Published : 27 May 2026, 01:39 AM
এক সময়ে কাঁচা চামড়া সংগ্রহের সবচেয়ে বড় আড়ৎ রাজধানীর লালবাগের পোস্তার সেই চাঙা ভাব আর নেই; নানা টানাপোড়নের মধ্যে থাকা আড়ৎদাররা চান হারানো সেই জৌলুস ফেরাতে।
সেই আশা নিয়ে বরাবরের মত এবারও কোরবানি ঈদের আগে নতুন করে কাঁচা চামড়া সংগ্রহের প্রস্তুতি শুরু করেছেন তারা।
একদিকে আড়ৎ সাফ সুতরো করা হচ্ছে। চামড়া রাখতে পোস্তার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গুদাম খালি করা আর লবণ জোগাড় করা হচ্ছে জোরেশোরে। পানি ও ব্লিচিং পাউডার ছিটানোর পর কীটনাশক দিয়ে জীবানুমুক্ত করার কাজের ব্যস্ততা নজরে পড়ছে চারপাশে।
আরেকদিকে চামড়া কেনার টাকা জোগাড়েও ছুটছেন পোস্তার ব্যবসায়ীরা। ট্যানারি মালিকদের থেকে পাওনা আদায়ে দৌড়ঁঝাপের পাশাপাশি অন্য উৎস থেকেও অর্থায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। বড় আড়ৎদাররা চেষ্টায় আছেন ব্যাংক ঋণ পাওয়ার। যদিও ব্যাংকগুলো চামড়া খাতের ঋণ খেলাপিদের নতুন অর্থ দিতে অনীহা দেখাচ্ছে। এতে করে ঈদের আগে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ কমছে চামড়া কেনাকাটায়।
শুধু অর্থায়নে টান পড়েছে তা নয়, দীর্ঘদিনের চেষ্টাতেও সাভারের ট্যানারিগুলো পুরোপুরি সচল না হওয়ায় চাহিদা কমেছে কাঁচা চামড়ায়। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে গতি না আসায় এর প্রভাব পড়েছে পুরো খাতে। এ থেকে বাদ যায়নি পোস্তার আড়তের ব্যবসাতেও।

কাঁচা চামড়া সংগ্রহের প্রধান মৌসুম কোরবানি ঈদের দুদিন আগে পোস্তার ব্যবসায়ীরা শোনালেন ঈদের চামড়া কেনাকাটা ও বেচাবিক্রির গত কয়েকবারের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা। বললেন, অর্থসহ নানা সংকট শুধু পোস্তা নয়, সাভারের কাঁচা চামড়া সংগ্রহের আড়তগুলোও সুবিধা করতে পারছেন না।
রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো সাভারে চামড়া শিল্পনগরীতে চলে যাওয়ায় সেখানে কাঁচা চামড়ার কিছু আড়ৎ গড়ে ওঠে। দেশজুড়েও বিভিন্ন স্থানে রয়েছে কিছু বড় কাঁচা চামড়ার আড়ৎ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্যানারিসহ পুরো চামড়া খাতেই চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে সব আড়তেই। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই পোস্তার আড়তে সুদিন ফেরানোর আশা ছাড়ছেন না পুরান ঢাকার এসব ব্যবসায়ীরা।
এজন্য ট্যানারির কাছে থাকা বকেয়া আদায়ের পাশাপাশি সরকারি কিছু নীতি সহায়তার কথাও বলছেন তারা। দেশের কাঁচা চামড়ার বাজার ও দর বাড়াতে রপ্তানির সুযোগও চান তারা।
ওয়াব অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী মনিরুল ইসলাম পান্না বলেন, কোরবানি ঈদের সময়ে যে পরিমাণ কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয় সেগুলোর পুরোটা দেশি ট্যানারির কেনার সক্ষমতা নেই। আগে চামড়ার বড় বাজার ছিল ইউরোপের দেশগুলো। সার্টিফিকেট ইস্যুতে এখন তারা আগের মত নিচ্ছে না। এখন চামড়া বেশি যাচ্ছে চীনে।
