Published : 12 Jul 2026, 09:44 PM
চট্টগ্রামে চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে বন্দরের বিভিন্ন কনটেইনার ইয়ার্ড এবং বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) পানি ঢুকে আমদানি করা তুলা, সুতা, কাপড়, শিল্পের কাঁচামালসহ প্যাকেজিং পণ্যের মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছে পোশাক খাতের চারটি সংগঠন।
তাদের দাবি, বন্যার কারণে রপ্তানির অপেক্ষায় থাকা তৈরি পোশাক, হোম টেক্সটাইল, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, কৃষিজাত ও অন্যান্য প্রস্তুত পণ্যের শিপমেন্ট বিলম্বিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে ‘নষ্ট হওয়া’ পণ্যের বিপরীতে প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি তুলেছেন এ খাতের চার সংগঠনের সভাপতিরা।
রোববার নৌ পরিবহণ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে ক্ষতিপূরণসহ এক গুচ্ছ দাবি সম্বলিত একটি চিঠি পাঠান তারা। যৌথ স্বাক্ষরের সে চিঠি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি আকারে সংবাদমাধ্যমেও পাঠানো হয়।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা হলেন- তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল ও দ্য চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক।
চিঠিতে বলা হয়, গত ৫ জুলাই থেকে টানা ভারি বৃষ্টির ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ড এবং সংশ্লিষ্ট বেসরকারি কন্টেইনার ডিপোতে পানি ঢুকে পণ্যভর্তি কন্টেইনারসহ আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ ওঠে। দীর্ঘ সময় কন্টেইনার ও পণ্য আটকে থাকায় আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের বন্দর ও জাহাজের অতিরিক্ত মাশুল, পণ্য রাখার বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি শিল্প সহায়তা নীতির আলোকে এক গুচ্ছ প্রস্তাব দেয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। এসব প্রস্তাব হল-
>> চট্টগ্রাম বন্দর এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা জরুরি ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গভাবে সচল করে আমদানি ও রপ্তানি পণ্য পরিবহনে অগ্রাধিকার প্রদান।
>> চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টম হাউস, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে একটি বিশেষ মূল্যায়ন কমিটি গঠন।
>> বন্যা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার কারণে বন্দরে আটকে থাকা কন্টেইনার ও পণ্যের বাড়তি যে খরচ বহন করতে হবে, তা স্থগিত রাখা।
>> কাঁচামাল, রপ্তানি পণ্য, খাদ্য, ওষুধ এবং অন্যান্য জরুরি ও পচনশীল পণ্যের কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, পরীক্ষণ, স্ক্যানিং, মূল্যায়ন ও সরবরাহের জন্য বিশেষ ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ ব্যবস্থা চালু।
>> ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের জন্য স্বল্প সুদের বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন এবং জরুরি কার্যকরী মূলধন ঋণ সুবিধা চালু করা। পাশাপাশি বিদ্যমান ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে সময় বৃদ্ধি, ঋণ পুনঃতফসিল এবং যৌক্তিক সময়ের জন্য ঋণশ্রেণিকরণে বিশেষ সুবিধা প্রদান।
>> দুর্যোগজনিত কারণে এলসি, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি, আমদানি, রপ্তানি, শিপমেন্ট এবং রপ্তানিমূল্য প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত নির্ধারিত সময়সীমা যৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি।
>> ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, অন্যান্য ইউটিলিটি বিল, মূল্য সংযোজন কর, কাস্টমস শুল্ক, উৎসে কর ও সরকারি ফি পরিশোধে সময় বৃদ্ধি এবং বিলম্বজনিত সুদ, জরিমানা ও সারচার্জ মওকুফ।
>> ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পুনরুদ্ধার এবং পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও সহায়তা তহবিল গঠন।
>> ক্ষতিগ্রস্ত বা গুণগত মান হারানো আমদানিকৃত কাঁচামাল ও রপ্তানি পণ্য ধ্বংস, পুনঃরপ্তানি, প্রতিস্থাপন কিংবা পুনরায় আমদানির ক্ষেত্রে সহজতর কাস্টমস, বৈদেশিক মুদ্রা ও ব্যাংকিং সুবিধা প্রদান।
>> প্রণোদনার নীতি সুবিধা দিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টম হাউস, রেলওয়ে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যখন তুমুল বৃষ্টি হয়েছিল তখন কয়েক মিনিটের জন্য জেটিতে পানি জমেছিল। সেটা কিছু সময় পরে আবার নেমেও গেছে। আমাদের ড্রেনেজ সিস্টেম সেভাবে রেডি করা। জেটিও অনেক উঁচু। জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল বা এ কারণে কোনো পণ্য নষ্ট হয়েছে, এমন কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই।”
গত সপ্তাহে অতি ভারি বৃষ্টির কারণে বন্দরের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটেছিল কিনা, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “বৈরী আবহাওয়ার কারণে আমদানিকারকরা ও অন্য স্টেক হোল্ডাররা হয়ত সময়মত আসতে পারেননি। তাই গত সপ্তাহে পণ্য খালাস অন্য সপ্তাহের তুলনায় কিছুটা কম ছিল। আর বর্হিনোঙরে যেসব পণ্য লাইটার করা হয় (বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে পণ্য স্থানান্তর) সেটা বেশি বৃষ্টি হলে বা সাগর উত্তাল থাকলে বিঘ্নিত হয়। বিশেষ করে যেসব পণ্য বৃষ্টিতে ভিজে যায়, সেগুলোর লাইটারিং বিঘ্নিত হয়। তবে আমাদের মূল জেটি বা ইয়ার্ডে খালাস কার্যক্রমে কোনো সমস্যা ছিল না।”