Published : 24 May 2026, 07:40 PM
সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানিকে ফেরাতে উৎপাদন বণ্টন চুক্তি বা পিএসসিতে পরিবর্তন এনে নতুন দরপত্র (বিডিং রাউন্ড) আহ্বান করেছে সরকার।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাসের মধ্যে ঘোষণা করা ‘অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬’ এর আওতায় আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস উত্তোলনকারী কোম্পানির জন্য ১১টি অগভীর সমুদ্র ব্লক এবং ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লক উন্মুক্ত করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
রোববার সচিবালয়ে নতুন পিএসসি ও বিডিং রাউন্ডের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়।
সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, এদিনই ‘অফশোর বিডিং রাউন্ড’ এর ঘোষণা দিয়ে ছয়টি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। ওয়েবসাইটের পাশাপাশি বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও হাই কমিশনের মাধ্যমেও তা প্রচার করা হচ্ছে।
দরপত্রের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর পর্যন্ত দরপত্রের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে আগ্রহী কোম্পানিরা জমা দিতে পারবে। আগামী ৩০ নভেম্বর দুপুর ১টা পর্যন্ত দরপত্র জমা দেওয়া যাবে। একই দিন দুপুর ২টায় দরপত্র খোলা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট ২০২৬’ এবং ‘বিডিং রাউন্ড ২০২৬’ এর ঘোষণা দিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু নতুন পিএসসির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
রপ্তানির সুযোগ রাখা নিয়ে প্রশ্নে তিনি বলেন, দেশের প্রয়োজন মিটিয়েই কেবল এ ধরনের সিদ্ধান্ত হতে পারে।
“রপ্তানি তখনই করা যাবে, যখন আমার নিজের প্রয়োজন মিটবে। আমি না খেয়ে অন্যকে খাওয়াব না।”
নতুন পিএসসিতে কোম্পানির মুনাফা পুরোপুরি বিদেশে নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। রাখা হয়নি ‘সিগনেচার বোনাস বা রয়্যালটি’।
নতুন পিএসসিতে গ্যাসের দাম নির্ধারণ আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দরের সঙ্গে মিলিয়ে করার কথা বলা হয়েছে।
অপরদিকে উত্তোলনকারী কোম্পানির গ্যাসের অংশ দেশি বাজারে তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি বা রপ্তানির সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে দুই ক্ষেত্রেই পেট্রোবাংলার আগে কেনার অধিকার থাকবে।
অগভীর ও গভীর সমুদ্র উভয় ক্ষেত্রেই তেল-গ্যাস অনুসন্ধাপনে পাইপলাইন বিনিয়োগে সহায়তার জন্য ক্রেতার মাধ্যমে ট্যারিফ পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এছাড়া উভয় ধরনের ব্লকের জন্য ১০০ শতাংশ ‘কস্ট রিকভারির’ সুযোগ রাখা হয়েছে, তবে বছরে তা ৭৫ শতাংশের বেশি হবে না।
দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অগভীর সমুদ্র ব্লকে দরপত্র দিতে হলে কোনো অফশোর ব্লকে দৈনিক অন্তত ৫ হাজার ব্যারেল তেল বা ৭৫ এমএমএসসিএফ গ্যাস উৎপাদনের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। গভীর সমুদ্র ব্লকের ক্ষেত্রে এ সীমা দৈনিক ১০ হাজার ব্যারেল তেল বা ১০০ এমএমএসসিএফ গ্যাস।
এর আগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের মার্চে নতুন পিএসসি তৈরি করে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র (বিডিং) আহ্বান করা হয়েছিল। সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সময় বাড়িয়ে সেই দরপত্র জমা দেওয়ার জন্য নভেম্বর নির্ধারণ করে। এরপরও কেউ দরপত্র জমা দেয়নি। ওই সময় সাতটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি দরপত্রের কাগজপত্র নিলেও শেষ পর্যন্ত কেউ প্রস্তাব জমা দেয়নি।
