ঈদ মৌসুমেও বঙ্গবাজার ‘ঘুমিয়ে’

খুচরা-পাইকারি, কোথাও ক্রেতা নেই। বিক্রেতারা বলছেন, লোকে এখন তুলনা করে ফুটপাতের সঙ্গে। দাম বলে কম।

আবুল বাসার সাজ্জাদবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 2 April 2024, 02:56 AM
Updated : 2 April 2024, 02:56 AM

আগুনের ছাই হওয়া বঙ্গবাজারে সুদিন ফিরছে না। বহুতল মার্কেট নির্মাণের আগে অস্থায়ী দোকানে এবার ঈদ কেনাকাটা জমেনি।

ঈদের দেড় সপ্তাহেরও কম সময় বাকি থাকতেও আশানুরূপ ক্রেতার দেখা পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। অথচ আশা ছিল শবে বরাতের পর থেকেই ব্যস্ত সময় পার করবেন তারা।

সোমবার বঙ্গবাজার মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, দুপুরে ক্রেতাশূন্য ছিল মার্কেট। তাই অলস সময় কাটাচ্ছেন বিক্রেতারা। কেউ কেউ দোকানেই ঘুমাচ্ছিলেন, কেউ মোবাইলে গেমস খেলছিলেন। বাকিদের বসে আড্ডা দিতে দেখা যায়।

বিকালের দিকে হাতেগোনা কয়েকজন ক্রেতাকে আসতে দেখা গেল। তারাও কিনেছেন কম, দামাদামি করে ফিরে গেছেন বেশিরভাগ।

রাজধানীতে কাপড়ের পাইকারি দোকানগুলোর মাঝে বঙ্গবাজার ছিল খুবই জনপ্রিয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খুচরা ব্যবসায়ীরা এখান থেকে কাপড় কিনে নিতেন পাইকারি দরে।

প্রায় এক বছর আগে ২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল ঈদের আগে আগে আগুনে পুড়ে যায় কাঠের তৈরি দোতলা মার্কেট, হাজারো ব্যবসায়ী চরম ক্ষতির মুখে পড়েন। কেবল তাই না, যে সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা ছিল, নষ্ট হয়ে গেছে তাও। ফলে খুচরা ব্যবসায়ীরা যারা এখান থেকে পণ্য কিনে নিতেন তারাও কয়েক মাসে বিকল্প ব্যবস্থা করে নেন।

সেখানে অস্থায়ী দোকান ভেঙে বহুতল মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনা এগিয়ে গেছে অনেকটাই। এই কাজ শুরু হলে কয়েক বছর বঙ্গবাজারকেন্দ্রিক ব্যবসা নষ্ট হবে অনেকটাই। সে সময়ের কথা ভেবে পাইকারির জন্য অন্য উৎস খুঁজে নিয়েছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। সব মিলিয়ে বঙ্গবাজারে এখন দুর্দিন।

আগুন লাগার আগে রমজানের শুরুর আগে খুচরা বিক্রেতাদের যে ভিড় দেখা যেত, তা এবার দেখা যায়নি। খুচরা ক্রেতারাও আসছেন না। ফলে খুচরা-পাইকারি সব ক্রেতাই হারিয়েছে বঙ্গবাজার মার্কেট।

আগে প্রথম তলায় ছিল গার্মেন্টস পণ্য, থ্রি পিস, ওয়ান পিস, টি-শার্ট, প্যান্টের দোকান। দ্বিতীয় তলায় ছিল শাড়ি।

এখন এক তলা মার্কেটের নিচ তলায় গার্মেন্টস পণ্য বিক্রি হলেও শাড়ি বিক্রেতারা চলে গেছেন পাশের এনএস টাওয়ারে।

আফছার গার্মেন্টসের বিক্রেতা মো. লিটন বলেন, “আসলে আমাদের বঙ্গ মার্কেটে সব পাইকারি দোকান। সেই হিসেবে শবে বরাতের পর থেকেই ১৫ রোজা পর্যন্ত বেচাবিক্রি চলে ধুমধাম করে। এবার ঈদের বাকি ১০ দিন। এখনও কাস্টমার তেমন নাই বললেই চলে।

