Published : 20 Apr 2023, 03:00 PM
মিষ্টি সেমাই মুখে দিয়ে ঈদের সকাল শুরুর রেওয়াজ বাংলাদেশের পুরনো, এবারও সেই রীতি অনুযায়ী রোজার মধ্যে সেমাইয়ের দোকানে ভিড় করছেন ক্রেতারা, যদিও দাম শুনে খানিকটা ভ্রু কুঁচকে উঠছে অনেকের।
ঢাকার নিউ মার্কেট কাঁচাবাজারের এসেছিলেন আজিমপুরের ব্যবসায়ী মঈনউদ্দিন হোসেন। সেখানে একটি দোকানে সাজিয়ে রাখা বিভিন্ন ধরনের সেমাইয়ের প্যাকেটগুলো অনেক্ষণ ধরে নেড়েচেড়ে দেখছিলেন, কিন্তু নিলেন না।
কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বললেন, “অলিম্পিকের যে সেমাই আগে ১৫০ ছিল এখন সেটা ২৫০ টাকা, আর ২৫০ টাকার সেমাইটা হয়ে গেছে ৩৭০ টাকা। এটা কী?... আমরা তো তাও কিনতে পারব, যারা দিন আনে দিন খায় তারা কী করবে?
“যুদ্ধ তো সারাবিশ্বের জন্যই, নাকি শুধু বাংলাদেশের? অন্য দেশে দাম কমার খবর পাই, আমাদের দেশেই শুধু বেশি।”
বাজারে সেমাই এবং অন্যান্য অনুষঙ্গগুলোর দরদাম জেনে ঈদের আগে আগে সেগুলো কেনার পরিকল্পনার কথা জানালেন এই ব্যবসায়ী।
“প্যাকেটের চিনিগুড়া চাল ১৫৫-১৬০ টাকা, খোলাটা ১৩০। এই চাল গতবছর ১০০ টাকার নিচে ছিল। ঈদের আগে আরও বাড়লে আর কী করা যাবে? ঈদের দিন নিতে তো হবে। এইভাবেই চলতে হবে।”
ঈদের আগে সেমাইয়ের বাজারে ক্রেতাদের ক্ষোভ আর আক্ষেপ যেমন, বেচাবিক্রি কম হওয়ায় বিক্রেতাদেরও হা-হুতাশও কম নয়।
অন্য বছর রোজার এক সকালেই ‘৪০-৫০ হাজার টাকার’ সেমাই বিক্রি করতেন কারওয়ানবাজারের কিচেন মার্কেটে সেমাইয়ের পাইকারি ডিলার নাসির উদ্দিন; তবে এবার তার তুলনায় ‘অনেক কম’ বিক্রি হচ্ছে বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানালেন তিনি।
নাসিরের কথায়, “এগুলো বলে আর লাভ নাই। আমদানি আছে কাস্টমার নাই। আশায় বাসা বাইন্ধা বইসা আছি। মানুষ চুপ কইরা আছে, হাতে টাকা নাই।”
ঈদ মিষ্টান্নের বাজারে এই হালের কারণ সেমাই ও তার রান্নার উপকরণের দাম বৃদ্ধি। চলতি বছরে সেমাইয়ের সঙ্গে দাম বেড়েছে চিনি, গুঁড়া দুধ, কিসমিস, কাজুবাদাম, কাঠবাদামের। দাম বাড়তি পায়েসের চিনিগুড়া চালেরও।
“সেমাই রানতে যা যা লাগে সবকিছুর তো দাম বেশি, এই কারণে সেমাই কিনাও কমছে”, বলেন নাসির।
কারওয়ান বাজারে খুচরায় সেমাই বিক্রি করেন গ্রীন জেনারেল স্টোরের মো. ইলিয়াস। দোকানের সামনে নানা কোম্পানির সেমাই সাজিয়ে রাখলেও বিক্রিতে সন্তুষ্ট হতে পারছেন না।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “কই আর ব্যবসা? আগের মতন আর খায় না মাইনষে। সবাই খরচ কমাইছে। আগে ঈদে, শবে কদরে মানুষ সেমাই, সুজি, হালুয়া কতকিছু খাইত। এখন দেখেন না মাল সাজাইয়া বইয়া আছি, কিনার লোক নাই।”
দামের প্রভাব কেমন
