ডলার সঙ্কট: ৬ ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানকে অপসারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠি

এর মধ্যে পাঁচটি দেশি এবং একটি বহুজাতিক ব্যাংক।

শেখ আবু তালেব, নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 8 August 2022, 02:33 PM
Updated : 8 August 2022, 02:33 PM

প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ডলার সংরক্ষণ করে দর বৃদ্ধির ‘প্রমাণ পাওয়ায়’ ছয় ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানকে অপসারণের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম সোমবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, “ট্রেজারি অপারেশনে অতিরিক্ত মুনাফা করায় পাঁচটি দেশি এবং একটি বিদেশি ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।"

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরেকজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, ডলার সংরক্ষণ করে দর বৃদ্ধির ‘প্রমাণ পাওয়ায়’ এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ওই ছয় ব্যাংককে ইতোমধ্যে চিঠি পাঠিয়ে তাদের ট্রেজারি প্রধানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

ব্যাংকগুলোর বিদেশি মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস হচ্ছে রপ্তানি আয়, রেমিটেন্স, বিদেশি মুদ্রায় আমানত সংগ্রহ এবং বিভিন্ন ধরনের বন্ডে বিনিয়োগ। আবার বিদেশি প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে কোনো কোনো ব্যাংকের।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, কোন ব্যাংক কী পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা সংরক্ষণ করতে পারবে, তার একটি সীমা (এনওপি-নেট ওপেন পজিশন) নির্ধারণ করে দেওয়া আছে।

আগে ব্যাংকের রেগুলেটরি ক্যাপিটালের ২০ শতাংশ পর্যন্ত বিদেশি মুদ্রা সংরক্ষণ করার সুযোগ ছিল। ডলার বাজারের অস্থিরতা কমাতে গত ১৫ জুলাই তা কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এই সীমার বেশি ডলার হাতে থাকলে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা অন্য কোনো ব্যাংকের কাছে বিক্রি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে ব্যাংকগুলোর।

রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধে বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতার মধ্যে গতবছরের শেষ দিক থেকে ডলারের দাম বাড়ছিল। এ বছরের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে খোলা বাজারে ডলারের বিনিময় হার প্রথমবারের মত ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক দফায় দফায় বাজারে ডলার ছাড়ার পাশাপাশি কিছু পদক্ষেপ নেওয়ায় সে সময় পরিস্থিতি কিছুটা সামলে উঠতে পারলেও জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে আবার এই আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিনিময় হার ১০০ টাকা ছাড়ায়। ২৮ জুলাই তা ১১১ টাকা ছাড়িয়ে যায়, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ।

ডলারের দরে এই সংকটের মধ্যে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানান, এর পেছনে 'কিছু কারসাজি' চিহ্নিত করেছে সরকার।

ওই সময়ই মানি এক্সচেঞ্জগুলোতে অভিযান ‍শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেউ যাতে দাম বাড়ানোর জন্য ডলার মজুদ না করে, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

২ অগাস্ট পর্যন্ত ৮০টি মানি চেঞ্জারে অভিযান চালিয়ে ৪২টিতে অনিয়ম পাওয়ায় কারণ দর্শানোর (শো কজ) নোটিস দেওয়া হয়। এছাড়া পাঁচটি মানি চেঞ্জারের লাইসেন্স স্থগিতের কথা জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

সোমবার খোলাবাজারে ডলারের বিনিময় হার উঠেছে ১১৪ টাকায়। আর আন্তঃব্যাংক লেনদেনে প্রতি ডলার ৯৫ টাকায় বিনিময় হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছে, ডলারের সরবরাহ সংকটে কিছু ব্যাংকও সীমার অতিরিক্ত মুদ্রা জমিয়ে রেখে অতিরিক্ত মুনাফা শুরু করে। সুযোগ থাকলেও তা বাজারে না ছেড়ে কৃত্রিমভাবে দর বাড়ানো হয়। আবার কয়েকটি ব্যাংক ডলার সংরক্ষণের তথ্যও গোপন করে।

বিষয়টি বুঝতে পেরে গত ১৯ মে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিদর্শন টিম পাঠায় বিভিন্ন ব্যাংকে। ওই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বিনিময় হার নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য চারটি টিম কাজ করছে।”

বৈদেশিক বাণিজ্য চালিয়ে যেতে তারল্য সহায়তা দিতে ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই ডলার কোন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে তাও দেখার কথা জানিয়ে সিরাজুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘‘বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে যেসব ব্যাংক ডলার নিচ্ছে, যে উদ্দেশ্যে নিয়েছে, তা সেভাবেই ব্যবহার করছে কি না, আমাদের টিম সেটা দেখবে।’’

কর্মকর্তারা বলছেন, ওই পরিদর্শনে কয়েকটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে ‘ডলারের দর বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখা ‘প্রমাণ পায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরে তাদের কারণ-দর্শাও নোটিস দেওয়া হয়। ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় এখন ছয় ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

ব্যাংকে অনিয়ম পেলে ‘সুশাসন’ নিশ্চিতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা দিয়েছিলেন নতুন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার।

গত ১২ জুলাই দায়িত্ব নেওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, “ব্যাংকের মালিক কে- তা দেখা হবে না। ব্যাংকগুলো নিয়ম মেনে ব্যবসা করবে। আমরা সেজন্য ব্যাংকারদের সহযোগিতা করব। কিন্তু অনিয়ম পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি দায়িত্ব নেওয়ার এক মাস পুরো হওয়ার আগেই ছয় ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হল। ব্যাংকাররা বলছেন, এমন পদক্ষেপ নেওয়ার দৃষ্টান্ত নিকট অতীতে নেই।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক