১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি নবায়ন করল বাংলাদেশ

“এতোদিন যেসব ফাঁকফোকর ছিল, ঘাটতি ছিল- সেগুলো আর থাকছে না,” বলেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 12 Mar 2024, 10:16 PM

Updated : 13 Mar 2024, 12:30 AM

বিদেশি বিনিয়োগ ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সহজ রাখতে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে তিন দশক আগের দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি নবায়ন করেছে বাংলাদেশ।

মঙ্গলবার ঢাকায় অর্থ মন্ত্রণালয়ে নবায়ন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও নেদারল্যান্ডসের মিনিস্টার ফর ট্যাক্স অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্যাক্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এম এল এ ভেন রিজ।

অনুষ্ঠানে আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, “কর ফাঁকি রোধ এবং দ্বৈত কর আরোপের বিষয়টি এড়ানোর জন্য এই চুক্তিটি নবায়ন করা হয়েছে। ডাবল ট্যাক্সেশনটা এড়ানোর ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সহজ হবে।

“আমাদের দেশ থেকে যারা রপ্তানি করবে, তাদের ন্যায্য আয়টা চলে আসবে। ওদের দিক থেকেও যারা রপ্তানি করবে, তারাও দুই দেশে দুইবার কর দেওয়ার ঝামেলায় পড়বে না।” 

বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে দ্বৈত কর আরোপ পরিহার ও রাজস্ব ফাঁকি রোধ সংক্রান্ত চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৯৩ সালের ১৩ জুলাই। নেদারল্যান্ডস ছাড়াও বিশ্বের আরও ৪২টি দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি রয়েছে বাংলাদেশের। এসব দেশের বেশিরভাগই বিনিয়োগ করেছে এদেশে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, “সেই দেশের ব্যবসায়ীরা তাদের সুবিধা আর আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা যেন তাদের সুবিধাগুলো পায়। এতদিন যেসব ফাঁকফোকর ছিল, ঘাটতি ছিল- সেগুলো আর থাকছে না। যার যেটা প্রাপ্য, সেটা যেন সঠিক ভাবে পায়।”

এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, “যখন কোথাও কেউ আয় করে সংশ্লিষ্ট দেশ এর ওপর একটা কর আরোপ করতে পারে। অন্যদিকে সম্পদ আয়কারী ভিনদেশি হলে তার দেশেও এই আয়ের ওপর একটা ট্যাক্স আসতে পারে।

“নেদারল্যান্ডসের কোনো বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে একবার ইনকাম ট্যাক্স দিলে তাকে আবার নেদারল্যান্সেও ট্যাক্স দিতে হবে; একজন ব্যবসায়ীকে যেন দুই দেশেই এমন ট্যাক্স দিতে না হয়- সেজন্য দুই দেশ একটা চুক্তি করবে। চুক্তি অনুযায়ী এধরনের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তারা সংশ্লিষ্ট দুটি দেশ শুল্ক ভাগ করে নেবে। ট্যাক্স শেয়ারিং আরকি। এই চুক্তিতে কোন আয়ের জন্য কী ধরনের ট্যাক্স হবে, সেটা বলা আছে।”

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, “এটা আমদানি কিংবা রপ্তানির ক্ষেত্রে নয়, এটা হচ্ছে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে। এটা না করলে এক দেশের নাগরিক- আরেক দেশে গিয়ে ব্যবসা করতে পারবে না। আমরা এই পর্যন্ত ৪২টি দেশের সঙ্গে ডাবল ট্যাক্সেশন এগ্রিমেন্ট করেছি।

“এরমধ্যে অধিকাংশ দেশই হচ্ছে- যাদের কাছ থেকে আমাদের দেশে বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা আছে, এমন দেশ। এখন যেসব দেশে আমাদের দেশের বিনিয়োগকারীরা যেতে আগ্রহী, সেখানেও খুঁজে খুঁজে ডাবল ট্যাক্সেশন এগ্রিমেন্ট করছি।”

আফ্রিকার দেশ কেনিয়া, মরিশাসসহ আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বলেন জানান তিনি।