২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানের বড় সুযোগ তৈরি হয়। তবে আন্তর্জাতিক কোম্পানির আগ্রহ ধরে রাখতে পারেনি বাংলাদেশ।
সবশেষ ২০১২ সালের পিএসসির মাধ্যমে কাজ করার সব আয়োজন এগিয়ে নিয়েও চারটি বিদেশি কোম্পানির মধ্যে তিনটি পরে ছেড়ে গেছে। এতে করে দেড় দশক ধরে বলার মতো কোনো অগ্রগতিই হয়নি।
এরমধ্যে গভীর সমুদ্রের দুটি ব্লকে কাজ শুরু করেছিল কনোকোফিলিপস। দ্বিমাত্রিক জরিপের পর গ্যাসের দাম নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে তারা কাজ ছেড়ে যায়।
অপরদিকে স্যান্টোস ও পস্কো দাইয়ুও চুক্তির পর শেষ পর্যন্ত কাজ এগিয়ে নেয়নি। অগভীর সমুদ্রের এসএস ০৪ ও এসএস ০৯ ব্লকে ভারতের ওএনজিসি অনুসন্ধান চালালেও পরে তারা ছেড়ে দেয়।
এরপর ২০১৯ সালে নতুন পিএসসি করা হলেও সে সময় দরপত্র ডাকা হয়নি। পরে পিএসসি ২০২৩ এর আলোকে ২০২৪ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়।
গত প্রায় দেড় দশকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ শুরু করতে সফল না হওয়ার মধ্যে রোববার নতুন করে আরও আকর্ষণীয় পিএসসি তৈরি এবং দরপত্র আহ্বান করার কথা জানাল জ্বালানি মন্ত্রণালয়।
নতুন পিএসসিতে কী ‘চমক’ আছে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “চমক হল বিএনপি সরকার।”
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকার হওয়ায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাংলাদেশ নিয়ে আস্থা তৈরি হয়েছে।
“আমাদের নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়েই আমরা সরকার গঠন করেছি। এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় আস্থার জায়গা।
“আমরা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেছি। বিভিন্ন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয়েছে, তারা বাংলাদেশকে আস্থার জায়গা হিসেবে দেখছে।”
সরকারের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা খুবই স্বচ্ছ। দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে কোনো সিদ্ধান্ত নেব না। এ প্রতিশ্রুতি আমরা আগেই জানিয়েছি।”

ভবিষ্যতের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে টুকু বলেন, “ভবিষ্যতে কী হবে, সেটা একমাত্র আল্লাহই জানেন। তবে অনেক বড় বড় কোম্পানি ইতোমধ্যে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। বিশেষ করে আমেরিকান ও চীনা কোম্পানিগুলোর আগ্রহ রয়েছে। আমি আশা করি, অতীতে যা হয়েছে, এবার তা হবে না।”
সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম আগের বিডিংয়ে সাড়া না পাওয়ার কারণ জানতে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, তাদের আপত্তির মধ্যে ছিল গ্যাসের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, গভীর সমুদ্রের গ্যাস উপকূলে আনতে পাইপলাইন ট্যারিফ রাখা, শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিল বা ডব্লিউপিপিএফের ৫ শতাংশ অবদান পুনর্বিবেচনা এবং ব্লকগুলোর পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া।
এ চার বিষয় ধরে গত এক বছরের বেশি সময় আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি, বিদেশি পরামর্শক ও দেশীয় পেট্রোলিয়াম বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করে নতুন পিএসসি তৈরি করা হয়েছে।
আগের বিডিং রাউন্ডে তথ্যের ঘাটতির বিষয়টি এবার কীভাবে সামাল দেওয়া হবে জানতে চাইলে টুকু বলেন, “সেগুলো করতে পারব বলেই তো বিডিংয়ে গেছি।”
তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি সম্পদ মাটির নিচে রেখে আমদানিনির্ভর জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়ায় অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