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, গত বছরের এপ্রিলের শুরুতে এক কেজি খোলা সাদা আটার দাম ছিল ৩৫ টাকা। যা ওই বছরের নভেম্বরে চড়ে যায় ৬০ টাকায় এবং এই দামেই বছর শেষ হয়। নতুন বছরে এই রমজানে তা বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা কেজিতে।
সেমাই তৈরির মূল উপাদান আটা-ময়দার এই দাম বৃদ্ধির কারণে বাজারে সেমাইয়ের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা।
লাচ্ছা সেমাই উৎপাদনের সঙ্গে যুক্তরা বলছেন, ময়দা-আটার দাম বেড়েছে। ৭৪ কেজির প্রতি বস্তা ময়দা গত বছর তারা কিনেছেন ৩ হাজার টাকায়, এ বছর সেই বস্তার দাম হয়েছে ৪ হাজার টাকা ।
সেমাই ভাজতে যেসব তেল লাগে তারও দাম বেড়েছে। পাম অয়েলের ড্রাম ১৭ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। ডালডার ১৬ কেজির কার্টন গত বছর যেখানে ছিল ১ হাজার ৬০০ টাকা, এ বছর তা ২ হাজার ৮০০ টাকা।
কাওয়ানবাজার কিচেন মার্কেটের মঈনুল অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্ত্বাধিকারী মঈনুল ইসলাম দাম বাড়ায় ব্যবসা কতটুকু হবে তা নিয়ে ভীত। তার কাছেও সেমাইয়ের দাম বৃদ্ধির একটা চিত্র পাওয়া গেল।
মঈনুল জানান, বিভিন্ন কোম্পানির ৪০০ গ্রামের সেমাইয়ের প্যাকেটের দাম গত বছর যেখানে ছিল ১৯০ টাকা, এ বছর সেটি ২১০-২২০ টাকা। ২০০ গ্রামের প্যাকেট যেখানে ছিল ৩৫ টাকা এ বছর তা ৫০ টাকা। পরিমাণ ভেদে সেমাইয়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে বলে জানালেন তিনি।
“আগের তুলনায় সেমাই কম তুলেছি। ভয়ে আছি বিক্রি হবে কি না। প্রত্যাশা করি ভাল বিক্রি হবে, তবে লক্ষণ ভাল না। আগের তুলনায় ঈদ উপলক্ষে কম স্টক করেছি, মনে হয় না আগের মত বিক্রি হবে।”
পাইকারি এই বাজারে সেমাই কিনতে আসা ক্রেতা মাহমুদ ইকবাল বলেন, “সেমাইয়ের দাম যেমন বেড়েছে তেমনি অন্য অনুষঙ্গগুলোরও দাম বেড়েছে। মানুষ হয়ত একটু কম নেবে এ কারণে, তবে ঈদ আনন্দে খুব ভাটা পড়বে বলে মনে করছি না।”
দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। নিউ মার্কেট কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী মো. রুবেল বলেন, “আগের বছর এমন টাইমে কথা বলার সময় পেতাম না। কিন্তু এবার বিক্রি স্লো, কম নিচ্ছে। মাল অনেক গোডাউন করা, কিন্তু এই হিসেবে কাস্টমার নাই।”
বাড়তি চিনি-দুধের দাম
সেমাই তৈরির অনুষঙ্গ গুঁড়া দুধ আর চিনির দামও বেড়েছে বছর ব্যবধানে। টিসিবির তথ্য বলছে, গত বছরের রোজায় চিনি বিক্রি হয়েছে ৭৮ টাকা কেজি দরে, এ বছর যা ঠেকেছে ১১২ টাকায়। আর বছরের ব্যবধানে গুঁড়া দুধ কেজিতে ৬৬০ টাকা থেকে ৮০০ টাকায় পৌঁছেছে।
কারওয়ানবাজারের ব্যবসায়ী মঈনুল ইসলাম বলেন, “গুঁড়া দুধের দাম অনেক বেড়েছে। দুই-তিন মাস আগেই ৩০% দাম বাড়ছে। চিনি ছিল ৬০-৬৫ টাকা কেজি, সেইটা এবার ১১৫ টাকা কেজি। সেমাই নিলে তো চিনি-দুধও নেওয়া লাগে। এগুলার দাম বাড়লে সেমাই কেনার পরিমাণও কমে।”
