আমাদের ‘আদিবাসী’ কথা

নেংমিঞ্জা বাপন
Published : 10 August 2021, 06:10 PM
Updated : 10 August 2021, 06:10 PM

একজন আদিবাসী মা ও সন্তান। ছবি – নেংমিঞ্জা বাপন

খুব সকালে ঘুম ভাঙেনা প্রতিদিন। কাজ নেই। মহামারীতে শহর ছেড়েছি। পাশের পাহাড়টা আকাশমণি গাছে জবুথবু হয়ে বসে থাকে। আমার এই গ্রামে আকাশমণি গাছ কবে এসেছে আমি জানি না। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি ফরেস্ট ডিপার্ট্মেন্টের অধীনে যত টিলা পাহাড় আছে সব আকাশমণি গাছে গিজ গিজ করছে। আমি প্রায়ই আমার প্রায় শত বছর ছুঁই ছুঁই নানিকে জিজ্ঞেস করি, "আচ্ছা, তোমরাও কি জন্ম থেকে এই আকাশমণি গাছ দেখেছ?"

নানি কিছুক্ষন বোবার মত আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, "আমিও মনে করতে পারছি না। তবে ঐ যে পাহাড়টা এই পাহাড়ে আমাদের জুম চাষ হতো।"

আমি পাহাড়ের দিকে তাকাই; আর জুম শস্যে ভরা পাহাড় কল্পনা করি। কল্পনা করি, ঘর্মাক্ত নানুর শরীর। তার শক্ত দুটি হাত। হাতে কোদাল। আর সেই পাহাড়ের গায়ে কোদাল দিয়ে মাটি খোঁড়ার শব্দ। শব্দ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এক সময় কান ফেটে যাবার উপক্রম হয়। শব্দ আবারও বাড়ে কিছুক্ষণ পর দূর থেকে দূরে মিলিয়ে যায়। কিন্তু কোথায় মিলিয়ে যায় জানি না। এত বড় রাষ্ট্রে এই শব্দ, এই কান্না, এই আওয়াজ, ভোঁ ভোঁ করে উড়ে গিয়েও কারো কানে বোধহয় পৌঁছে না।

শুধু নানু, নানি আর মৃত জুম পাহাড়ের কথা বলেছি। মধুপুরের মাংরুদাম (গারোদের পুরনো শ্মশান ), পান পুঞ্জির হাজার হাজার কেটে ফেলা পান গাছ, ভুমি খেকো পর্যটন, এইসব অনেক কিছুর কথা এখনও বলিনি। বলার ইচ্ছে নেই। এত কথা, দুঃস্বপ্ন, নির্যাতন সব একসাথে এখন কানে ভোঁ ভোঁ আওয়াজ তোলে কিন্তু কোনটাই পরিষ্কার করে বোঝা যায় না।

৯ অগাস্ট ছিল বিশ্ব আদিবাসী দিবস। এবারের আদিবাসী দিবসের মূল সুর  হচ্ছে-   'কাউকে পেছনে ফেলে নয়; আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠায় নতুন সামাজিক অঙ্গীকারের আহ্বান' । এই রকম বহু মূল সুর এসেছে; চলে গেছে। কিন্তু মূলমন্ত্র কাজ করেনি।

এখানে আদিবাসীরা হয়ে রয়েছে ক্ষুদ্র-নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠী। সোশ্যাল মিডিয়াতে একজন ভিনদেশি মানুষ একবার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা এই সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য এত উঠে পরে লেগেছি কেন?

উনি বলতে চাচ্ছিলেন যে সাংবিধানিক স্বীকৃতি ছাড়া কি অধিকার আদায় সম্ভব নয়? তখন আমি তাকে অতটা ঠিকমত বোঝাতে পারিনি। আমি শুধু বলেছিলাম, সব অধিকার অনুকুলে থাকলে স্বীকৃতি নিয়ে কথা বলার প্রশ্নই ছিল না। আসলে আমি বলতে চেয়েছিলাম, মা যদি সন্তানকে সন্তান বলে চিনতে পারে তবে সন্তানের সব অধিকার পাওয়াটা সহজ হয়ে ওঠে।

এই বাংলায়, এই যুগে, এই সময়ে আমরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। আগামী সময়ে আমরা হয়ত আরও পিছিয়ে যাবো। কারণ আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি চাওয়া সব জনগোষ্ঠীই একটি কঠিন রাজনীতির শিকার।

আদিবাসী দিবসে একজন আদিবাসী তরুণী। ছবি – নেংমিঞ্জা বাপন

এই বছর মে মাসের শেষের দিকে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নে অবস্থিত আগারপুঞ্জিতে খাসিয়া সম্প্রদায়ের এক হাজার পান গাছ কেটে ফেলা হল। টাঙ্গাইলে কোচ নারীর ওপর ভয়ঙ্কর বর্বরতা দেখলাম জুন মাসে। দল বেঁধে ধর্ষণ করা হল; যৌনাঙ্গ-পায়ুপথ ছিঁড়ে ফেলা হল। নওগাঁর নিয়ামতপুরে এক আদিবাসী কিশোরীকে দল বেঁধে করা হল ধর্ষণ ।  জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে এক আদিবাসী ওরাঁও নারীকে পিটিয়ে হত্যা করল অ-আদিবাসীরা। এরকম ঘটনা দুই এক মাসের ব্যাবধানেই ঘটে চলেছে।

বিশ্ব আদিবাসী দিবসে অনেকেই আদিবাসীদের প্রতি সহানুভূতি নিয়ে কথা বলেন। দু-একটা নাচ-গান দেখেন। নিজের স্মার্ট ফোন দিয়ে ছবি তোলেন।  কেউ গণমাধ্যম কর্মী হয়ে সংবাদ সংগ্রহ করেন। আমাদের নিয়ে কথা হয়, লেখা হয় অনেক। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের আর আদিবাসী হয়ে ওঠা হয় না।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক