Published : 23 May 2026, 12:54 AM
কোরবানির ঈদের আগে আগে মাংস রান্নার দরকারি মসলার দাম বেড়ে যাওয়ার যে চিত্র অন্যান্য বছর দেখা যেত, এবার সেরকম না হলেও খুচরা বাজারে দাম একটু বেশি। পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন, এক দেড় মাস আগেই দাম বেড়েছে।
সে কারণে আগামী ২৮ মে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে কম দামে মসলা কিনতে অনেকেই বেছে নিয়েছেন বড় বাজার।

রাজধানীর মসলা বিক্রির বড় পাইকারি বাজার পুরান ঢাকার মৌলভীবাজার। টাকা সাশ্রয়ে নাজিম উদ্দিন রোড থেকে ঈদের মসলা বাজার করতে এসেছেন সুলতান মঈন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পাইকারি বাজারে কম দামে মসলা পাওয়া যায়। বড় উৎসবগুলোতে মসলা বেশি লাগে।”
মৌলভীবাজারসহ রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, খুচরা দোকানের তুলনায় বড় বাজারের দোকান থেকে কেজিতে ন্যূনতম ১০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দামের পার্থক্য হয়। যে মসলার দাম যত বেশি, সে মসলা কিনলে তত বেশি অর্থ সাশ্রয় হয়।
মৌলভীবাজার থেকেই এলাচ, শুকনা মরিচ, লবঙ্গ, জিরা, জাইফলসহ একাধিক মসলা কিনেন সুলতান। প্রতিটি মসলা ২৫০ থেকে ৫০০ গ্রাম করে কিনেছেন তিনি। মৌলভীবাজার থেকে কিনতে তার খরচ হয়েছে ১২৫০ টাকা।
সুলতান বলেন, “খুচরা দোকান থেকে এই পরিমাণ মসলা সদাইতে ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা খচর হবে। বছরে দুইবার মসলা সদাই করি। দুইবারই এখান থেকে। এখানে আসার আগে খুচরা দোকানে দেখে আসি।”
দামের বিষয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “ঈদের আগে যেভাবে বাড়ে সেরকম বাড়েনি, সহনীয় আছে। তবে খুচরা বাজারে দাম একটু বেশি।”
বাগদাদ ট্রেডার্স নামের এই দোকানের একজন কর্মী বলেন, এভাবে প্রতিটি মসলাজাতীয় পণ্যই তুলনামূলক কম দামে কেনা যায় মৌলভীবাজার থেকে। সেখানকার ছোট দোকানগুলোতে খুচরা বা অল্প পরিমাণেও পণ্য বিক্রি হয়, যা পাইকারি দামের অনেকটা কাছাকাছি।

পাইকারি ও খুচরা বাজারে দামের পার্থক্য
বুধবার মোহাম্মদপুরের চল্লিশ ফিট এলাকার খুচরা বাজারে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হয়েছে ৫ হাজার থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকায়। পাড়া–মহল্লার দোকানে এলাচের দাম আরো ৫০০ টাকা বেশি নিচ্ছে।
কিন্তু শুক্রবার মৌলভীবাজারে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হয়েছে মানভেদে ৪ হাজার ৮০০ থেকে ৫ হাজার টাকায়। অর্থাৎ মৌলভীবাজারের সঙ্গে খুচরা ও পাড়া–মহল্লার দোকানে এলাচের দামের পার্থক্য কেজিতে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা।
কোরবানির সময় দারুচিনি, জিরা, লবঙ্গ প্রভৃতি মসলার চাহিদা বেশি থাকে। গলি ও মহল্লার দোকানে প্রতি কেজি জিরা ৭৫০ থেকে ৮০০, দারুচিনি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা ও লবঙ্গ ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সেখানে মৌলভীবাজার ও কারওয়ান বাজারের দোকানে প্রতি কেজি জিরা ৫৮০ থেকে ৬৫০, দারুচিনি ৫৫০ থেকে ৬৫০ ও লবঙ্গ ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তবে খুচরা বাজারে প্রতিকেজি জিরা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, লবঙ্গ ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
শুক্রবার বাজারে গোলমরিচ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকা, তেজপাতা ১৮০ থেকে ২২০ টাকা, হলুদ ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা এবং শুকনা মরিচ ৩২০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হয়।
এ ছাড়া পেঁয়াজ ৪৫ থেকে ৫০, আদা ১৮০ থেকে ২০০ ও রসুন ১০০ থেকে ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
অন্যান্য মসলার দাম ‘মোটামুটি’ সহনীয় হলেও এলাচের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এক থেকে দেড় মাসে কেজিতে প্রায় ৩০০ টাকা বেড়ে এখন মানভেদে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মৌলভীবাজারের পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা মোহন মোল্লা বলেন, “অনেকটা কম দামে বা পাইকারি দামে এখান থেকে মসলা কেনা যায়।”
দাম জানতে চাইলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “এলাচের দাম একটু বাড়তি। সেটাও কয়েকমাস আগে বেডেছে। কোরবানীর ঈদ ঘিরে মসলার দাম বাড়েনি। সব মসলার দাম আগের মতোই আছে।”
তবে এই বছর মসলা বিক্রি কম বলে হতাশা প্রকাশ করেন মোহন। তিনি বলেন, “দাম মোটামুটি কম। তবু কাস্টমার কম। গত ১৫ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কম বিক্রি।”
একই কথা বলেছেন ওই বাজারের কাওসার স্টোরের এর মালিক কাওসার।
তবে খুচরা বাজার ঘুরে ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছরের তুলনায় এই বছর দাম বেশি।