তিন দশক আগের চুক্তি নবায়ন প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান মুনিম বলেন, “এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে। আগে শুধুমাত্র কমোডিটি বিজনেস ছিল। এখন সফটওয়্যারসহ অন্যান্য ইনটেলেকচুয়াল আইটেমের ব্যবসা হচ্ছে। আরও অনেক বিষয়ে পরিবর্তন আসছে এবারের চুক্তিতে।

“এই ধরনের চুক্তি দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যকে অনেক সহজ করে। এই চুক্তির ফলে করফাঁকি হ্রাস পাবে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটবে। আজকে যে চুক্তিতে আমরা স্বাক্ষর করেছি, এটা দুই দেশের সরকারের মধ্যে একটা সহযোগিতা চুক্তি।”

Image

নেদারল্যান্ডসে বাংলাদেশ দূতাবাস

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তরফে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে নেদারল্যান্ডসে ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এসব পণ্যের মধ্যে আছে নিটওয়্যার, ওভেন, গার্মেন্ট, গলদা চিংড়ি, জুতা, বস্ত্র, চামড়াজাত পণ্য, বাইসাইকেল।

একইসময়ে নেদারল্যান্ডস থেকে দশমিক ৩ বিলিয়ন বা ৩০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে ক্যাপিটাল মেশিনারি, শাকসবজি, তৈরি খাদ্য উপাদান, জীবিত প্রাণী (পশু ও পাখি), খনিজদ্রব্য, কেমিক্যালস, ঔষধ সামগ্রী, অর্গানিক কেমিক্যালস, প্লাস্টিক, রাবার ।

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআইয়ের ক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডসের অবস্থান চতুর্থ, আর বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাজার হিসাবে নেদার‌ল্যান্ডসের অবস্থান নবম।

২০১৯-২০২০ অর্থবছরে নেদারল্যান্ডস বাংলাদেশে ২ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। জ্বালানি, বাণিজ্য, চামড়া খাত, চামড়াজাত পণ্য সামগ্রী, সিমেন্টসহ নানা ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে বিনিয়োগ বাড়ছে নেদারল্যান্ডসের।

বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন চুক্তিতে ৩৩টি আর্টিকেল রয়েছে। এর মধ্যে করের আওতা বিস্তৃত করতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আর্টিকেলে যেমন পরিবর্তন আনা হয়েছে, তেমনই নতুন নতুন ক্ষেত্র থেকে কর আহরণে নতুন আর্টিকেলও সংযোজন করা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে-

  • সুদ: বিদ্যমান বিধান সংশোধন করে নতুন চুক্তিতে শুধু রাষ্ট্র মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে করমুক্ত সুবিধা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

  • কারিগরি সেবার ফি: সংযোজিত নতুন আর্টিকেলটি অন্তর্ভুক্ত করার ফলে সার্ভিস তথা সেবার বিপরীতে বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ হারে কর আহরণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

  • মূলধনী মুনাফা: শেয়ার হস্তান্তর বাবদ অর্জিত মূলধনি মুনাফা বাংলাদেশে করযোগ্য হওয়ার শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তার ফলে সোর্স কান্ট্রিতে, অর্থাৎ বাংলাদেশে অর্জিত মূলধনি লাভ থেকে কর আহরণ করা সম্ভব হবে।

  • অন্যান্য আয়: বিদ্যমান চুক্তির কোনো আর্টিকেলের সাথে সম্পৃক্ত নয়- এমন কোনো আয় করদাতা যেদেশের নিবাসী, সেদেশে কর আরোপ করার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে নতুন চুক্তিতে তা সংশোধন করে যেদেশে এমন আয় উদ্ভূত হবে, সেদেশে কর আরোপ করার বিধান রাখা হয়েছে।

  • কর আদায়ে সহায়তা: কর দাবি আদায়ে সহযোগিতার লক্ষ্যে এই আর্টিকেলটি নতুন সংযোজন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে চুক্তি সম্পাদনকারী উভয় রাষ্ট্র রাজস্ব আদায়ে একে অপরকে সহযোগিতা করার বিষয় উল্লেখ আছে।

অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান, অর্থ সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, ঢাকায় নেদারল্যান্ডসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স সনজা কুইপ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।