কারাগারে মায়ের সঙ্গে ৩০৩ শিশু, সবচেয়ে বেশি কাশিমপুরে, পুনর্বাসনের সুপারিশ
নারী বন্দিরা তাদের সন্তানদের চার বছর বয়স পর্যন্ত কারাগারে রাখতে পারেন। বিশেষ ক্ষেত্রে কারা তত্ত্বাবধায়কের অনুমতি নিয়ে এ সময়সীমা ছয় বছর পর্যন্ত বাড়ানো যায়।
দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে রয়েছে ২৯৮ থেকে ৩০৩টি শিশু। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫১ শিশু রয়েছে কাশিমপুর কারাগারে। এসব শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য কারাগারের বাইরে পুনর্বাসনের সুপারিশ করা হয়েছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে এমন সুপারিশ করে কারাগারে বেড়ে ওঠা শিশুগুলোর স্বাভাবিক বিকাশ ও সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষায় নির্দিষ্ট বয়স শেষে তাদের নিকটাত্মীয়ের কাছে বিকল্প পারিবারিক যত্নের (ফস্টার কেয়ার) অথবা সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন সরকারি শিশু পরিবারে পুনর্বাসনের জন্য বলা হয়েছে।
হাই কোর্টের নির্দেশে তৈরি করা এ প্রতিবেদন সম্প্রতি এ বিষয়ে রিট আবেদন করা আইনজীবী কামরুন নাহার মাহমুদের (দীপা) কাছে পাঠিয়েছেন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
প্রতিবেদনটি ডাকযোগে হাতে পাওয়ার তথ্য দিয়ে এই আইনজীবী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, অবকাশ শেষে প্রতিবেদনটি হাই কোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে উপস্থাপন করা হবে।
তিনি বলেন, শিশুদের জন্য সুনির্দিষ্ট সরকারি নীতিমালা ও তহবিল না থাকায় বিকল্প পারিবারিক যত্নের ব্যবস্থা করতে হলে সরকারকে অর্থায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
মাঠপর্যায়ের তথ্য তুলে ধরে সমাজসেবার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে প্রায় ২৯৮ থেকে ৩০৩টি শিশু অবস্থান করছে। সরাসরি শিশু সুরক্ষা ইউনিটের আওতায় কারাগারে পৃথক কোনো কার্যক্রম না থাকলেও প্রবেশন শাখার মাধ্যমে শিশুদের মৌলিক চাহিদা পূরণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে কারাগারের পরিবেশ শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে অনুকূল নয়।
বর্তমানে প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে ‘অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতির’ মাধ্যমে কারাগারে আটক মায়েদের সঙ্গে অবস্থানরত এসব শিশুর প্রাথমিক বিকাশ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিয়মিত খেলনা, পোশাক এবং পুষ্টিকর শিশু খাদ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। এই মানবিক কার্যক্রম মূলত জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের অনুদান এবং সমাজের হৃদয়বান ব্যক্তিবর্গের স্বতঃস্ফূর্ত দানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
কারাগারে সবচেয়ে বেশি কাশিমপুরে
রিট আবেদনে সংযুক্ত কারা অধিদপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের ৭৪টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে ২৯৯টি শিশু ছিল। তাদের মধ্যে ১৫৩টি মেয়ে এবং ১৪৬টি ছেলে।
এসব শিশুর মায়েদের কেউ সাজা খাটছেন, আবার কারও মামলা বিচারাধীন। মায়েদের বেশির ভাগই মাদক মামলার আসামি বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগের ১৮টি কারাগারে ১০০টি শিশু, চট্টগ্রাম বিভাগের ১২টি কারাগারে ৯০টি, রাজশাহী বিভাগের আটটি কারাগারে ২৫টি, সিলেট বিভাগের পাঁচটি কারাগারে ১৯টি, রংপুর বিভাগের আটটি কারাগারে ২৫টি, খুলনা বিভাগের ১০টি কারাগারে ২০টি, ময়মনসিংহ বিভাগের চারটি কারাগারে ১৩টি এবং বরিশাল বিভাগের ছয়টি কারাগারে চারটি শিশু ছিল।
কারাগারগুলোর মধ্যে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে সবচেয়ে বেশি শিশু থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। গত ৪ মে পর্যন্ত সেখানে ৫১টি শিশু ছিল। তাদের মধ্যে ২৪টি ছেলে ও ২৭টি মেয়ে।
এসব শিশুকে কারাগারের নির্দিষ্ট ওয়ার্ড বা সেলে থাকতে হয়। সেখানে হত্যা ও মাদক মামলাসহ বিভিন্ন মামলার সাজাপ্রাপ্ত বন্দি ও হাজতিরাও থাকে বলেও সংযুক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
চার বছর পর কোথায় যাবে শিশুরা?
শিশুদের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করার নির্দেশনা চেয়ে গত ৯ মে হাই কোর্টে জনস্বার্থে রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী দীপা।
এতে বলা হয়, বাংলাদেশ জেল কোডের ৯৫৭ ধারা অনুযায়ী, নারী বন্দিরা তাদের সন্তানদের চার বছর বয়স পর্যন্ত কারাগারে রাখতে পারেন। বিশেষ ক্ষেত্রে কারা তত্ত্বাবধায়কের অনুমতি নিয়ে এ সময়সীমা ছয় বছর পর্যন্ত বাড়ানো যায়। কিন্তু এরপর শিশুদের কোথায় রাখা হবে এবং কীভাবে তাদের পরিচর্যা নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই।
আবেদনে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের উপযোগী পরিবেশ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রতিটি কারাগারে শূন্য থেকে তিন বছর এবং তিন থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের জন্য যথাক্রমে ডে-কেয়ার সেন্টার বা ক্রেশ এবং নার্সারি স্থাপনের নির্দেশনা চাওয়া হয়।
গত ১৫ জুন রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হকের হাই কোর্ট বেঞ্চ রুল জারি করেন।
কারাবন্দি মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশুদের যথাযথ নিরাপত্তা, কল্যাণ ও বিকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারকে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তা জানতে চাওয়া হয়।
একই সঙ্গে কোন কারাগারে কত শিশু রয়েছে, তাদের বয়স কত, কী পরিবেশে তাদের রাখা হচ্ছে এবং শিশুদের পরিচর্যায় কী ব্যবস্থা রয়েছে, তা জানিয়ে দুই মাসের মধ্যে সমন্বিত প্রতিবেদন দিতে আদালত নির্দেশ দেন।
আদালতের ওই আদেশের পর সমাজসেবা অধিদপ্তর শিশুদের পরিচর্যা ও পুনর্বাসন নিয়ে তাদের মতামত ও সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন তৈরি করে।
কারাগারে মায়ের সঙ্গে থাকা শিশুদের ভবিষ্যৎ ও বিকাশ নিশ্চিত করতে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল।
তিনি বলেন, কারাবন্দি মায়ের অপরাধের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার পাশাপাশি তার সঙ্গে থাকা শিশুর বিকাশ ও মাতৃস্নেহ পাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
সোমবার সুপ্রিম কোর্টে নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
লঘু অপরাধে অভিযুক্ত মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশুদের জন্য বিকল্প অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলে মনে করেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা।
শিশু আইনের অধীনে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা ভুক্তভোগী শিশুদের সংশোধনাগারে রাখার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে এ ধরনের একটি ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। তবে এটি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়।
এ প্রতিবেদনের পর সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এ বিষয়ে উদ্যোগ নেবে বলে আশার কথা বলেন তিনি।
