Published : 25 May 2026, 12:29 AM
‘অতিরিক্ত’ কর আরোপের কারণে দেশের কোমল পানীয় খাতের প্রবৃদ্ধি ‘থমকে আছে’ বলে মনে করছেন কাজী নাজমুল হাসান।
আব্দুল মোনেম লিমিটেডের কোকাকোলা বিজনেস ইউনিটের এই প্রধান নির্বাহীর (সিইও) পর্যবেক্ষণ হলো, কর কমালে কোমল পানীয় খাতে সরকারের রাজস্ব তিন গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
নানা উৎসব কিংবা গ্রীষ্মের খরতাপে কোমল পানীয়ের চাহিদা বেড়ে যায়। সামনে কোরবানির ঈদেও পণ্যটির কাটতি বাড়বে।
এমন প্রেক্ষাপটে কোমল পানীয় খাতের ব্যবসার হালচাল কেমন যাচ্ছে, রপ্তানির সুযোগ কতটা কিংবা ব্যবসা বাড়াতে কেমন পরিবেশ প্রয়োজন— এমন নানা বিষয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নিয়মিত আয়োজন ‘চিনওয়্যাগ উইথ দ্য চিফস’ এ কথা বলেন কাজী নাজমুল হাসান।
পণ্যটির প্রধান ক্রেতা কারা, সেই প্রশ্নে কোমল পানীয় খাতে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করা কাজী নাজমুল বলেন, “যে দেশে মধ্যবয়সী মানুষ যত বেশি, সে দেশে কোমল পানীয়ের গ্রোথ ততো বেশি।
“আমাদের দেশে, বিশেষ করে তরুণ থেকে মধ্যবয়সী ভোক্তা অনেক বেশি। আমরা পণ্যটাকে এমনভাবে বাজারজাত করেছি, যেন সেটা প্রত্যেকে কিনতে পারেন। আমরা কাঁচের বোতল ২০ টাকায় দিচ্ছি। আবার ‘প্রিমিয়াম সেগমেন্টের’ জন্য ৭০ টাকা আছে। সুতরাং পণ্যটা সবার জন্য।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে আমরা ২০২১ সালে কোকাকোলা বিক্রিতে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি দেখেছি। আমাদের মরহুম মোনেম স্যার যখন ছিলেন, উনার যে অ্যাগ্রেসিভনেস ছিল কোকাকোলার প্রতি, দেখা গেছে যে কোকাকোলা উনাকে একটা লক্ষ্য দিয়েছে। উনি সেটা কমপ্লিট করার জন্য এমনও হয়েছে যে, এক কেইস কোকাকোলা বিক্রি করলে যে রেভিনিউ আসে, তার চেয়ে বেশি খরচ উনি সেখানে করেছেন।”
কোমল পানীয় খাতে আব্দুল মোনেমের যুক্ত হওয়া নিয়ে কাজী নাজমুল বলেন, “আমরা কোকাকোলার সঙ্গে আছি ১৯৮২ সাল থেকে। আমাদের বর্তমানে কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে দুটি কারখানা আছে।
“চট্টগ্রামেরটা মূলত কাঁচের বোতলের। ওটাতে এখন প্রোডাকশন হচ্ছে না। আমাদের পুরো প্রোডাকশন এখন আসছে কুমিল্লা থেকে।”
আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এই খাতের প্রবৃদ্ধি কেমন হতে পারে, সেই জিজ্ঞাসায় কাজী নাজমুল বলেন, “এটা নির্ভর করবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং এই খাতের প্লেয়ারদের চেষ্টার ওপর। তবে আমরা যেটা দেখছি, বর্তমান মন্দাবস্থার কারণে গ্রোথ অনেকটা থমকে আছে।
“ইকোনমি যতো পজিটিভ টার্নে যাবে… আমরা যেটা দেখছি, আগামী পাঁচ বছরে বর্তমান ইন্ডাস্ট্রি যেটা আছে, সেটা অন্তত দ্বিগুণ হবে।”
সরকারের কাছে কী প্রত্যাশা, সেটা জানতে চাইলে কাজী নাজমুল বলেন, “যত বেশি বিজনেস হবে, সরকার তত রেভিনিউ পাবে।
“আমাদের বেভারেজে ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ ট্যাক্স। এত ট্যাক্স আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে কোথাও নেই। আমরা যেটা চাইব, যদি ট্যাক্সটা সহনীয় পর্যায়ে আনা যায়, তাহলে সরকারের রাজস্ব তিন থেকে চারগুণ বাড়বে।”
রাজস্ব বাড়ার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। অতিরিক্ত ট্যাক্সের কারণে আমরা দামটা কমাতে পারছি না। ইন্ডাস্ট্রির গ্রোথ গড়পড়তা। সরকার যদি ট্যাক্স কিছুটা কমায়, তাহলে আমরা দাম কমাতে পারব। তখনই পণ্যটা দেশের সবাই কিনতে পারবে। বিক্রি বাড়লে এখন এই খাত থেকে সরকারের যে রেভিনিউ, তা তিন থেকে চারগুণ করা সম্ভব।”
