১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

ঈদ বাজার: দাম বাড়ায় ‘বিক্রি কমেছে’ অনলাইনে

“বলতে গেলে এবারের ব্যবসা মন্দা, গত ঈদের সঙ্গে তুলনা করলে অর্ধেক। বাজারে জিনিসপত্রের দামের যে ঊর্ধ্বগতি, তার প্রভাবেই এমন হচ্ছে বলে মনে হয়।”

ঈদ বাজার: দাম বাড়ায় ‘বিক্রি কমেছে’ অনলাইনে

ছবি: লা রোজা

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 16 Apr 2023, 10:53 AM

Updated : 16 Apr 2023, 10:53 AM

কোভিড মহামারী শুরুর পর ই কমার্সের ব্যবসা আর অনলাইনে পণ্য বিক্রি বেড়ে গিয়েছিল কয়েক গুণ; কিন্তু ইউক্রেইন যুদ্ধের জেরে অর্থনৈতিক মন্দায় মানুষের পকেটে টান পড়েছে, তার প্রভাবে অনলাইনে কেনাকাটায় ভাটা দেখতে পাচ্ছেন ফ্যাশন উদ্যোক্তারা।

তারা বলছেন, বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। সেইসঙ্গে অনলাইন ভিত্তিক ব্যবসায় তুমুল প্রতিযোগিতায় এবারের ঈদবাজারে তাদের বিক্রি কিছুটা কমেছে।

এক দশকের বেশি সময় ধরে ফেইসবুকে শাড়ি, থ্রি-পিসসহ মেয়েদের বিভিন্ন পোশাক বিক্রি করে আসছেন ‘কল্পতরু’র প্রতিষ্ঠাতা আফসানা শর্মী।

এবারের ঈদবাজারে ক্রেতার চাহিদা জানতে চাইলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “দাম বেশি হওয়ায় ক্রেতা আগের মত আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ভারত, পাকিস্তান থেকে আমদানি করা পোশাক কিংবা দেশে তৈরি পোশাকগুলোর দাম অনেক বেড়ে গেছে। গত বছরের ৫০০ টাকার ড্রেস এবার আমাদের ৭০০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে।

“অনেক বেশি উদ্যোক্তা এই ব্যবসায় যুক্ত হওয়ায় প্রতিযোগিতাও বেড়ে গেছে। ফলে অন্যান্য সময়ের তুলনায় এবার রোজার ঈদ কেন্দ্র করে বিক্রি কম হচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।”

আফসানার মতই প্রায় সাত বছর ধরে ফেইসবুকে শাড়ি, থ্রি-পিস ও পোলো শার্টসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করে আসছেন সাদিয়া ইসলাম। ফেইসবুকে তার বিভিন্ন পেইজ ও গ্রুপে ১৭ লাখের বেশি অনুসারী। এই ব্যবসায় বেশ সাফল্য পেয়ে নিউ মার্কেটের পাশে চাঁদনীচকে ১০টি ও মিরপুর-১ নম্বরে মুক্তবাংলা শপিং কমপ্লেক্সে চারটি শোরুমও চালু করেছেন তিনি।

এবারের ঈদবাজারের খবর জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সর্বোপরি বলতে গেলে এবারের ব্যবসা মন্দা। গত ঈদের সঙ্গে তুলনা করলে অর্ধেক। বাজারে জিনিসপত্রের দামের যে ঊর্ধ্বগতি, তার প্রভাবেই এমন হচ্ছে বলে মনে হয়।

“তাছাড়া আমাদের পোশাকগুলো দামও গতবছরের তুলনায় একটু বেড়েছে। সুতা, কেমিকেল, কালার এসব কিছুর দামও কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেড়গুণ বেড়েছে। পোশাক ভেদে প্রতি পিসে দাম বেড়েছে ১০০ টাকা থেকে ২০০ টাকা করে।”

পোশাক ছাড়াও হস্তশিল্প, কারুশিল্প, শুকনো খাবার, প্রসাধনী, খেলনাসহ নানা ধরনের পণ্য বিক্রি হয় ফেইসবুক ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে। অনেকেই ফেইসবুকে ভালো সাড়া পেয়ে ওয়েবসাইট ও বিভিন্ন মার্কেটে দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা বিস্তৃত করেছেন। বর্তমানে প্রচলিত অনেক ফ্যাশন ব্র্যান্ডও ফেইসবুকে পেইজ খুলে ক্রেতা ধরার চেষ্টা করছে।

