামা-কাপড়ের ক্ষেত্রে যাই হোক, জুতাটা আমি সব সময় চেষ্টা করি ব্র্যান্ডের পরতে। ব্র্যান্ডের জুতা টেকসই হয়, দীর্ঘস্থায়ীও।”

বিক্রেতাদের তথ্য অনুযায়ী, নন-ব্র্যান্ডের জুতার বেশির ভাগই দেশে প্রস্তুত হয়, বিদেশ থেকেও আমদানি হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সোল বাইরে থেকে এনে দেশে জুতা প্রস্তুত করা হয়। ঢাকার বেশ কয়েকটি এলাকায় এ ধরনের কারখানা আছে। 

অনেক আমদানিকারক আছেন, যারা কেবল সোল কিনে এনে বিক্রি করেন। আবার অনেকে সোল কিনে আনা থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরোটাই নিজেরা করে থাকেন। 

গুলিস্তানের পীর ইয়ামেনী মার্কেটের ‘রোমানা সুজ’র বিক্রয়কর্মী আবদুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের এখানে যে জুতাগুলো বিক্রি করি, এগুলোর সোল চায়না থেকে কিনে আনেন আমদানিকারকরা, এরপর বাকি বডিটা দেশে বানিয়ে রেডি করা হয়।

“মূলত ঢাকার নবাবগঞ্জ, হাজারীবাগ, সিদ্দিকবাজারের আমদানিকারকদের থেকে আমরা কিনে এনে কারখানায় প্রস্তুত করি। আমাদের দোকানে যে জুতাগুলো দেখছেন, এগুলোর দাম গড়ে ৭৫০ থেকে ৮৫০ বা ৯০০ টাকা। প্রতি জোড়া জুতায় গড়ে দেড় থেকে দুইশ টাকা লাভ হয় আমাদের।”   

গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের ‘পান্ডা গ্যালারি’র বিক্রয়কর্মী মোহাম্মদ হোসাইন জানালেন, তারা তৈরি জুতাই চীন থেকে এনে বিক্রি করেন।

সিদ্দিকবাজার এলাকার জুতার কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স রতন অ্যান্ড কোংয়ের ব্যবস্থাপক মাসুদ সারোয়ার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা চায়না, ভিয়েতনাম থেকে জুতা এবং সোল দুইটাই আমদানি করি। প্রতি লটে শিপমেন্টের পরিমাণ- অর্ডার, চাহিদা এসবের উপর নির্ভর করে। 

“আমরা নিজেরাও জুতা বানিয়ে বিক্রি করি, আবার সোলও বিক্রি করি। তবে ডলারের দাম বাড়ায় এখন আমদানি কমিয়েছি।” 

নন-ব্র্যান্ডের জুতা তৈরি ও প্রস্তুত হয় অন্য ভাবেও। বংশ পরম্পরায় ‘দাদা ভাই সুজ’ নামে একটি দোকান চালান জয়লাল সাহা। 

তিনি জানান, ক্রেতার চাহিদা মাফিক সাইজ ও রঙের জুতা বানিয়ে দেন তারা। তারাও সাধারণত সোল কিনে আনেন। এরপর নকশা অনুযায়ী জুতা প্রস্তুত করেন। 

দাদা ভাই সুজের বিক্রয়কর্মী ও কারিগর সুজিত সাহা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা সোল কিনে আনি পাইকারদের থেকে। এরপর নিজেরা পুরো জুতা তৈরি করি। 

দাম কীভাবে ঠিক করেন, এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “ডিজাইনের উপর নির্ভর করে দাম নির্ধারণ করা হয়।”