কোমল পানীয় স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়, এমন একটা ধারণা অনেকের মধ্যে আছে। তবে এ ধারণার সঙ্গে একমত নন কোকাকোলার এই কর্মকর্তা।
পাল্টা প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “কোকে (কোকাকোলা) কী আছে, যেটা স্বাস্থ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক? আছে চিনি। আমাদের প্রত্যেকটা জিনিসে চিনি আছে। কোক অস্বাস্থ্যকর নয়।
“আমি যে চা খাচ্ছি…একটা কোকে ১১ শতাংশ চিনি থাকে। কিন্তু চায়ে কত চিনি খাচ্ছি, সেটা কিন্তু বলছি না। আমাদের চিনিমুক্ত পণ্য আছে; স্বাদ একই রকম। যারা একেবারে চিনি এড়িয়ে চলতে চান, তাদের জন্যও পণ্য আছে। তাই কোক ও সুস্বাস্থ্যকে আমি সাংঘর্ষিক মনে করি না।”
দেশের বাজারে নতুন নতুন দেশীয় ব্যান্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাড়ছে।
সেই প্রতিযোগিতা সামলাচ্ছেন কীভাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বাজার বড় হলে নতুন নতুন ব্র্যান্ড আসে। আর এই বাজারে কিন্তু বহুজাতিক ব্র্যান্ডগুলোই এতদিন প্রভাব বিস্তার করেছে। যখন ইন্ডাস্ট্রির পরিসর বাড়ছে, তখন নতুন নতুন স্থানীয় ব্র্যান্ড আসছে এবং প্রতিযোগিতা করছে।”
দাম বাড়ানোর প্রশ্নে কাজী নাজমুল বলেন, “কোভিডের পর পশ্চিম এশিয়া নিয়ে সংকট, ইউক্রেইন যুদ্ধ… সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার কারণে প্রত্যেকটা জিনিসের দাম বেড়েছে।

“আমরা চিনির কেজি কিনতাম ৪৬ টাকায়। সেই একই চিনি আমাদের ১৪৫ টাকায় কিনতে হয়। আমাদের বোতলে যে প্লাস্টিক ব্যবহার হয়…এর প্রত্যেকটা জিনিসের দাম বেড়েছে।
“২০২২-২৩ সালের দিকে এসব কারণে সবগুলো ব্র্যান্ড যখন দাম বাড়াল, তখন বিক্রি উল্লেখযোগ্য কমে গেল। তখন কোম্পানিগুলো দামটাকে সহনীয় পর্যায়ে আনার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্যাকে মনোযোগ দিল। যেমন আমরা ২০০ মিলিতে মনোযোগ দিলাম। কোম্পানিগুলোর সবাই মুনাফা কমিয়ে চেষ্টা করেছে বাজারকে সহনীয় রাখা। ”
কিছুদিন আগে ইসরায়েল সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে দেশব্যাপী কোকাকোলা বর্জনের ডাক দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টিকে কীভাবে সামলালেন, সেই প্রশ্নও করা হয় কাজী নাজমুলকে।
জবাবে তিনি বলেন, “প্রথমত এটা ডিজিটাল যুগ। সবার কাছেই তথ্য সহজলভ্য। কোকাকোলা যুক্তরাষ্ট্রের ব্র্যান্ড, এটা সবাই জানে। কোকাকোলার যখন জন্ম হয়, তখন ইসরায়েল বলে কোনো রাষ্ট্র ছিল না।
“কোকাকোলার প্রতিষ্ঠাতা জন পোমবারটন ইসরায়েলের ছিলেন, এরকম কোনো তথ্য নেই। তিনি খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী ছিলেন। উনাকে ইহুদিদের সঙ্গে যুক্ত করে, এমন কোনো তথ্য নেই। কোকাকোলা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। এটাকে কেউ যদি মুসলমান কোম্পানি বলে, বলতে পারে, মুসলিম শেয়ার হোল্ডার আছে। হিন্দু কিংবা খ্রিষ্টানও বলতে পারে। কিন্তু এগুলো আসলে কোনোটাই সত্য না; এটা একটা গ্লোবাল কোম্পানি।”
বোতলজাত পানীয় খাতের অন্যতম সমালোচনা প্লাস্টিক দূষণ। কোকাকোলা এ বিষয়ে কী ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে জানতে চাইলে সিইও বলেন, “আপনারা লক্ষ্য করলে দেখবেন, বাজারে অন্য পানীয়ের চেয়ে কোকাকোলার বোতলের প্লাস্টিক একটু পাতলা। এটা করা হয়েছে প্লাস্টিকের ব্যবহারটা কমানোর জন্য। আর দ্বিতীয়ত দেখবেন, আমাদের বোতলে লেখা আছে, আমরা ‘রিসাইকেল’ করি। এটার জন্য আমাদের পার্টনার আছে।
“আমরা চেষ্টা করি, আমরা যতটুকু প্লাস্টিক মার্কেটে দিচ্ছি, অন্তত তার ৭০ শতাংশ যেন আমরা ‘রিসাইকেল’ করে ব্যবহার করতে পারি। আমরা এখনো ৭০ শতাংশে পৌঁছাতে পারিনি, তবে চেষ্টা করছি।”