Published : 16 Sep 2026, 10:08 PM
আগের মাসের তুলনায় সামান্য বেড়ে জুলাই শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ।
আগের মাস, অর্থাৎ গত জুন শেষে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
ঋণ প্রবৃদ্ধির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিসকে বলেন, ‘‘বেসরকারি খাতের ঋণ ছাড় বাড়তে শুরু করেছে। গত জুলাই মাসে প্রবৃদ্ধি হয় ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ।’’
ঋণ বাড়াতে বেসরকারি খাতে ঘোষণা করা ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
এতে পরের মাসগুলোতে ঋণ প্রবাহ বেড়ে যাবে প্রত্যাশা করে তিনি বলেন, ‘‘সুদহার তো অনেক কমে গেছে। ব্যাংকগুলোতে টাকারও সমস্যা নেই। তাই ঋণ বৃদ্ধির তথ্য আসবে পরের প্রতিবেদনগুলোতে।’’
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ সবচেয়ে কম ছিল গত জুনে। গত ডিসেম্বরে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা ছিল, গত জুন মাসে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি সাড় ৫ শতাংশের মতো হবে।
২০২৩ সাল থেকে খরায় চলা বেসরকারি ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি গত মে মাসে ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
এমন চিত্র পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক গত জুন মাসে পরের ছয় মাসের জন্য মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমিয়ে ধরে।
বর্তমান মুদ্রানীতিতে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
মুদ্রানীতি ঘোষণার পরের মাস, অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ঋণ প্রবাহ বেড়েছে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘ব্যবসা ও বিনিয়োগ বর্তমানে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাজারে টিকে থাকার জন্য উদ্যোক্তারা লড়াই করছেন। এর মধ্যে জ্বালানি সংকট এল। এখন তা কাটতে শুরু করেছে। এগুলো ব্যবসার জন্য বড় আঘাত।’’
তিনি আরও বলেন, “এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসা সম্প্রসারণের কথা ভাবার সাহস কে করবে? আমি জানি না কীভাবে এই প্রবৃদ্ধি এলো, ঋণগ্রহীতা কারা। তারা কি ঋণ শোধ করতে পারবেন? এ নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।”
বেসরকারি এনসিসি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামসুল আরেফিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিসকে বলেন, “ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তো এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে এখনও। তার প্রভাব আমাদের অর্থনীতিতেও পড়ছে। এর মধ্যে জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে, এই সময়ে তো খুব বেশি ঋণ বাড়বে না।”
অন্যদিকে রাজনৈতিক সরকারের মেয়াদ ছয় মাসের বেশি হওয়ায় এখন বিনিয়োগ পরিবেশ ধীরে ধীরে বাড়বে প্রত্যাশা করে বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘‘ঋণ কমে যাওয়ার অনেকগুলো কারণ থাকে। সবচেয়ে বড় কারণ হলো অর্থনীতিতে চাহিদা আছে কি না।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিসকে তিনি বলেন, “উদ্যোক্তারা ঋণের অর্থ ব্যবহার করার নিশ্চিত পরিবেশ পেলেই নিবে। ঋণ নিলেই তো সুদ গুণতে হবে। এখন রাজনৈতিক সরকার এসেছে, বেশ সময়ও পার হয়েছে। এখন চাহিদা হয়ত বাড়বে।”
কোভিড মহামারীর পরের দুই বছর অর্থনীতি পুনর্গঠনের পদক্ষেপে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বেড়ে চলছিল।
ইউক্রেইন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানিপণ্যের দাম বেড়ে গেছে সেই আঁচ লাগে বাংলাদেশেও। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে টাকার মান পড়ে গিয়ে দুই বছরের মধ্যে ডলারের দর ওঠে ১২১ টাকায়।
কোভিড মহামারীর পর আমদানি বেড়ে গেলে সংকটে পড়ে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সামাল দিতে আমদানিতে লাগাম টানা শুরু করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার।
অর্থনৈতিক এই সংকটের মধ্যে চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু হয়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি টালমাটাল হওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমতে শুরু করে ২০২৫ সালের জুন পরবর্তী সময়ে।
চব্বিশের অগাস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নীতি সুদহার কয়েক মাসের মধ্যে ১০ শতাংশে উন্নীত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে মূল্যস্ফীতি কয়েক মাসের মধ্যে নিচে নামতে শুরু করে। তার সঙ্গে কমতে থাকে ঋণ প্রবাহের গতিও।
গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এলে অর্থনীতি সচল করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করে।
জুনের এমন চিত্রের মধ্যে অর্থনীতিতে নতুন ধাক্কা আসে গত ২১ জুলাই। দেশে আমদানি করা এলএনজি (আরএলএনজি বা রূপান্তরিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) রূপান্তর করে সরবরাহকারী দুটি ভাসমান টার্মিনালের একটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায়।
এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হলে রাজধানী ঢাকাতেও লোডশেডিং দেখা দেয়। বাধাগ্রস্ত হয় শিল্প উৎপাদন। কারখানাগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায়।
জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে এমন ঘটনার পরেও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ একটু বেড়েছে আগের চেয়ে। পরের মাস অগাস্ট জুড়ে সমস্যা নিয়ে চলে শিল্প খাত। মাসটিতে ঋণ প্রবাহ কেমন গেছে তার তথ্য পেতে আরো সময় লাগবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয় আগের বছরের একই মানের তুলনায় ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ।
সার্বিকভাবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন উৎস থেকে টাকা ধারের পরিমাণও কমে যাচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর।
কল মানি মার্কেট, আন্তঃব্যাংক (ইন্টারব্যাংক) রেপো ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া রেপো সুদহার প্রতিনিয়ত ওঠানামা করছে।
গত মঙ্গলবার কমে নীতিসুদহার সাড় ৯ শতাংশের নিচে নেমেছিল। বুধবার ফের সাড়ে ৯ শতাংশ সুদে লেনদেন হয়।