Published : 22 Mar 2026, 10:34 PM
ঢাকার লালবাগের বাসিন্দা জিয়াউল কবির মুরাদ বাইক নিয়ে বিভিন্ন এলাকার ১০টি পাম্প ঘুরে কোথাও তেল পাননি।
ঘুরতে ঘুরতে বিজয়সরণির ‘ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে’ তেল দেওয়া হচ্ছে দেখতে পেয়ে লাইনে দাঁড়ান তিনি।
রোববার সকাল সাড়ে ৯টায় লাইনে দাঁড়িয়ে বেলা দেড়টার দিকে এই বাইকার যখন পাম্পের কাছাকাছি আসেন, তখন পাম্প থেকে বাইকে তেল দেওয়া বন্ধ করে দেয়।
দীর্ঘক্ষণ লাইনে থেকেও তেল পাচ্ছিলেন না, স্বাভাবিকভাবেই তখন মুরাদের মতো অনেক বাইকার পাম্পের কর্মীদের কাছে কারণ জানতে চান। এ নিয়ে উভয়পক্ষের বাগ-বিতণ্ডার মধ্যে পাম্প থেকে খবর দিয়ে আনা হয় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের।
এরমধ্যে ‘অকটেন বিক্রি বন্ধ’ লেখা একাধিক নোটিস টানিয়ে দেওয়া হয় পাম্পের চারপাশে। সেখানকার এক কর্মী বারবার বাইকারদের বলছিলেন, তারা কিছুক্ষণ আগেই মাইকিং করেছেন।
তিনি বাইকারদের পাম্পের বাইরে যেতে বলছিলেন, এজন্য পুলিশ সদস্যদের সহায়তাও চাইছিলেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মী বলেন, “না থাকলে কই থেকে দিব? অল্প কিছু তেল আছে, সেটা শেষ হলে গাড়িতেও দেওয়া বন্ধ করে দিব। যতক্ষণ আছে আমরা দিচ্ছি।”
তাদের নোটিসেও লেখা রয়েছে, ‘অকটেন প্রাপ্তি সাপেক্ষে’ সোমবার থেকে আবার দেওয়া হবে, শুধু ডিজেল বিক্রি ‘অব্যাহত থাকবে’।
ওই কর্মী আরো বলেন, “ঈদের মধ্যে ডিপো বন্ধ, আজও বন্ধ থাকবে। আমরা কাল আনার চেষ্টা করব, যখন থেকে পাওয়া যাবে, তখন থেকে আমরা বিক্রি শুরু করব।”
পাম্প কর্তৃপক্ষ বাইকে অকটেন দেওয়া বন্ধ করলেও গাড়িতে দিচ্ছিল দাবি করে বাইকাররা ‘কম হলেও’ তেল দেওয়ার অনুরোধ করতে থাকেন।
এ অবস্থায় পাম্প কর্তৃপক্ষ ‘ঝামেলার আশঙ্কায়’ থানায় খবর দিলে সেখানে পুলিশের টিম যায় বলে জানান তেজগাঁও থানার ওসি ক্যশৈন্যু মারমা।
তিনি বলেন, “মোটরসাইকেল ওয়ালারা চিল্লাচিল্লি করে। সেজন্য তারা থানায় ফোন করেছিল। সেখানে পুলিশের একটি টিম গেছে, সেনাবাহিনীর সদস্যরাও আছে। এমনিতে তেমন কোনো সমস্যা নাই।”

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার পর দেশে জ্বালানি তেলের ঘাটতি নিয়ে আতঙ্ক দেখা দেয়। অনেক ক্রেতা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জ্বালানি কিনতে শুরু করলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গত ৬ মার্চ থেকে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল বিক্রিতে সীমা বেঁধে দেয় সরকার।
পরে রাইডশেয়ারিং চালকদের কথা বিবেচনায় মোটরসাইকেলের সীমা দুই লিটার থেকে বাড়িয়ে পাঁচ লিটার করা হয় এবং সামগ্রিক রেশনিং ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।
‘ঈদযাত্রা এবং কৃষি মৌসুমের কথা বিবেচনায়’ গেল ১৫ মার্চ থেকে জ্বালানি বিক্রিতে চালু থাকা রেশনিং ব্যবস্থা তুলে নেয় সরকার।
দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে ‘আগের মতো স্বাভাবিকভাবে’ জ্বালানি সরবরাহ ও বিক্রি চলবে জানানো হলে খোদ ঈদের ছুটিতেই ঢাকার বিভিন্ন পাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে।
বোববার ‘তেলের অভাবে’ বেশির ভাগ পাম্পই বন্ধ থাকার কথা জানালেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হকও।
তার ভাষ্য, যে দুয়েকটা পাম্পে তেল বিক্রি হচ্ছে. সেখানে দীর্ঘ সারি হয়ে যাচ্ছে।
তবে এই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠতে ব্যাংক খোলা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের কাছে পে ওর্ডার নাই, পে ওর্ডার ছাড়া ডিপো খুললেও তেল আনতে পারব না।”
ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষমান বাইকার জিয়াউল কবির মুরাদ বলেন, “আপনি দেখেন প্রাইভেটকারে তেল দিচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে তারা মাইকিং করেছে, দেড়টা পর্যন্ত দিতে থাকবে, এরমধ্যে শেষ হয়ে গেলে আর দিবে না। তারাতো বিজনেস করে, তাদের একটা আইডিয়া আছে কী পরিমাণ তেল আছে। তেল কম থাকলে কমায়ে কমায়ে সবাইকে দিত। সাড়ে ৯টা থেকে আমি লাইনে, এখন কাছে আসার পরে যদি বলে তেল নাই, এইটা কিছু হইলো?”
