Published : 18 Jun 2026, 04:25 PM
নতুন অর্থবছরের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বাজেট বাড়লেও তা সুফল আনবে কি না তা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে বলে মন্তব্য করেছেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ।
বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের (আইবিএফবি) এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। ব্যবসায়ীদের সংগঠনটি বাজেট প্রতিক্রিয়া তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে।
এক সাংবাদিক জানতে চান, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের উপর এই বাজেট বেশি চাপ ফেলবে কি না?
জবাবে আবদুল মজিদ বলেন, “বাজেট যেসব সুযোগ সুবিধার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো আদৌ অ্যাভেলঅ্যাবল করা যাবে কি না অর্থ্যাৎ কার্যকর বাস্তবায়ন করা যাবে কি না, তার উপর নির্ভর করবে।
“যেমন আমি শিক্ষায় বাজেট বাড়িয়ে দিলাম, কিন্তু স্কিল ম্যানপাওয়ার আসার কথা, জ্ঞান সম্পন্ন মানুষ আসার কথা…কিন্তু যদি দেখা যায়—এই (বাজেট) টাকা দিয়ে সুন্দর সুন্দর বিল্ডিং বানানো হয়েছে, আগেও এটা করা হয়েছে। কিন্তু ওই বিল্ডিংগুলোর ভেতরে প্রাণ নেই।”
আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকার প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী, যা মোট বাজেটের ১৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং জিডিপির ২ শতাংশ।
আর স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, যা বিদায়ী বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। প্রস্তাবিত বরাদ্দের পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১.০২ শতাংশ, যা বিদায়ী অর্থবছরে ছিল জিডিপির ০.৫৮ শতাংশ।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মজিদ বলেন, “আগে কুড়েঘরের শিক্ষক যা পড়াতেন, আর সুন্দর বিল্ডিংয়ের ভেতরে শিক্ষক যা পড়াচ্ছেন—তার মধ্যে যদি পার্থক্য করা না যায়, অর্থাৎ রেজাল্ট ওরিয়েন্টেড করা না যায়, তাহলে বাজেট বাড়িয়ে লাভ হবে না।
“স্বাস্থ্যখাতেও একই কথা। সেবা না বাড়িয়ে দালান বাড়ালে সাধারণ মানুষের জীবনে এই বাজেটের কোনো প্রভাব পড়বে না।”
বাজেটে নির্ধারিত রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, “অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে বোঝা যাচ্ছে এইটা অর্জিত হবে না।
“গত ১৫ বছর একটা ছন্নছাড়া অর্থনীতি ছিল। পুঁজিবাজার, ব্যাংক খাত শেষ হয়ে গেছে। যেসব জায়গা থেকে রেভিনিউ আসে, সেইগুলোই শেষ হয়ে আছে।”
নতুন অর্থবছরের জন্য তিনি ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছেন, যাতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা।

‘বাস্তবায়ন কঠিন’
নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন ফুটে উঠেছে বলে মনে করছে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশ (আইবিএফবি)।
তবে এই বাজেট বাস্তবায়ন করা ‘কঠিন’ বলেও মত দিয়েছে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি নিয়ে কাজ করা ব্যবসায়ীদের সংগঠনটি।
সংবাদ সম্মেলনে নতুন বাজেট নিয়ে নিজেদের এ প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন আইবিএফবি প্রেসিডেন্ট লুৎফুন্নিসা সৌদিয়া খান।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বাজেটেই একটি দল তার অগ্রাধিকারের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন তুলে ধরে। সেই বিবেচনায় বাজেটে বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও জনকল্যাণের প্রতিশ্রুতি উঠে এসেছে।
“কিন্তু বাজেট কেবল প্রতিশ্রুতির দলিল হলেই চলে না, বাস্তবায়নের ওপর সাফল্য-ব্যর্থতা নির্ভর করে।”
তবে বাজেট বাস্তবায়নে বাধা রয়েছে বলে মনে করেন সৌদিয়া খান।
তিনি বলেন, “প্লানিং অনেক বড় বড় করা যায়, স্বপ্নও অনেক বড় বড় দেখা যায়। বাস্তবায়ন করতে গেলে অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়।
“বাধাগুলো যদি দূর করা যায়, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে যেকোনো সফল বাস্তবায়ন করা সম্ভব।”
প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘ব্যবসায়ীবান্ধব’ বর্ণনা করে আইবিএফবি প্রেসিডেন্ট বলেন, “আর শিক্ষার উপর ফোকাস হওয়াতে আমি সবচেয়ে বেশি হ্যাপি।”
সংবাদ সম্মেলন লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন লুৎফুন্নিসা। তাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান অগ্রাধিকার, স্টার্টআপ ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা, এসএমই খাতে সহায়তা, ব্যবসা সহজীকরণ, করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি ও সারা বছর আয়কর প্রদান, ডিজিটাল অর্থনীতি ও ফ্রিল্যান্সিংকে উৎসাহিত করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর ছাড়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখার কথা বলা হয়।
তবে বাজেট বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, “ব্যাংক ঝণের উপর নির্ভরশীলতা, উচ্চবিলাসী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, সুদ পরিশোধ ক্রমবর্ধমান চাপ, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, প্রশাসনিক সক্ষমতার ঘাটতির কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন সম্ভব হবে না।”
আইবিএফবির সাবেক প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন রশীদ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (ফিন্যান্স) উৎপল কুমার দাশ অন্যদের মধ্যে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।