মেলায় কত নতুন বই? সঠিক তথ্য নেই কমিটির কাছে

প্রকাশকরা বলছেন, নতুন বইয়ের তথ্য বাংলা একাডেমিকে জানিয়ে তাদের খুব একটা ‘লাভ হয় না’। বরং ৪/৫ শ টাকা দামের একটি বইয়ের কপি দিলে সেটাই ‘লোকসান’।

পাভেল রহমানবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 5 Feb 2024, 05:27 PM
Updated : 5 Feb 2024, 05:27 PM

একুশে বইমেলা শুরুর পর পাঁচ দিনে প্রকাশিত নতুন বইয়ের সংখ্যা কত? এর সঠিক হিসাব নেই মেলা পরিচালনা কমিটির কাছে।

মেলা পরিচালনা কমিটি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তথ্যকেন্দ্রের পাশে একটি নতুন বইয়ের প্রদর্শন স্টল রাখলেও সোমবার পর্যন্ত সেই স্টলে কোনো নতুন বই দেখা যায়নি। স্টলটি ফাঁকা পড়ে রয়েছে।

বইমেলার জনসংযোগ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত নতুন বই এসেছে ২৪১টি। তবে মেলার মাঠে ঘুরে বোঝা গেল, নতুন বই এসেছে জনসংযোগ বিভাগের ওই হিসাবের কয়েক গুণ বেশি।

মেলা পরিচালনা কমিটি বলছে, তারা প্রকাশকদের কাছে তথ্য না পাওয়ায় সঠিক হিসাব জানাতে পারেন না। বেশিরভাগ প্রকাশক নতুন বইয়ের তথ্য তাদের জানায় না।

আর প্রকাশকরা বলছেন, ওই তথ্য জানিয়ে তাদের খুব একটা ‘লাভ হয় না’। বরং ৪/৫ শ টাকা দামের একটি বইয়ের কপি দিলে সেটাই ‘লোকসান’।

তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া নিয়েও সমালোচনা করেছেন কেউ কেউ। নতুন বইয়ের প্রচারে আরও কার্যকর পদ্ধতি অবলম্বন করার তাগিদ দিয়েছেন প্রকাশকরা।

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রায় সাড়ে ১১ লাখ বর্গফুট জায়গাজুড়ে এবারের বইমেলা হচ্ছে। ৬৩৫টি প্রতিষ্ঠান মোট ৯৩৭টি ইউনিটে বইয়ের পসরা সাজিয়েছে।

এর মধ্যে একাডেমি প্রাঙ্গণে ১২০টি প্রতিষ্ঠানকে ১৭৩টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৫১৫টি প্রতিষ্ঠানকে ৭৬৪টি ইউনিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম অন্তত ৩০টি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে কথা বলে পাঁচ শতাধিক নতুন বইয়ের তথ্য জেনেছে।

বাতিঘর-এর স্বত্ত্বাধিকারী দীপঙ্কর দাশ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন, তারা এবার ৫০টির বেশি নতুন বই প্রকাশ করছে। যার মধ্যে ৩০টির মত বই মেলায় চলে এসেছে।"

সময় প্রকাশনের স্বত্ত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদ জানিয়েছেন, তারা অর্ধ-শতাধিক নতুন বই প্রকাশ করছেন, যার মধ্যে ৮০ শতাংশ বই মেলায় চলে এসেছে।

২৫টির বেশি নতুন বই প্রকাশের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে নবান্ন প্রকাশনীর কর্ণধার নূর নাহিয়ান জানান, তারা ইতোমধ্যে ১০টি নতুন বই মেলায় এনেছেন।

কথাপ্রকাশ স্টলের ব্যবস্থাপক জাফিরুল ইসলাম জানান, তারা এ পর্যন্ত ৪২টা নতুন বই এনেছেন স্টলে। মেলায় তারা ৭০টির বেশি নতুন বই প্রকাশ করবেন।

প্রথমা, প্রতিভা প্রকাশ, চন্দ্রবিন্দু, বাংলা প্রকাশ, অন্যপ্রকাশ, জার্নিম্যান বুকস, অবসর, অনন্যা, চারুলিপিসহ বিভিন্ন স্টলে কথা বলে জানা যায়, তাদের প্রকাশিত অধিকাংশ নতুন বই স্টলে এসেছে। তবে বেশিরভাগ নতুন বইয়ের তথ্য মেলা পরিচালনা কমিটিকে জানানো হচ্ছে না।

নতুন বইয়ের পরিসংখ্যান যেটি মেলা কমিটি থেকে জানানো হয়, তা যে সঠিক নয়- সেটি স্বীকার করেন মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব কে এম মুজাহিদুল ইসলামও।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, "আমরা প্রকাশকদের নতুন বইয়ের তথ্য জানাতে বলেছি। তারা যেটুকু তথ্য জানান, সে অনুযায়ী আমরা প্রতিদিন গণমাধ্যমে সংখ্যাটি জানায়। এছাড়া মেলার তথ্যকেন্দ্র থেকে মাইকেও সেই সংখ্যাটি এবং বইয়ের নাম প্রচার করি। এখন প্রকাশকরা যদি সব নতুন বইয়ের তথ্য আমাদের না জানান, আমাদের পক্ষে তো প্রতিদিন স্টলে গিয়ে খুঁজে খুঁজে বের করা কঠিন।"

বইয়ের সংখ্যা জানার প্রক্রিয়াটি সহজ করার আহ্বান জানিয়ে সময় প্রকাশনের ফরিদ আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "মেলায় নতুন বই কয়টি এসেছে, এটি জানা তো কঠিন কাজ না। নিশ্চয় যে প্রক্রিয়ায় এ পরিসংখ্যানটি করা হচ্ছে, সেটিতে ফোকর রয়েছে। প্রক্রিয়াটি আপডেট করা উচিত।"

কেন নতুন বইয়ের তথ্য কমিটিকে জানায় না প্রকাশকেরা? প্রতিভা প্রকাশের স্বত্ত্বাধিকারী মঈন মুরসালীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "সেখানে একটি করে বই জমা দিতে হয় এবং সেই বইটি জমা দিতে একাডেমি প্রাঙ্গণের তথ্যকেন্দ্রে যাওয়া লাগে। আমার স্টল সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে। কে প্রতিদিন সেখানে গিয়ে বই জমা দিয়ে আসবে? আর বই জমা দিলে তো ওই বইয়ের কপিটি লোকসানই হয়। কোনো লাভ তো হয় না।"

নতুন বইয়ের তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া আরও সহজ করা এবং নতুন বইয়ের প্রচার বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন মঈন মুরসালীন।

তিনি বলেন, "নতুন বইয়ের একটা প্রদর্শন স্টল আছে, সেটা একাডেমির ভেতরে, সেখানে তো কেউ যায় না। ওই স্টলটা থাকা উচিত ছিল উদ্যানের অংশে প্রবেশ পথে। ঢুকেই যেন লোকজন নতুন বইটি দেখতে পায় এবং তথ্য জানতে পারে। প্রকাশকরা যখন দেখবে, তাদের নতুন বইয়ের প্রচার হচ্ছে, তখন প্রকাশকরা আগ্রহী হবেন। সাংবাদিকরাও সেখান থেকে নতুন দেখে ভালো বইটির খবর প্রচার করবে।"

‘পাইরেটেড’ বই বিক্রি হচ্ছে মেলায়: টাস্কফোর্স

বইমেলায় আইএসবিএন ছাড়া পাইরেটেড বই বিক্রি হচ্ছে বলে নিশ্চিত হয়েছে মেলার টাস্কফোর্স কমিটি। তারা একাধিক প্রকাশনীর স্টল থেকে বেশ কিছু বইও জব্দ করেছে। তবে প্রকাশনীর নাম এখনই গণমাধ্যমে জানাচ্ছে না টাস্কফোর্স।

বইমেলা টাস্কফোর্স কমিটির আহ্বায়ক হাসান কবির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "শনিবার আমরা মেলা পরিদর্শন করেছি। সেখানে কয়েকটি স্টলে আইএসবিএন ছাড়া বই বিক্রি হতে দেখেছি। এছাড়া কিছু অনিয়ম পেয়েছি। আমরা আমাদের পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট আকারে সোমবার মেলা কমিটির সভাপতি মুহম্মদ নূরুল হুদাকে দিয়েছি। এখন কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে।"

নাম উল্লেখ না করে হাসান কবীর বলেন, "একটি স্টলের অধিকাংশ বই পাইরেটেড। বিক্রি হতে দেখেছি। আমরা সেই বই জব্দ করেছি। এই স্টলটি গতবারও একই কাজ করেছিল। পরে মুচলেকা দিয়ে স্টল চালু করে।"

স্টলের নাম জানতে চাইলে হাসান কবীর বলেন, "সেই স্টলের বিরুদ্ধে এখনো যেহেতু কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, নাম বলাটা সমীচীন হবে না।"

সোমবার বইমেলার পঞ্চম দিন মেলা শুরু হয় বিকেল ৩টায় এবং চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। এদিন নতুন বই এসেছে ৭০টি। লেখক বলছি মঞ্চের অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন কবি নাসির আহমেদ, কবি ইসলাম রফিক, শিশুসাহিত্যিক চন্দনকৃষ্ণ পাল এবং লোকসাহিত্য গবেষক সৈয়দা আঁখি হক। 

মূল মঞ্চ

বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হয় ‘সার্ধশত জন্মবার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলি: মোহাম্মদ রওশন আলী চৌধুরী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মাসুদ রহমান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ইসরাইল খান ও তপন বাগচী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাইফুল আলম।

পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি রবীন্দ্র গোপ, সরকার মাসুদ এবং মাসুদ পথিক। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী রেজিনা ওয়ালী, সাফিয়া খন্দকার রেখা এবং শামস্ মিঠু। 

ফয়জুল আলম পাপ্পুর পরিচালনায় দলগত আবৃত্তি পরিবেশন করে আবৃত্তি সংগঠন ‘প্রকাশ সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠন’-এর শিল্পীর। এছাড়া ছিল কবিরুল ইসলাম রতনের পরিচালনায় নৃত্য সংগঠন ‘নৃত্যালোক’ এবং জুয়েল কুমার সরকারের পরিচালনায় নৃত্য সংগঠন ‘নৃত্য নিকেতন’-এর নৃত্য পরিবেশনা। 

সংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী ফাতেমা তুজ জোহরা, ইয়াসমীন মুশতারী, খায়রুল আনাম শাকিল, সুমন মজুমদার, লীনা তাপসী খান ও সায়ন্ত মিশকাত জামি। যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন দেবাশীষ দাস (তবলা), ডালিম কুমার বড়–য়া (কী-বোর্ড), গাজী আবদুল হাকিম (বাঁশি) এবং ফিরোজ খান (সেতার)।  

মঙ্গলবার যা থাকবে

মঙ্গলবার বইমেলার ষষ্ঠ দিন। মেলা শুরু হবে বিকেল ৩টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত।

বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হবে ‘স্মরণ: মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন জফির সেতু। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন শাহিদা খাতুন ও সৌমিত্র শেখর। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন আবদুল খালেক।