তিনি এই পাম্পে আসার আগে পরীবাগ, আসাদগেট, রায়েরবাজার, নীলক্ষেত এলাকার আরো ১০টি পাম্প ঘুরে এসেছেন। সেখানকার কয়েকটিতে ডিজেল দিলেও অকটেন-পেট্রোল কোথাও পাননি।
তিনি আরো বলেন, “আমাদের চলতে তো তেল লাগবে। কোথাও অকটেন-পেট্রোল নাই, দুঃখিত বলে সবাই নোটিস টানায়ে দিছে। না দিলে কী করব, জোর জবরদস্তির তো কিছু নাই।”

তেল দিতে বারবার অনুরোধ করা রাকিব নামে আরেক বাইকার বলেন, “১১টা থেকে লাইনে দাঁড়ানো, এখনো অনেক দূরেই আছি। লাইন চলছে না বলে সামনে এসে শুনি তেল দেওয়া বন্ধ। এতক্ষণ লাইনে দাঁড় করায়ে রেখে বলতেছে তেল নাই। প্রাইভেটকার একটার তেল দিয়া ১০টা বাইক বিদায় করা যায়। কম করে সবাইকে দিক, সবাই চলুক।”
এ নিয়ে বাইকারদের ‘অনুরোধ’ আর পাম্প কর্তৃপক্ষের ‘না’ সিদ্ধান্তের মধ্যে কথা কাটকাটি চলছিল পুলিশ ও সেনা সদস্যদের উপস্থিতিতেও। আধঘণ্টা পর বেলা ২ টার দিকে ঘোষণা এল, বাইকপ্রতি ২০০ টাকার করে তেল মিলবে।
গাড়ির জন্যও তেলের পরিমাণ নির্ধারিত করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে সেখানকার একজন বললেন, “গাড়িতে ১০ লিটার করে দিচ্ছি। যতক্ষণ আছে দিব, তারপর টোটাল বন্ধ করে দিব একেবারে।”
অল্প হলেও তেল দিতে রাজি হওয়ায় ‘আশ্বস্ত’ হন বাইকাররা, কারণ দীর্ঘ সময় লাইনে দাড়িয়ে একেবারে খালি ফিরতে হচ্ছে না তাদের।
এদিকে পাম্প কর্তৃপক্ষ যখন ‘যেকোনো সময়’ তেল শেষ হওয়ার কথা শোনালেন, অন্যদিকে সেখানে তেলের জন্য অপেক্ষমান লাইন প্রায় জাহাঙ্গীর গেট এলাকায় ঠেকেছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে অপেক্ষমান সোহেল নামে আরেক বাইকার বললেন, তিনি উত্তরা থেকে এ পর্যন্ত আসতে আসতে সবগুলো পাম্পেই খোঁজ নিয়েছেন। কোথাও তেল দেওয়া হচ্ছে না। পরে খবর পেয়ে এখানে লাইনে দাঁড়িয়েছেন।
বেসরকারি এই চাকরিজীবীর ঈদের ছুটিতেও অফিসের কাজে বিভিন্ন এলাকায় যেতে হয়। সেজন্য ঈদের আগে তেল নিলেও ‘প্রায় শেষ’ হওয়ায় আজ আবার লাইনে দাঁড়িয়েছেন।
এ অবস্থায় অনেকটা আক্ষেপের সুরেই তিনি বলেন, “লাইনে আছি, কপালে থাকলে পাব, না থাকলে কী করা যাবে?”