“এখন ক্রেতা ভাবে এটা হয়ত ফুটপাত। তাই এখান থেকে কেনাকাটায় আগ্রহ কম।”

ইমন গার্মেন্টসে কাপড় দেখে পছন্দ হওয়ার বিক্রেতা সিয়াম দেওয়ানকে দাম কমাতে বললেন আজিজুল ইসলাম।

তার দাবি, ‘এটা এখন ফুটপাত।’ তাই বেশি দাম হওয়ার কথা না।

বিক্রেতা সিয়াম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা আগের মতই কিছু দামি মাল আনি। সমস্যা হলো এই মার্কেটকে এখন ফুটপাত মনে করে মানুষ। তাই বেশি দামের মাল নিতে চায় না।

“আগে একদর হিসেবে বিক্রি করতাম। এখন সেই একই মাল যদি আগের দাম চাই কাস্টমার বলে দাম বেশি।”

আপডেট কালেকশনের বিক্রেতা নাহিদ আলম বলেন, “এই মার্কেটে লেডিস মালের চাহিদা মূলত বেশি। কিন্তু রমজানে অন্য সময়ের তুলনায় লেডিস মাল কম চলে।”

মায়া গার্মেন্টসের বিক্রেতা মো. ইউসুফ বলেন, “বেচাকেনা একেবারেই নাই ভাই। ভাবছিলাম ঈদ উপলক্ষে কিছু বেচতে পারমু। কিন্তু পারলাম না। ক্রেতাই নাই মার্কেটে।”

ক্রেতা আসছে না কেন- প্রশ্নে তিনি বলেন, “আসলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না। মানুষের খেয়ে বেঁচে আর ঈদ করার জন্য টাকা নাই। তাই ক্রেতা নাই।”

স্থায়ী মার্কেটের অপেক্ষা

আগুন লাগার পরে বিক্রেতাদেরকে ২৫ হাজার করে টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল। তবে এই টাকা তাদের খুব একটা কাজে লাগেনি। তারা একটা স্থায়ী মার্কেট প্রত্যাশা করছেন।

তামিম গার্মেন্টসের বিক্রেতা রিয়াজুদ্দিন বলেন, “৫ হাজার নাম নিয়েছিল। তার মধ্যে তিন থেকে চারশ দোকানি টাকা পায় নাই। আর এই টাকা দিয়ে খুব উপকার হয়ে গেছে ব্যাপারটা এমনও না। একটা স্থায়ী মার্কেট হলে আমাদের আগের অবস্থা ফিরে পাব।”

আশরাফ গার্মেন্টসের বিক্রেতা মো. রাজু মোল্লাহ বলেন, “আমাদের মার্কেটের যখন জশ ছিল। তখন দামি মাল চলত। এখন কিছু দামি মাল আনছি। কিন্তু চলে না। ক্ষতির মধ্যে আছি।

“কাস্টমার এসে মাল দেখে পছন্দ করে ঠিকই, কিন্তু দাম দিতে চায় না। বলে, ‘ফুটপাতে আইছি এত দাম দিয়া কিনমু কেন?’

থ্রি-পিস কিনতে আসা আসমা ইসলাম বলেন, “আগে আরও বেশি কাপড় ছিল এই মার্কেটে। এখন কাপড়ও কম।”

সন্তানের জন্য ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছেন তাসিন আক্তার। তিনি কয়েক দোকান ঘুরে কাপড় দেখলেন। এক দোকানে দামাদামি করেও কেনা হয়নি।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, ‘যেসব পছন্দ হয় সেসবের দাম বেশি মনে হচ্ছে। মার্কেটের পরিবেশের তুলনায় দাম বেশি হলে তো কেনা সম্ভব না।”

আরেক ক্রেতা আব্দুল আওয়াল বলেন, “আগের তুলনায় এখন কম আসি। আগুন লাগার আগে তো অনেক আসা হইত শপিং করতে। এরপরে আজ প্রথম আসলাম। এখানের কাপড়গুলো ভালো পাওয়া যায়, দামও কম।”