Published : 15 Aug 2025, 01:14 AM
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের যুক্তরাজ্যে থাকা সম্পদ থেকে ব্যাংকের পাওনা ৩৫ কোটি ডলার ফেরত চেয়েছে ইউনাইটেড কর্মাশিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)।
যুক্তরাজ্যে জাবেদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিয়োগ করা প্রশাসক প্রতিষ্ঠান গ্র্যান্ট থর্নটনের কাছে এ অর্থ ফেরত চেয়ে সম্প্রতি চিঠি দিয়েছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকটি।
‘ফরেনসিক অডিটের অকাট্য প্রমাণের’ ভিত্তিতে এ দাবি করা হয়েছে বলে মঙ্গলবার ব্যাংকের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ দাবি করা হয়েছে।
ক্ষমতার পট পরিবর্তনের আগে ব্যাংকটির পর্ষদ জাবেদের পরিবারের সদস্যের নিয়ন্ত্রণে ছিল। নতুন পর্ষদ ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের বিভিন্ন অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার বিভিন্ন তথ্য দিয়েছে ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।
বিশেষত ‘যোগসাজশ ও প্রভাব’ খাটিয়ে ’ভুয়া ঋণ’ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করে ইউসিবি বলছে, বেনামি কাগুজে কোম্পানির মাধ্যমে ঋণ পাস করে সংশ্লিষ্ট পরিচালকরা তাদের ‘নিজস্ব মানুষের’ অ্যাকাউন্টে টাকা নিয়ে পরে তা তুলে নিয়েছেন।
জাবেদ ও তার স্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে পাওনা ব্যাংকের ৩৫ কোটি ডলার আদায়ে পদক্ষেপের বিষয়ে ইউসিবির ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গত ২৯ জুন গ্র্যান্ট থর্নটনের কাছে চিঠি পাঠিয়ে অর্থ ফেরত চেয়েছেন।
ইউসিবি কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার পাঠানো বিবৃতিতে দাবি করেছে, পূর্ববর্তী পরিচালনা পর্ষদের (২০১৮-২০২৪) সময়কালে অনুমোদিত এবং বিতরণ করা ঋণের ফরেনসিক অডিট করা হচ্ছে, যেখানে প্রায় ৩৫ কোটি ডলার সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তার স্ত্রী এবং সহযোগীরা আত্মসাৎ করেছেন বলে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এদিকে গ্র্যান্ট থর্নটনের কাছে পাঠানো চিঠিতে ইউসিবি বলেছে, সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্ত্রী রুকমিলা জামানের যেসব প্রতিষ্ঠানের প্রশাসক হিসেবে যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ নিয়োগ দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- জেবা প্রপার্টিজ লিমিটেড, জারিয়া প্রপার্টিজ লিমিটেড, সাদাকাত প্রপার্টিজ লিমিটেড এবং জেডটিজি প্রপার্টি ভেঞ্চার্স লিমিটেড। এছাড়া প্রশাসক নিয়োগের জন্য নিউ ভেঞ্চার্স (লন্ডন) লিমিটেড, জেডটিএস প্রপার্টিজ লিমিটেড, রুকমিলা প্রপার্টিজ লিমিটেড এবং আরামিট প্রপার্টিজ লিমিটেডের নামও রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ‘ইউকে প্রপার্টি কোম্পানিস’ নামে পরিচিত।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ইউকে প্রপার্টি কোম্পানিস এই প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। সম্প্রতি ইউসিবি জানতে পেরেছে, গ্র্যান্ট থর্নটনকে ইউকে প্রপার্টি কোম্পানিস-এর চারটির প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে।
”সাইফুজ্জামান চৌধুরী, রুকমিলা জামান ও ইউকে প্রপার্টি কোম্পানিসের (যেগুলো এখনও প্রশাসনে যায়নি সেগুলোসহ) ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিরুদ্ধে প্রায় ৩৫ কোটি ডলারের উল্লেখযোগ্য ঋণদাতার দাবি রয়েছে।”
চিঠিতে বলা হয়, ইউসিবির কাছে থাকা জাবেদ ও তার স্ত্রী এবং তাদের সহযোগীদের সম্পর্কিত সব প্রাসঙ্গিক তথ্য ও কাগজপত্র গ্র্যান্ট থর্নটনকে সময়মত প্রদান করা হবে।
"আমরা এই বিষয়ে আপনার চলমান প্রচেষ্টার জন্য কৃতজ্ঞ এবং আমাদের ব্যাংকের অপব্যবহৃত তহবিল পুনরুদ্ধারের জন্য সহযোগিতার জন্য আগ্রহী।"
