গঞ্জের রেল স্টেশন
ছোটবেলায় দেখতাম উনিয়া দিয়ে মাছ ধরতো। উনিয়া মানে হলো বাঁশ দিয়ে তৈরী একপ্রকার মাছ ধরার ফাঁদ। স্রোতের বিপরীতে মাটিতে রাখা হতো। মাছ একবার ঢুকলে আর বের হতে পারতো না।
বিশেষ করে আষাঢ় মাসে কৃষকরা সন্ধ্যায় উনিয়া নিয়ে বের হতো। ধানক্ষেতও দেখে আসতো সাথে এটাও পানির স্রোতে রেখে আসতো। সকালে মাছ সহ উনিয়া নিয়ে আসতো। এজন্যে কৃষকদের মাছ খুব একটা বাজার থেকে কেনা হতো না। কালের বদলে এখন হয়তো কৃষকরাই এই উনিয়া (উইন্যা) চেনে না! আর শহুরেরা তো কথাই নাই।
বলছি এজন্যেই উনিয়া তো বিক্রিতেই শেষ নয়! এর পেছনে গল্প আছে। গ্রামে মূলত বাড়ির গৃহিনীরাই এই উনিয়া তৈরীর পেছনে কাজ করতো। কুটির শিল্পই বলতে পারেন। বাড়ির পেছনের জঙ্গলের যে বাঁশগুলোর স্বাস্থ্য কম বা বাড়ন্ত নয় সেটি দিয়েই এই উনিয়ার চিকন চিকন বেত তৈরী করতো। এরপর শিল্পীর ন্যায় অদ্ভুত গাঁথুনি দিয়ে এটি তৈরী করতো।
সেই দৃশ্য এখন অতীত। বাড়ির কতৃত্বের পাশাপাশি মহিলারা এই শিল্পটাও নিয়ন্ত্রন করতো। পুরুষরাও করতো। এখন সেই স্রোত নাই যে উনিয়া পেতে মাছের জন্যে অপেক্ষা করবে। স্রোত থাকলেও সেই শিল্পের স্বাদ এখন কেউ নিতে চায়না। সভ্যতার রুপ তো আর স্থায়ী নয়।
একসময় বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের রেল স্টেশনগুলোতে এই বাঁশ শিল্পের চিত্র দেখা যেতো। অনেকে রেলস্টেশন থেকেই ক্রয় করতো। কারন বাজারে কিনলে ক্রেতাকেই খাজনা দিতে হতো। এজন্যেই স্টেশনগুলো বাজারের বিকল্পরুপ হিসেবেই থাকতো। গৌরীপুর, ঈশ্বরগঞ্জ ও সোহাগী স্টেশনগুলো থেকে প্রচুর বাঁশের তৈরী পণ্য অন্য অঞ্চলে পাঠানো হতো।
আরেকটি শিল্প ছিলো বাঁশের চাটাই। এই স্টেশনগুলো থেকেই বেশি পার্শ্বেল হতো। এখন আগের মত হয় না। গ্রামে গঞ্জে নির্দিষ্ট দিনে হাট বসতো। এই চাটাই (স্থানীয় নাম ধারি) প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নৌকা বা সাইকেলে করে হাটে নিয়ে আসতো। সেখান থেকেই পাইকাররা কিনে বিভিন্ন জায়গায় পাঠাতো। তাই পার্শ্বেল সুবিধার্থে এই চাটাই বাজার প্লার্টফর্মেই বসতো। যেখানে ক্রয় সেখানেই পার্শ্বেল!
এই চাটাইয়ের গল্পগুলোতেও কিন্তু পরিবারের নারী সদস্যরাই থাকতো। তাদের নিখুত বুননে শিল্পটি এগিয়ে চলতো। বাজার ইতিহাসে বিভিন্ন পণ্য এখন বিলুপ্তির পথে। চাটাই উনিয়া বা বাঁশের বিভিন্ন পণ্য এখন আর সেভাবে পাওয়া যায়না। রেলস্টেশনের প্লার্টফর্মগুলিতেও এখন আর আগের মত বাঁশের তৈরী জিনিষপত্র চোখে পড়ে না।
আমরা এখন প্রকৃতি নির্ভর নই। প্রযুক্তি নির্ভর। তাই এমন পরিবর্তন। অনুভূতিও মনে হয় সেই পথেই চলে যাবে।