এজন্য কাঁচা চামড়া (ওয়েট ব্লু) রপ্তানির সুযোগ বাড়ানোর কথা বলেন তিনি।
সরকারের তরফে এবার কোরবানির পশুর চাহিদা এক কোটি ১ লাখের কিছুটা বেশি ধরা হয়েছে। এর চেয়ে বেশি সংখ্যক পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত থাকার কথাও বলা হয়েছে, যেগুলোর বেশির ভাগই গরু। দেশের চামড়া শিল্পের চাহিদার ৮০ ভাগের বেশি কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয় কোরবানির এই সময়ে।
এই ঈদে ৭৫ থেকে ৮০ লাখ পিস কাঁচা চামড়া সংগ্রহের প্রস্তুতির কথা বলছেন ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান শাহিন আহমেদ।

হাঁকডাক বাড়ছে পোস্তায়
এক সময় দেশের কাঁচা চামড়ার প্রায় পুরোটাই ঢাকার লালবাগের পোস্তার আড়তে সংগ্রহ করা হত। সেখান থেকে চলে যেত কাছের হাজারীবাগের ট্যানারিগুলোতে। সাভার শিল্পনগরীতে ট্যানারি চালু হওয়ার পর ধীরে ধীরে সেখানেও গড়ে উঠছে কিছু কাঁচা চামড়ার আড়ত। তবে সেগুলো জমে না ওঠায় এখনও মূল ভরসা পোস্তাই।
এখানকার ব্যবসায়ীরা বলছেন, চামড়া খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ট্যানারির কাছে থাকা বকেয়া। গতবারের অর্ধেক টাকাও পাননি অনেক আড়ৎদাররা।
এমন প্রেক্ষাপটে কাঁচা চামড়া (ওয়েট ব্লু) রপ্তানির সুযোগ দিলে কেউ তখন আর টাকা বাকি রাখবে না বলে মনে করেন পোস্তার দিপু এন্টারপ্রাইজের পরিচালক আহমেদ কিবরিয়া।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ‘‘চামড়া খাত নিয়ে একটা শিল্প দাঁড়িয়ে আছে। সেটা নিয়ন্ত্রণ করে ট্যানারিওয়ালারা। তারাই লবিং করে দরদাম ঠিক করে। আমরা তাদের কাছে মাল (চামড়া) বিক্রি করি, কিন্তু ঠিক মত টাকা পাই না।’’
কোরবানির ঈদের আর মাত্র দুই দিন বাকি থাকলেও সোমবার পর্যন্ত গত মৌসুমের পুরো টাকা এখনো পাননি বলে দাবি তার।
ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে অনবরত যোগাযোগ রাখার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘কয়েকজন রাতে (সোমবার রাতে) টাকা দেবেন বলেছেন। অর্ধেক দিলেওতো চামড়া কিনতে পারব।’’
তার মত পোস্তার ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগ সময় এখন যাচ্ছে হাজারীবাগ ও সাভারের হেমায়েতপুরে থাকা ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগে। ট্যানারিগুলো সাভার শিল্পনগরীতে হলেও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান কার্যালয়। মালিক পক্ষের নাগাল পেতে সেসব দপ্তরে দৌড়ঁঝাপ করছেন পোস্তার ব্যবসায়ীরা।
আড়ত মালিক পান্না বলেন, বিশ্বজুড়ে শতভাগ চামড়াজাত পণ্যের ব্যবহার কমে আসছে। সিনথেটিক ও চামড়ার সঙ্গে অন্যান্য পণ্যের মিশেল দিয়ে তৈরি হচ্ছে বাহারি সৌখিন পণ্য। সেই ধরনের কারখানা বাংলাদেশে খুব একটা নেই।

এজন্য কাঁচা চামড়া (ওয়েট ব্লু) রপ্তানির সুযোগ দেওয়ার দাবি তুলে তিনি বলেন, “ট্যানারি সব চামড়া নিতে পারে না। তাই চাইলেও দাম ওঠানো সম্ভব না। কিন্তু খরচ তো প্রতিবছরই বাড়ছে চামড়া সংরক্ষণে। এখন সরকার রপ্তানির সুযোগ দিলে ডলারও আসবে, চামড়ার দামও বাড়বে। গরিব মানুষের উপকারও হবে। চামড়ার টাকা তো গরিবের হক। আমাদের ব্যবসাও টিকে যাবে।”
আগের বারের মত এবার ১৫০০ থেকে ১৬০০ পিস কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। এজন্য প্রয়োজনীয় পুরো লবণ কিনে রেখেছেন। প্রতি বস্তা (৭৪ কেজি) মোটা লবণের দর পড়ছে এক হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত।
সুমন এন্টারপ্রাইজের পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুছ এবার লবণের জন্য খরচ বাড়ার তথ্য দিয়ে বলেন, পরিবহন ব্যয়সহ এবার প্রতি বস্তায় লাগছে এক হাজার ১০০ টাকা। আগের বার যা ছিল ৯৫০ টাকার মত।
শুধু কোরবানির সময় নয় পোস্তায় সারা বছর রাজধানীতে জবাই হওয়া পশুর চামড়া আসে। কাছের জেলার মুন্সিগঞ্জ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকেও চামড়া আসে দৈনিক।
সাভারের আড়তের চেয়ে পোস্তায় নিয়মিত অস্থায়ী শ্রমিক পাওয়ার তথ্য দিয়ে আরেক আড়ৎদার মঞ্জুর হাসান বলেন, ‘‘পোস্তায় যত কম খরচে চামড়া রাখা যাবে, অন্য কোথাও তা সম্বব না। ট্যানারি যেখানেই যাক, চামড়া পোস্তায় আসবে এই কারণেই। তাই সরকার সহযোগিতা করলে পোস্তা আবার গরম হয়ে যাবে সারা বছর।’’
কাঁচা চামড়ার এসব ব্যবসায়ীদের বেশির ভাগই উত্তরাধিকার সূত্রে এ ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। তাদের আবাসও পোস্তাসহ পুরান ঢাকার আশপাশের এলাকা হওয়ায় এখান থেকে ব্যবসা চালানো সহজ বলে তুলে ধরেন মনিরুল ইসলাম পান্না। এ কারণে সেখানে আড়তের টিকে থাকা সহজ বলে মনে করছেন তিনি।

তার দাবি, ওয়েট ব্লু রপ্তানির সুযোগ দিতে হবে। ট্যানারি মালিকদের কথায় সরকার চললে চামড়া শিল্পের উন্নতি হবে না।
স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা ও ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে ১৯৯০ সালে কাঁচা চামড়া এবং ওয়েট ব্লু রপ্তানিতে সরকার লাগাম টানে। প্রায় ৩৫ বছর পর গত ২০২৫ সালে শর্তসাপেক্ষে রপ্তানি তিন মাসের জন্য উন্মুক্ত করে সরকার। কিন্তু তাতে খুব একটা সুবিধা হয়নি।
পোস্তার ব্যবসায়ী আহমেদ অ্যান্ড সন্স এর পরিচালক আব্দুস সোবহান বলেন, কোরবানির সময়ে একসঙ্গে অধিক পরিমাণ চামড়া সংরক্ষণ করে রাখতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। যে কারণে কোরবানির সময়ে কাঁচা চামড়া রপ্তানির সুযোগ দিলে অর্থায়নের সংকট যেমন দূর হবে তেমনি ন্যায্য দামও পাওয়া যাবে।
আরেক ব্যবসায়ী পান্না বলেন, কোরবানির সময়ে আসা চামড়া অন্য সময়ের তুলনায় একটু বেশি মোটা হওয়ায় এক মাসের বেশি আড়তে রাখা যায় না। আবহাওয়া ভালো থাকলে, পরিচর্চা করলে সেটা আড়াই থেকে তিন মাস হয়। এরপর সেগুলো নষ্ট হতে শুরু করে।
রপ্তানি করার সুযোগ এ সময়েই দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনজুর হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এখন চীন থেকে ক্রেতা আসছে বেশি। তারা আড়তে এসে চামড়া দেখছে। ট্যানারিতেও যাচ্ছে। তবে তারা সরাসরি আড়ৎ থেকেই নিতে চায়।
এ কারণে বাজার দর চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, “রপ্তানির সুযোগ দিলে অনেক দেশের ক্রেতারা দাম জানাবে। যেখানে বেশি পাওয়া যাবে সেখানে চামড়া পাঠাতে পারব। তাহলে চামড়ার দাম বাড়বে। নইলে গত বছরের তুলনায় খুব বেশি বাড়বে বলে মনে হয় না।’’

খেলাপি বাড়ায় কমছে ঋণ, পরিসর ছোট করছেন ব্যবসায়ীরা
এক দশক আগে যে গরুর কাঁচা চামড়া বিক্রি হত ৪-৫ হাজার টাকায়, তেমন একটি গরুর চামড়ার দাম ছিল সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে। দাম পড়ে যাওয়ায় আড়ৎদাররা যেমন চামড়া বিক্রির টাকা পাচ্ছেন না, তেমনি অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ায় এ খাতে ব্যাংক ঋণের খেলাপির পরিমাণও কম নয়।
এরপরও প্রতিবছর চামড়া সংগ্রহে ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোকে নানা নীতি সুবিধা দিয়ে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এবার ঋণ নবায়নের সুবিধা দিয়ে চলতি মূলধন দেওয়ার নীতি দিয়েছে।
তারপরও নতুন ঋণের চাহিদা খুব একটা বাড়ছে না এ খাতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে চামড়া সংগ্রহে ঋণ যায় মাত্র ৬৫ কোটি টাকার। অথচ ব্যাংকগুলোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৪৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার। এর আগের বছরে ৬১০ কোটি টাকার লক্ষ্যের বিপরীতে ঋণ যায় ১২৫ কোটি টাকা। আর ২০২৩ সালে ঋণ যায় ২৭০ কোটি টাকা। গত তিন বছর ধরেই ঋণ চাহিদা কমছে এ খাতে।
চড়া সুদ ও মুনাফা কমে যাওয়ায় ব্যাংক ঋণের পরিবর্তে ব্যবসার পরিধি নিয়ন্ত্রণ করার কথা বলছেন এ খাতের উদ্যোক্তা ও আড়ৎদাররা। নিজের পুঁজি খাটিয়ে ব্যবসা করতে গিয়ে তারা কাঁচা চামড়ার দর কমিয়ে দিচ্ছেন।
সরকার গতবারের ধারাবাহিকতায় এবারও কিছুটা দাম বাড়িয়ে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের নতুন দর নির্ধারণ করে দিয়েছে। গরুর চামড়ার দাম গতবারের চেয়ে ২ টাকা এবং খাসির চামড়ার দাম বাড়ানো হয়েছে ৩ টাকা।
২০২৫ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দর বাড়ানো হয়েছিল ৫ টাকা, বকরি ও খাসির বেলায় ২ টাকা।
এবার ঢাকায় ট্যানারি ব্যবসায়ীরা লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া কিনবেন ৬২-৬৭ টাকা দরে। আগের বছরে যা ছিল ৬০-৬৫ টাকা। ঢাকার বাইরে এ দর হবে ৫৭-৬২ টাকা। আগের বছর যা ছিল ৫৫-৬০ টাকা।
আর লবণযুক্ত খাসির চামড়ার দর ঠিক করা হয় ২৫-৩০ টাকা এবং বকরি ২২-২৫ টাকা। আগের বছরে যা ছিল খাসির চামড়া ২২-২৭ টাকা এবং বকরির চামড়া ২০-২২ টাকা।