উদ্যোক্তাদের অনেকে অন্যবারের তুলনায় এবার বিক্রি কমার হওয়ার কথা বললেও রোজার মাঝামাঝি সময়ে এসে বিক্রি বাড়ার কথা জানাচ্ছেন ফেইসবুক নির্ভর কয়েক লাখ উদ্যোক্তাদের নিয়ে গঠিত প্ল্যাটফর্ম ‘উই অ্যান্ড ইকমার্স ট্রাস্ট্র’ এর প্রতিষ্ঠাতা নাসিমা আকতার নিশা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “ক্রেতা সমাগম নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। কিছু কিছু উদ্যোক্তার বিক্রি বেড়েছে। আবার অনেকেই ক্রেতা হারিয়েছেন। ক্রেতাদের ক্রয় ক্ষমতা কমে গেছে এটাও সত্য। আবার কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দাম বেড়েছে।”

সারাদেশে সাড়ে ৫ লাখের মত ফেইসবুকভিত্তিক উদ্যোক্তা রয়েছে বলে জানান নিশা।

ফেইসবুক পেইজ ‘এলিমেন্টারি’র আল আমিন জায়ান বলেন, তারা আমদানি করা পশ্চিমা ফ্যাশনপণ্য বিক্রি করেন। যুক্তরাজ্য, চীন থেকে কিছু পণ্য আসে। কিছু পণ্য নিজেরা ডিজাইন করেন। শুরু থেকেই অনলাইনেই তারা পণ্য বিক্রি করে আসছেন।

“আমাদের কিছু নির্দিষ্ট ক্রেতা আছে। বলতে গেলে শহরের উচ্চবিত্ত শ্রেণির তরুণ-তরুণীরা আমাদের ক্রেতা। ধানমন্ডি, বনানী, গুলশান, বারিধারা ডিওএইচএস, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আমাদের পণ্যগুলো বেশি বিক্রি হয়। প্রথম থেকেই এ ধরনের পণ্যের বাজার বেশ ভালো।”

ঈদ বাজার প্রসঙ্গে জায়ান বলেন, “আমরা যে ধরনের পণ্য নিয়ে কাজ করি সেটা ঈদকেন্দ্রিক নয়। বেচা-বিক্রির একটা ধারাবাহিকতা রয়েছে। সে কারণে ঈদ নিয়ে আমাদের পৃথক পরিকল্পনা থাকে না।“

এবার রোজার মধ্যে পহেলা বৈশাখ কেন্দ্রিক পোশাকের বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করেন ফেইসবুক পেইজ ‘১২ হাত গল্প’ এর উদ্যোক্তা প্রিথুলা ঘোষ।

২০১৮ সালে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা শুরু করে এখন তার ফলোয়ার ৫৫ হাজার। দেশীয় তাঁতের শাড়ির পাশাপাশি রাজশাহী সিল্ক, নিজস্ব ডিজাইনের শাড়ি, শিশুদের পোশাক ও পাঞ্জাবি বিক্রি করা হয় তার পেইজে।

প্রিথুলা ঘোষ বলেন, “ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে এবার ব্যবসায় বিনিয়োগটা কম করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি নতুন ডিজাইনের শাড়ি এবারও আনা হয়েছে। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় বেচাবিক্রি পরিমাণে কম। এবার ঈদ ও পহেলা বৈশাখ একসাথে পড়ে গেছে। ফলে পহেলা বৈশাখের বাজারটাও বেশি জমছে না।”

রাজধানীর যাত্রাবাড়ি থেকে পরিচালিত লা রোজা ফ্যাশনের স্বত্ত্বাধিকারী সানজিদা আক্তার বলেন, “লকডাউনে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছিল। ফেইসবুকের মেটা ভার্সন আসার পর লাইভের ভিউ কমে গেছে। কিন্তু আমাদের সেল আগের মতোই আছে।

“মেয়েদের সব ধরনের আইটেম আমি বিক্রি করি। ঈদ বলে কথা নেই; সারা বছরই আমাদের বিক্রি আছে। ঢাকার মধ্যে ৩০ ভাগ ক্রেতা আছে। এছাড়া ঢাকার বাইরের জেলাগুলো থেকে বাকি অর্ডারগুলো আসে। আমার এখানে ১০০ টাকার সালোয়ার থেকে শুরু করে ওয়ান পিস, টু পিচ থ্রি পিস পাওয়া যাচ্ছে। তিন হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার টাকার ড্রেস বিক্রি হচ্ছে।”

অনলাইনে কেনাকাটার জন্য সুযোগ পেলেই ফেইসবুকভিত্তিক পাতাগুলোতে ঢুঁ মারেন একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত ওয়াহিদা জামান সিথি।

তার ভাষ্য, “পাকিস্তানি ও ভারতীয় পোশাকের তুলনায় এবার দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর পোশাকপণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি। ফলে আমাদের মত ক্রেতাদের একটি ড্রেস কিনতে বেশ চিন্তাভাবনা করতে হচ্ছে।

“অফলাইনের তুলনায় ফেইসবুকে অপেক্ষাকৃত কম দামে ভালো পোশাক পাওয়া যেত। কিন্তু এবার দামটা একটু বেশি।”