Published : 16 Mar 2026, 09:34 PM
বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগের মধ্যে এয়ারবাস বিক্রির আশা ছেড়ে না দেওয়ার কথাই বলছেন ঢাকায় ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে।
তিনি বলেছেন, এয়ারবাস কেনার বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স যে এক সময় যে ‘ভালো মনোভাব’ দেখিয়েছিল, নতুন সরকার সেখান থেকে আলোচনা এগিয়ে নেবে বলেই তারা আশা করছেন।
সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন রাষ্ট্রদূত।
এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ না কিনলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাব পড়বে কি-না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমি বলতে পারি, এয়ারবাস নিয়ে আমরা সরকারের সঙ্গে এখনও আলোচনা করছি। এয়ারবাস সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছে। শেষে কী ঘটে আমরা তা দেখব, আমি এখন জানি না।
“আলোচনায় কী আসবে, তার উপর এটা নির্ভর করছে। আমরা এখন আলোচনা করছি এবং আমরা আশা করি, এয়ারবাসকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া হবে। আমরা ইতোমধ্যে অনেক আলোচনা করেছি, কারিগরি আলোচনা এবং এয়ারবাসের প্রস্তাব বিমান (বাংলাদেশ) খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেছিল। সুতরাং এখনও আলোচনা চলছে এবং আমরা বিমানের উপর নির্ভর করছি।”
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্সের কাছে উড়োজাহাজ বিক্রির চেষ্টা চালিয়ে আসছে ফ্রান্সভিত্তিক ইউরোপিয়ান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস।
এর মধ্যে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা সফরে এসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ বলেন, বাংলাদেশ ফ্রান্সের কোম্পানি এয়ারবাস থেকে ১০টি বড় উড়োজাহাজ ‘কেনার প্রতিশ্রুতি’ দিয়েছে।
এয়ারবাস থেকে আটটি যাত্রীবাহী ও দুটি পণ্যবাহী উড়োজাহাজ কেনার বিষয় ‘পর্যালোচনার’ মধ্যে আমেরিকান কোম্পানি বোয়িংও তৎপর হয়ে ওঠে। তৎকালীন সরকারের সঙ্গে দুপক্ষের দেনদরবারের মধ্যে ২০২৪ সালের অগাস্টে গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প চলতি বছর চেয়ারে বসেই যে বাণিজ্য যুদ্ধের সূচনা করেন, তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ে। ডনাল্ড ট্রাম্পের ৩৫ শতাংশ শুল্কের খড়গ থেকে বাঁচতে গত জুলাই মাসে অন্তর্বর্তী সরকার মার্কিন কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা দেয়।
তাতে ফ্রান্সের কোম্পানি এয়ারবাস থেকে বিমানের জন্য ১০টি বড় উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এরপর ইউরোপও নড়েচড়ে বসে। এয়ারবাস বিক্রির জন্য তারাও চাপ দিতে থাকে সরকারের ওপর।
গতবছর জুন মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাজ্য সফরে গেলে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এয়ারবাসের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ভাউটার ভ্যান ভার্স। এর পর থেকে কোম্পানির প্রতিনিধিরা সরকারের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে যোগাযোগ রেখে চলেছেন।
গত নভেম্বরের শুরুতে ফ্রান্স দূতাবাসে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা একযোগে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, উড়োজাহাজ কেনার আলোচনায় যেন এয়ারবাসকে ‘যৌক্তিকভাবে’ বিবেচনা করা হয়।
তারা ইউরোপে কয়েক বিলিয়ন ইউরোর বাংলাদেশি পণ্যের বাজার, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ, যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার এবং দীর্ঘ অংশীদারত্বের কথা মনে করিয়ে দেন বারবার।
এর মধ্যে ঢাকায় জার্মান রাষ্ট্রদূত র্যুডিগার লোটৎস এক অনুষ্ঠানে সরাসরিই বলেন, এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কেনার ‘প্রতিশ্রুতি’ থেকে বাংলাদেশ সরে এলে ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কে ‘প্রভাব পড়বে’।

তিনি বলেন, ইউরোপের বাজারে শুল্কছাড়ের আলোচনার আবহও এয়ারবাস নিয়ে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের কারণে বদলে যেতে পারে।
এয়ারবাস থেকে যাত্রী ও পণ্যবাহী উড়োজাহাজ কেনা থেকে সরে এলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের শেষ সময়ে ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা এগিয়ে নেয়।
ওই যুদ্ধবিমান কিনতে গত ৯ ডিসেম্বর ইতালীয় কোম্পানি লিওনার্দো এসপিএ ইতালির সঙ্গে আগ্রহপত্র সই করে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী।
লিওনার্দো এসপিএ ইতালি, বিএই সিস্টেমস এবং এয়ারবাস ডিফেন্স অ্যান্ড স্পেস কোম্পানির কনসোর্টিয়াম ইউরোফাইটার জিএমবিএইচের অধীনে তৈরি ও বাজারজাত হয় ইউরোফাইটার।
নতুন সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় এয়ারবাসের উড়োজাহাজ বিক্রির বিষয়টি ছিল কি-না, এমন প্রশ্নে ফরাসি রাষ্ট্রদূত সোমবার বলেন, “এয়ারবাস অবশ্যই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা এয়ারবাস খুব ভালো মানের উড়োজাহাজ বানাচ্ছে, বিশ্বের সবগুলো বড় বড় কোম্পানির বোয়িং এবং এয়ারবাস রয়েছে। আর উড়োজাহাজের সোর্সিংয়ের বহুমুখীকরণ গুরুত্বপূর্ণ।
“সুতরাং এয়ারবাস এমন কোম্পানি যেটাকে গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনার কাজ আমি এয়ারবাসের উপরই ছেড়ে দেব। প্রথম এই বৈঠকে আমি আরও দীর্ঘ মেয়াদি ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা করতে এসেছি।”
রাষ্ট্রদূত বলেন, “আমরা আশা করি, সরকার এবং বিমান এয়ারবাসকে বিবেচনায় নেবে। তবে অবশ্যই এটা আজকের আলোচনার প্রধান বিষয় নয়।”
নতুন সরকারের তরফে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের আশা ফ্রান্স দেখছে কি-না, এমন প্রশ্নে রাষ্ট্রদূত বলেন, আমরা সরকারের উপর ছেড়ে দিচ্ছি। এটা নতুন সরকার, তাদের গুরুত্ব দেওয়ার অনেক ইস্যু আছে।
“আমরা নিশ্চিত, সরকার বিচক্ষণ। আমরা মনে করি, এসব আলোচনা চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি আগ বাড়িয়ে কিছু বলব না।”
এয়ারবাস নিয়ে ফরাসি রাষ্ট্রদূতের এমন বক্তব্যের বিষয়ে এক প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, “আমাদের যারা দ্বিপক্ষীয় বন্ধুরা আছে, বহুপক্ষীয় বন্ধুরা আছে, তাদের সকলের সাথে আমাদের ট্রেড, ইনভেস্টমেন্ট, ফরেন পলিসি নিয়ে আলাপ হয়।
“এবং আপনাদেরকে বারবারই বলেছি আমি, আমি আবারও বলছি, সব দেশের সাথেই আমাদের সম্পর্ক থাকবে বাংলাদেশ ফার্স্ট পলিসির ভিত্তিতে।