স্বস্তি নেই পায়েসেও
ঈদ মিষ্টান্ন পায়েসের অন্যতম উপাদান চিনিগুঁড়া চালের দাম গতবছর ছিল ৯০-৯৫ টাকা, এ বছর তা খোলা বিক্রি হচ্ছে ১২৫-১৩০ টাকায়। তবে মানভেদে ও প্যাকেটজাত চালের ক্ষেত্রে তা পড়ছে ১৪০-১৫০ টাকা।
দাম বেড়েছে বাদাম, পায়েসে ব্যবহৃত কাজুবাদাম, কাঠবাদাম, কিসমিসেরও।
নিউ মার্কেট কাঁচাবাজারের সাথী এন্টারপ্রাইজের দোকানি মো. আলী আজগর বলেন, “কাজুবাদাম ছিল ৬০০-৭০০ টাকা সেটা এখন ৯০০-১০০০ টাকা, কিসমিস ছিল ৩০০ টাকা, যা এখন ৪৫০ টাকা, কাঠবাদাম ছিল ৬০০ টাকা কেজি, সেটি এবার ৮০০ টাকা কেজি। টুকটাক কেনাবেচা হচ্ছে। ”
নিরাপদ সেমাই মিলবে?
প্রতিবছর ঈদের আগে ভোক্তাদের জন্য সেমাইয়ের মান সুরক্ষায় তৎপরতা দেখা যায় সরকারের তরফ থেকে। গুরুত্বপূর্ণ এই ঈদ অনুষঙ্গকে নিরাপদ রাখতে এবার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
সেমাইয়ের মান পর্যবেক্ষণের ব্যাপারে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বোর্ডের সদস্য (খাদ্যভোগ ও ভোক্তা অধিকার) মো. রেজাউল করিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা একটা রেগুলেটরি বোর্ড হিসেবে সবাইকে আগে কয়েক দফা জানাই, সচেতন করি। আপনারা দেখেছেন আমরা তারকাদের সাথে নিয়ে সচেতনতা কার্যক্রম চালাচ্ছি। এরপরও কেউ না শুনলে তাকে আমরা আইনের আওতায় আনি। অনেকেই সচেতন হচ্ছেন।”
তিনি বলেন, “আমাদের কার্যক্রম চলমান আছে। তবে আমাদের লোকবল অনেক কম। আমাদের নিজেদের ইন্সপেক্টর নেই, ভাড়া করা ইন্সপেক্টর। সারাদেশে ১৭ কোটি মানুষের জন্য আমাদের ৭০০ ইন্সপেক্টর। এত কম লোকবল নিয়ে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কঠিন।”
ঈদে মানুষের জন্য নিরাপদ সেমাই নিশ্চিতের প্রসঙ্গে বলেন, “নিরাপদ মানে আপদমুক্ত। আপদ নানা ধরনের হতে পারে। সেটা রাসায়নিক, ভৌতিক নানা প্রকার হতে পারে। একজন ব্যক্তি ঘরে পরিচ্ছন্ন থেকে আপদমুক্ত না হতে পারলে তো আমরা বলতে পারব না তিনি নিরাপদ খাবার খাননি।”
সেমাইয়ের দাম ও মান নজরদারির ব্যাপারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, “রমজানের কাঁচাবাজার আমরা একটা স্থিতিশীল জায়গায় নেওয়ার চেষ্টা করেছি, তার ফলাফল আপনারা দেখেছেন। আর এখন ঈদকে সামে রেখে সেমাই, কসমেটিক্স, বাসের টিকেট এসব নিয়ে কাজ করছি।”
সেমাইতে অনেক ‘নকল হয়’ জানিয়ে তিনি বলেন, “এজন্য আমরা উৎপাদন পর্যায়ে যাচ্ছি। যেখানে উৎপাদন হয় সেখানে গিয়ে আমাদের অভিযান চলছে। আর দাম তো সেমাইয়ের কেউ নির্ধারণ করে দেয় না। আপনারা দেখছেন, বিভিন্ন জায়গায় আমরা ভেজাল ধরছি, অভিযান চালাচ্ছি, আইনের আওতায় আনছি।”