এদিন দুপুরে মহাখালীর রাওয়া ক্লাব সংলগ্ন ‘ইউরেকা এন্টারপ্রাইজ’, আমতলী সংলগ্ন ‘গুলশান সার্ভিস স্টেশন’, ‘ক্রিসেন্ট অটোমোবাইলস’ পাম্পগুলো একেবারেই বন্ধ দেখা গেছে।
সাতরাস্তার ‘সিটি’ ও তেজগাঁওয়ের ‘সাউদার্ন’ পাম্পও বন্ধ পাওয়া গেছে। আশপাশের এলাকার মধ্যে শুধু মহাখালী বাস টার্মিনাল সংলগ্ন ‘ক্লিন ফুয়েল’ পাম্পে তেল বিক্রি হতে দেখা গেছে। সেখানেও ছিল যানবাহনের লাইন।
কল্যাণপুর এলাকার ‘খালেক সার্ভিস সেন্টারের’ আংশিক দড়ি দিয়ে ঘিরে রাখতে দেখা গেছে এদিন। মাঝেমধ্যে কিছু বাইকার বা কার সেখানে তেল নিতে গেলেও আশপাশে কাউকে না দেখে চলে যাচ্ছিল।
তাদের কাউন্টারে খোঁজ নিয়েও কাউকে পাওয়া গেল না। কিছুক্ষণ পর মোস্তফা নামে এক কর্মী ভেতর থেকে বের হয়ে আসেন।
তিনি বলেন, “কালকে অল্প ডিজেল ছিল, আজকে কিছুই নাই। ডিপো বন্ধ এখন, আবার তেল এলে বেঁচা শুরু হবে।”
ওই এলাকার ‘সেহরাব সার্ভিস স্টেশনের’ ভেতরে বেঞ্চ পেতে দুজন কর্মীকে বসে থাকতে দেখা গেছে। পাম্পটিতে কোনো বাইকার বা গাড়ি তেল নিতে গেলে তারা দূর থেকেই হাতের ইশারায় ‘তেল নাই’ জানিয়ে দিচ্ছিলেন।
মাহফুজুর রহমান রাব্বী নামে একজন বলেন, “তেল শেষ হইলে আমরা কী করব। যতক্ষণ ছিল ততক্ষণ বেঁচছি। কাল একটা গাড়িতে তেল দেওয়ার মধ্যেই শেষ হইয়া গেছে। আবার তেলের গাড়ি এলে দেওয়া শুরু হবে।”
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস্ অ্যান্ড পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক পে- অর্ডার না থাকার বিষয়ে বলেন, “আজ কতদিন ধরে ব্যাংক বন্ধ। ব্যাংক না খুললে আমরা পে-অর্ডার করাতে পারছি না। ডিপো তো ঈদের আগের দিনও খোলা ছিল। ঈদের দিন আর আজকে ডিপো বন্ধ, কালকে আবার খুলবে।
ব্যাংক খোলা থাকার সময়ে অনেক পাম্প মালিক ‘নিজের পুঁজি’ দিয়ে অতিরিক্ত পে-অর্ডার করে রাখতে পেরেছিল। সেগুলো দিয়ে পাম্প মালিকরা তেল এনে চলেছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন, “কাল ডিপো খুললেও পে-অর্ডারের অভাবে তেল আনতে পারবে না। ডিপো খুললেও আমাদেরকে তেলের জন্য পে-অর্ডারের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।”
আগে সরকারি ছুটির সময়ে এমন সংকট হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে এই নেতা বলেন, “টানা এতদিন ব্যাংক বন্ধ সাধারণত ছিল না আগে।”
তবে এই সংগঠনের আরেক নেতা বললেন, একসময় দীর্ঘ সরকারি বন্ধের সময় চেকের বিনিময়েও তেল নিতে পারত পাম্প কর্তৃপক্ষ। এরপর বেশ কয়েকবার চেক ক্যাশ করতে পারছিল না ডিপো কর্তৃপক্ষ।
এ নিয়ে বেশ কয়েকবার অভিযোগের মধ্যে পাম্প মালিকদের সংগঠনের সঙ্গে আলাপ করে বিগত সরকারের সময় চেক দিয়ে তেল নেওয়ার সুবিধা তুলে নেয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।