Published : 09 Oct 2025, 12:49 AM
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদের বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতি, স্বার্থের সংঘাত, অনৈতিক বিনিয়োগ ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের সহকারী পরিচালক মো. নাজমুল ইসলামকে এই অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দুদকের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম অনুসন্ধান শুরুর বিষয়টি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন।
ইসলামী ব্যাংকের আগে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ। সম্প্রতি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তার সময়ে সংঘটিত একাধিক অনিয়ম ও আর্থিক অসঙ্গতি নিয়ে একটি বিশদ প্রতিবেদন দুদকে পাঠায় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই দুদক এই অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “বিএফআইইউর পাঠানো প্রতিবেদনে তার এমডি থাকাকালে সংঘটিত একাধিক আর্থিক অনিয়মের তথ্য এসেছে। যাচাই-বাছাই কমিটি (যাবাক) প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করে অনুসন্ধানের সুপারিশ করে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।”
বিএফআইইউ'র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রূপালী ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ ‘ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, ঋণ জালিয়াতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের মাধ্যমে শতকোটি টাকার অনিয়মে’ জড়িত ছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাস কর্পোরেশন নামে একটি কোম্পানির অনুকূলে ২০১৯ সালে ২ কোটি ১০ লাখ টাকার ক্যাশ ক্রেডিট (সিসি) ঋণ অনুমোদন করা হয়। পরে ওই ঋণের একটি বড় অংশ সাবেক এমডি ও তার ছেলের ইউসিবি প্রিন্সিপাল শাখার ব্যক্তিগত হিসাবে স্থানান্তরিত হয়।
ঋণগ্রহীতা কোম্পানির মালিক ছিলেন ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদের চাচাতো ভাই মো. শামসুল সালেহীন। বর্তমানে ঋণটির বকেয়া ৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা এবং এটি ‘মন্দমানে’ শ্রেণিকৃত।
বিএফআইইউ বলেছে, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যথাযথ কাস্টমার ডিউ ডিলিজেন্স (সিডিডি) সম্পন্ন না করেই ঋণ অনুমোদন দেয় এবং কোনো সন্দেজনক লেনদেনের তথ্য (এসটিআর) দাখিল করেনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে রূপালী ব্যাংক ক্যান্ডলস্টোন ইনভেস্টমেন্ট পার্টনার্স লিমিটেড–এর মিউচুয়াল ফান্ডে ১৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে, যার প্রতিটি ইউনিটের ফেইস ভ্যালু ছিল ১০ টাকা, যদিও তখন বাজারে ফান্ড ইউনিটের সর্বোচ্চ দাম ছিল মাত্র ৫ টাকা।
এছাড়া ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের অনুকূলে ৩৬৪ কোটি ৩১ লাখ টাকার ডিভিডেন্ড মওকুফ করা হয়। পরে ওই প্রতিষ্ঠানের হিসাবে থেকে ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদের ব্যক্তিগত হিসাবে ২০.৫৯ লাখ টাকা স্থানান্তরের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে।
ট্রেজারিতে তহবিল সংকট থাকা সত্ত্বেও তিনি বেক্সিমকো কমিউনিকেশনস লিমিটেডের করপোরেট বন্ডে ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন, যেখান থেকে কোনো কুপন বা সুদ আদায় হয়নি।
একইভাবে পদ্মা ব্যাংক পিএলসিতে ১০ কোটি টাকার এফডিআর, বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেডের প্রি–আইপিও শেয়ারে ৩০০ কোটি টাকা, এবং বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক বন্ডে ২০০ কোটি টাকার বিনিয়োগকে প্রতিবেদনে ‘অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক’ বলা হয়েছে।
বিএফআইইউ বলেছে, ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদের নেতৃত্বে রূপালী ব্যাংকের আইসিটি বিভাগের ক্রয়প্রক্রিয়ায় (প্রকিউরমেন্ট) ‘স্বজনপ্রীতি ও স্বচ্ছতার ঘাটতি’ দেখা যায়। তালিকাভুক্ত নয় এমন দুটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে ব্যাংক ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকার বেশি বিল পরিশোধ করে, যার একটির মালিক ছিলেন ব্যাংকের সাবেক এমডি এবং অন্যটির মালিক ছিলেন এক সাবেক পরিচালক।
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠে। প্রতিবেদনে অনুমোদনহীন বিদেশযাত্রা, ব্যাংকের খরচে ব্যক্তিগত ভ্রমণকে অফিসিয়াল ট্যুর হিসেবে উপস্থাপন এবং পূর্ব–নিশ্চয়তা ছাড়া করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকের সাথে সভায় অংশ নিতে যাওয়ার মত ঘটনার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।
যাত্রাপথে তার নিউ ইয়র্কের পরিবর্তে সান ফ্রান্সিসকো যাওয়ার তথ্য তুলে ধরে 'ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে' নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে বিএফআইইউ।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার ১১ মাসের মাথায় গত জুলাইয়ে পদত্যাগ করেন ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ।
২০২৪ সালের অগাস্টে পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নরের দায়িত্ব পান আহসান এইচ মনসুর। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেন। তাতে বিতর্কিত ব্যবসায়ী এসআলমের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয় ব্যাংকটি।
এরপর রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী ও রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করা ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয় ২০২৪ সালের অগাস্টে।
কিন্তু বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়ার পর গত ৩ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের (বিআরপিডি) দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহাম্মদ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদকে ডেকে পাঠান। সে সময়ই তাকে পদত্যাগ করতে বলা হয়–এমন খবর কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে আসে।
এর মধ্যে ১৫ জুলাই ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ, তার স্ত্রী মর্জিনা বেগম, দুই ছেলে জুন্নুন সাফওয়ান ও জুনায়েদ জুলাকারনায়েন টিয়ান এবং মেয়ে তাসমিয়া তারান্নুম নওমির ব্যাংক হিসাব তলব করে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
পরদিন ইসলামী ব্যাংকে অভিযান চালিয়ে বিএফআইইউ ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। তিনি ব্যাংক থেকে কী কী সুবিধা নিয়েছেন, সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র সফরে ব্যাংক থেকে কোনো খরচ নিয়েছেন কিনা, নিলে কোন খাতে নিয়েছেন– সেসব তথ্য নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।