এদিকে সোমবার ব্রিটিশ দৈনিক টেলিগ্রাফে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর মালিকানাধীন ১৭ কোটি পাউন্ডের তিন শতাধিক সম্পত্তি রয়েছে যেগুলো অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ দিয়ে কেনা হয়েছিল। বর্তমানে গ্র্যান্ট থর্নটনের প্রশাসকরা এসব সম্পদের একটি অংশ বিক্রি করে ঋণদাতাদের অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন।
ঋণদাতাদের মধ্যে রয়েছে সিঙ্গাপুরের ডিবিএস ব্যাংক, ব্রিটিশ আরব কমার্শিয়াল ব্যাংক এবং বাংলাদেশের ইউসিবি।
এ খবর সামনে আসার পর মঙ্গলবার বিবৃতিতে ইউসিবি বলেছে, গত কয়েক মাসে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে ইউসিবির সাবেক পরিচালনা পর্ষদের ব্যাপক দুর্নীতি, বড় অঙ্কের অর্থপাচার এবং অনৈতিক লেনদেনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পুরনো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন বোর্ড গঠন করলে এই প্রভাবশালী মহল বাদ পড়ে।
ইউসিবির ফরেনসিক অডিট, দুদক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে সাবেক পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব অর্থ বিদেশে পাচার করে লন্ডন-দুবাইয়ে বাড়ি কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইউসিবি সেই অর্থ ফেরত চেয়ে আবেদন করেছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ”বর্তমান ইউসিবি কর্তৃপক্ষ অতীতের সব অনিয়ম পেছনে ফেলে গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং ব্যাংকের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে।”
এর আগে গত জুলাইয়ে দুদকের দায়ের করা মামলায় আদালতের নির্দেশে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তার স্ত্রী রুকমিলা জামানসহ সাত সাবেক পরিচালকের ৫৭০ কোটি টাকার শেয়ার বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার করে সাবেক এই মন্ত্রী যুক্তরাজ্যে এই বিপুল সম্পদ গড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বাংলাদেশের অনুরোধে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) গত জুনে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বেশ কিছু সম্পদ জব্দ করার কথা জানায়।
তবে সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদ বরাবরই দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন। তার দাবি, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিদেশি তার সম্পত্তি কিনতে বৈধ অর্থই ব্যবহার করা হয়েছে।
গণ আন্দোলনে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগের সরকার পতনের আগ পর্যন্ত ইউসিবির পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ জাবেদের পরিবারের হাতেই ছিল। তার স্ত্রী রুকমিলা জামান ছিলেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান। ওই ব্যাংক থেকে ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে বাংলাদেশে মামলাও হয়েছে এই দম্পতির বিরুদ্ধে।
জাবেদ ও তার স্ত্রীর নামে যুক্তরাজ্যে ৩৪৩টি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২২৮টি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৯টি সম্পত্তিসহ অন্যান্য দেশে স্থাবর সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছে আদালত।
টেলিগ্রাফ লিখেছে, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠজনরা যেভাবে যুক্তরাজ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে কর্মকর্তাদের মধ্যে।
বাংলাদেশের সাবেক মন্ত্রী জাবেদ নিজেই একবার বলেছিলেন, শেখ হাসিনা তাকে ‘ছেলের মত’ স্নেহ করতেন।
আরও পড়ুন-
দায় শোধ করতে যুক্তরাজ্যে সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের সম্পদ বিক্রি হচ্ছে
ইউসিবির অর্থ আত্মসাৎ: সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের বিরুদ্ধে দুদকের আরেক মামলা
এবার যুক্তরাজ্যে সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের সম্পত্তি জব্দ
ইউসিবিতে বিকালে নতুন চেয়ারম্যান, রাতেই পর্ষদ বদলে দিল কেন্দ্রীয়