“দেশের যে সম্পদ, সেই সম্পদ মাটির নিচে রেখে আমদানিভিত্তিক জ্বালানির দিকে ঝুঁকেছিলাম। এর ফলে দেশের অনেক ক্ষতি হয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ পড়েছে।”
১৯৯৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময়কার ‘বিডিং রাউন্ডের’ কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ওই সময় ব্লক পাওয়া কোম্পানিগুলোর আবিষ্কৃত ক্ষেত্রের গ্যাস এখনো দেশে সরবরাহ হচ্ছে।
এরপর আর নতুন করে বড় কোনো আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
২০১২ সালে সমুদ্রসীমা বিজয়ের পরও সমুদ্রে অনুসন্ধান না হওয়ায় সমালোচনা করে টুকু বলেন, “সমুদ্র বিজয় হয়েছে, তা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। সমুদ্রের নিচে কী আছে, তা নিয়েও অনেক কিছু বলা হয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে আহরণ করতে হবে, সেটি ভুলে যাওয়া হয়েছিল।”
তার ভাষ্য, প্রতিবেশী দেশগুলো একই ধরনের এলাকায় গ্যাস উত্তোলন করে রপ্তানি করছে, অথচ বাংলাদেশ এখনো সমুদ্রের নিচে কী আছে তা নিশ্চিতভাবে জানে না।
বাপেক্সের সক্ষমতা নিয়ে তিনি বলেন, গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানের মতো অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি এখনো রাষ্ট্রীয় কোম্পানিটির নেই।
“বাপেক্সের গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান করার মতো অভিজ্ঞতা নেই। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিও নেই। সেজন্য বাপেক্সকে আমরা বলেছি, তোমরা এই বিডিংয়ে আসো। বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কাজ করতে পারলে আসো।”
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১৮০ দিন শেষ হওয়ার আগেই বিডিং রাউন্ডে গেছে বলে দাবি করেন মন্ত্রী।
“এই বিডিংয়ের পরে দেশের আইন কানুন মেনে এবং দেশের স্বার্থ রক্ষা করে যারা ব্লক পাবে, তাদের কাছে তা হস্তান্তর করতে পারব বলে আশা করি।”
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, আগের সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি সংশোধন করে দরপত্রের নথি তৈরি করা হয়েছে। দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করেই সব কার্যক্রম হবে।
সাগরে কোনো গ্যাসক্ষেত্র আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করলে কী হবে সাংবাদিকদের এরকম এক প্রশ্নে মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোছা. মোর্শেদা ফেরদৌস বলেন, পিএসসিতে এ বিষয়ে নির্দেশনা রাখা আছে।
“পিএসসিতে স্পষ্টভাবে বলা আছে, কোনো গ্যাসক্ষেত্র আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করলে সংশ্লিষ্ট দুই দেশ একসঙ্গে বসবে। যৌথ উন্নয়নের বিষয়ে আলোচনা করে কে কত অংশ পাবে, সেটি নির্ধারণ করা হবে।”
ভূ-রাজনৈতিক বিষয় দরপত্রে প্রভাব ফেলবে কি না জানতে চাইলে জ্বালানিমন্ত্রী টুকু বলেন, “ভূ-রাজনৈতিক বিষয় তো চলছে, যুদ্ধও চলছে। এসব দেখার জন্যই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আছে। তারা কাজ করবে, সমাধান করবে। এটিকে আমি কোনো সমস্যা বলে মনে করি না।”
গ্যাসের সম্ভাব্য দাম এলএনজির চেয়েও বেশি পড়ে যাবে কি না সেই প্রশ্নে মোর্শেদা ফেরদৌস বলেন, পিএসসিতে সরকারের উৎপাদন অংশ থাকায় কার্যকর দাম কমে আসবে।
“পিএসসির বড় সুবিধা হলো প্রোডাকশন শেয়ারিং। এখানে সরকারের একটি অংশ আছে।”
তার ভাষ্য, সরকারের ফ্রি গ্যাসের অংশ বাদ দিলে দামের হিসাব বদলে যায়।
“স্বাভাবিক ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম ১০ থেকে ১৭ ডলারের মধ্যে থাকতে পারে। গভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে তা ১৩ থেকে ২০ ডলারের মধ্যে থাকতে পারে।”
আরও পড়ুন
সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে শিগগির আন্তর্জাতিক দরপত্র: জ্বালানি সচিব
সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে সাড়া মিলল না