Published : 01 Jun 2026, 01:01 PM
ইসলামী ব্যাংকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমের নিয়োগ নিয়ে মতিঝিলের দিলকুশা এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
সোমবার বেলা সাড়ে ১০টর দিকে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে সড়কের দুই প্রান্তে পুলিশ অবস্থান নিয়ে চলাচল বন্ধ করে দেয়। দুই প্রান্তে পুলিশ থাকলেও মাঝখানে ছোটো ছোটো দলে অবস্থান নিয়ে রয়েছে সচেতন গ্রাহক ফোরাম। এ এলাকায় পুলিশ ভ্যানের পাশাপাশি জলকামান দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে।
ঈদের ছুটির পর প্রথম কর্মদিবসের সকালে সচেতন গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন একদল ব্যক্তি। জামায়াতপন্থি হিসেবে পরিচিত প্লাটফর্মটির সদস্যদের লক্ষ্য করে টিয়ারশেল ছুড়ে ও জলকামান দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ সতর্ক অবস্থান নেয়।
খানিক বাদে সচেতন গ্রাহক ফোরামের সদস্যরা ফের ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে অবস্থান নিয়ে সমাবেশ শুরু করেন।
খুরশীদ আলমকে এস আলম গ্রুপের সহযোগী আখ্যা দিয়ে তাকে সরানোর দাবি জানাচ্ছেন আন্দোলনকারীরা। তারা বলছেন, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপের দখলে যাওয়ার আগে যারা পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন তাদেরকেই ফেরাতে হবে।

সমাবেশে সচেতন গ্রাহক ফোরামের সদস্য খন্দকার মাহবুবুল হক বলেন, “ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সময় থেকে আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে। এই ব্যাংক পরিচালনা করতে শরীয়াহ জানতে হবে, সৎ থাকতে হবে।
“ইসলামী ব্যাংকে যারা আছেন—তারা সবাই সৎ, আর ধর্মীয় জ্ঞান রয়েছে। তারাই পারবে ব্যাংক চালাতে। যাকে দেওয়া হয়েছে-তিনি তো এ বিষয়ে জানেন না।”
তিনি বলেন, ‘‘এই অযোগ্য ব্যক্তিকে দিয়ে ব্যাংক চালানো যাবে না। আমরা চাই- ইসলামী ব্যাংক আগে যেভাবে চলেছে, সেইভাবে চলুক। তাদের দিয়ে ইসলামী ব্যাংক চালাতে হবে। সরকারের আজ্ঞাবহ কোনো অসৎ লোক দিয়ে না।
“কোনো অযোগ্য ব্যক্তিকে আমরা ইসলামী ব্যাংকে দেখতে চাই না। যোগ্য ব্যক্তিকে ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে।”

দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়িক হিসাব পরিচালনা করে আসা গ্রাহক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এস আলমের কোনো ম্যানেজার আমরা এই ব্যাংকে দেখতে চাই না। আমার টাকা আর কাউকে লুট করতে দিবো না। এস আলমের বিচার করতে হবে, ব্যাংক থেকে লুট হওয়া অর্থ ফেরত আনতে হবে।”
নতুন চেয়ারম্যানের ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা করার মতো ‘দক্ষতা ও শরীয়াহ জ্ঞান নেই’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “কোনো অযোগ্য ব্যক্তিকে আমরা ইসলামী ব্যাংকে দেখতে চাই না। যোগ্য ব্যক্তিকে ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে।”

ঈদের ছুটির আগে শেষ কর্মদিবসে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার আগে সেদিন চেয়ারম্যান জোবায়দুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খান পদত্যাগ করেন।
খুরশীদ আলম ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিন বছর মেয়াদে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হয়েছিলেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর খুরশীদ আলমসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন চার কর্মকর্তা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা ইসলামী ব্যাংকে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের নানা ঘটনা ঘটে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ে সরকার গঠন করা বিএনপির সময়ে সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে বেছে নেওয়া হয়।
বিক্ষোভে আসা আবুল হাশেম বলেন, “কোনো বিতর্কিত ও এস আলমের ম্যানেজারকে এখানে আসতে দেওয়া হবে না। যারা ব্যাংক চালাতে পারবে তারাই চালাবে। আর কোনো লুটপাট করতে দেব না।”
ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, “সেখানে আজ একইসময়ে দুটি গ্রুপের কর্মসূচি ছিল। একটি ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত গ্রুপ। আরেকটি গ্রাহকদের গ্রুপ, যারা ঠিকমতো টাকাপয়সা তুলতে পারে না এমন। চাকরিচ্যুত গ্রুপটা তাদের কর্মসূচির বিষয়ে অনুমতি চেয়ে পুলিশের কাছে আবেদন করেছিল।”
এ পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য, মতিঝিলের ব্যাংকপাড়ায় একই সময়ে দুটি গ্রুপের কর্মসূচির কথা জানতে পেরে পুলিশ চাকরিচ্যুত গ্রুপটিকে কর্মসূচির ‘অনুমতি দেয়নি’। আর গ্রাহকদের গ্রুপটি পুলিশকে ‘অবগতই করেননি’।

উপকমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, “সকালে দুটি গ্রুপই ওই এলাকায় সমবেত হতে থাকে। ঈদের দীর্ঘ ছুটির পর আজ অফিস খুলেছে, ওই এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। কিন্তু তাদের জন্য শুধুমাত্র ইসলামী ব্যাংকে নয়, আশেপাশের অন্যান্য ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে ব্যাঘাত ঘটছিল। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে পারছিল না।
“সকাল বেলা ওই এলাকাটা বিজি থাকে, কিন্তু তারা রাস্তা বন্ধ করে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছিল। এ অবস্থায় পুলিশ তাদেরকে বুঝিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশ বলেছে, তাদের কোনো দাবি-দাওয়া থাকলে যেন তাদের প্রতিনিধিসহ কর্তৃপক্ষের কাছে যায়, কিন্তু তারা যেন সরে যায়।”
তিনি বলেন, কিন্তু আন্দোলনকারীরা পুলিশের কথা ‘না মেনে’ তাদের কর্মসূচি চালিয়ে যেতে চাইলে প্রথমে পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি হয়।
“একপর্যায়ে আইনানুগভাবে জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়। এ সময় তাদের ইটপাটকেলের আঘাতে পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন।”
বর্তমানে পরিস্থিতি ‘পুলিশের নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে বলে জানান তিনি।
সেখান থেকে কাউকে আটক করা হয়েছে কি না তা স্পষ্ট করতে পারেননি পুলিশ কর্মকর্তা নাসিরুদ্দিন।

‘পর্ষদ সভা ভার্চুয়ালি’
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা ভার্চুয়ালি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বেলা আড়াইটায় অনলাইনে যুক্ত হয়ে পর্ষদ সদস্যরা অংশ নেবেন বলে জানিয়েছেন কোম্পানি সচিব হাবিবুর রহমান। সেখানে নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলম সভাপতিত্ব করবেন।
সচেতন গ্রাহক ফোরামের আন্দোলনের মুখে গত ২৪ মে ব্যাংকটির পূর্ব নির্ধারিত পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ হওয়ার পর পর্ষদ সভার নতুন দিন ঠিক করা হয়। ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারে সভাটি হওয়ার কথা থাকলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা অনলাইনে অনুষ্ঠিত হবে।
আরও পড়ুন