এদিকে খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম বৃদ্ধির পেছনে পাইকারি বাজারের মূল্যই কারণ। তবে পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, দামে কোনো সংকট নেই। বরং ক্রেতা কম। বিক্রি কমেছে।
মুহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী শাহজাহান মোল্লা বলেন, ঈদের সময় সবসময়ই চাহিদা বেড়ে যায়। মানুষ একসঙ্গে কিনে রাখে। আমরা বেশি দামে কিনি, তাই কম দামে বিক্রি করা সম্ভব না।”
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এর তালিকায় মসলার তালিকায় আছে ১১ পণ্য। বৃহস্পতিবার টিসিবির বাজার দরে অনুয়ায়ী, এক বছরের ব্যবধানে শুকনা মরিচ ৪০ শতাংশ, আদা ১৯ শতাংশ, দারুচিনি ৫ শতাংশ, লবঙ্গ ৩ শতাংশ, এলাচ ৫.২১ শতাংশ ও তেজপাতা ১১ শতাংশ বেড়েছে।
তবে জিরা ৫ শতাংশ, পেঁয়াজ ১৮ শতাংশ, রসুন ২৭ শতাংশ, ধনিয়া ৪ শতাংশ কমেছে। হলুদ ও তেজপাতার দাম অপরিবর্তিত আছে।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের মসলা ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, “নানা কারণে বাজারে কিছু কিছু মসলার দাম বাড়ে। এটা তো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নয়; বিলাসবহুল পণ্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তাই এ পণ্য আমদানিতে প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি শুল্ক দিতে হয়।
“তবুও দাম স্থিতিশীল আছে। কোরবানের আগে যে হারে বাড়ে ওই পরিমাণ বাড়েনি। এলাচের দাম একটু বেশি। তাও সেটা দুই মাস আগেই বেড়েছে।”
কারওয়ানবাজারে খুচরা ও পাইকারি-দুইভাবে মসলা কেনা যায়। এই বাজারে মসলা কিনতে আসা রাসেল আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রতি বছর ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার মসলা কিনতে হয়। তাই পাইকারি বাজারে চলে আসি। সাধারণত মৌচাক থেকে নিই।
“গত বছরের চেয়ে অনেক মসলার দাম বেড়েছে। কিছু কিছুর দাম কম। মোটামুটি একটা ‘ব্যালেন্স’ আছে। তবুও তো চাপ আছে। সবকিছুর দাম তো আগে থেকেই বেশি। ”
তবে তার পাশে দাঁড়ানো আরেক ক্রেতা মহসিন হক বলেন, “মসলার দাম অনেক বেড়েছে। ঈদ এলে এক দফা বাড়েই। এটা নিয়ম হয়ে গেছে।”

চাহিদা ও আমদানি কত?
মসলা গবেষণাকেন্দ্রের তথ্যানুসারে, দেশে বছরে মসলার চাহিদা ৩৩ লাখ টন। এর মধ্যে দেশে উৎপাদন হয় ২৭ লাখ টনের বেশি। বাকি মসলা বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় ১০ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে দেশে পেঁয়াজ ও রসুন ছাড়া অন্য মসলা আমদানি হয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৭৪ হাজার টন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত আরও প্রায় ২ লাখ টন মসলা আমদানি হয়েছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নিত্যপ্রয়োজনীয় বা অত্যাবশ্যকীয় পণ্য না হওয়ায় মসলার দাম সরকার নির্ধারণ করে না। চাহিদা ও যোগানের ভিত্তিতে সংক্রিয়ভাবে দাম নির্ধারণ হয়।”
“তবে মসলা ব্যবসায়ীদের সভা করে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত দাম যেন না নেয়া হয়। আমরাও অভিযান করার সময় আমদানি দামের সঙ্গে খুচরা দাম অনেক বেশি পার্থক্য কিনা, অতিরিক্ত মুনাফা করছে কিনা এসব বিষয় দেখি।”