২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

সম্পর্কের ‘নতুন অধ্যায়’ শুরু করতে ‘একমত’ বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

“র‌্যাবের কার্যক্রমের বিষয়ে পাঁচটি পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, সেগুলো বিস্তারিত পেলে কাজ করা হবে,” বলেন তিনি।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 25 Feb 2024, 09:11 PM

Updated : 25 Feb 2024, 09:20 PM

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ‘নতুন অধ্যায়’ শুরু করতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের একমত হওয়ার কথা বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ।

রোববার সফররত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের পর এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, “সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তারাও চায় বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় এবং আমরাও চাই একটি নতুন সম্পর্ক, একটি সম্পর্কের নতুন অধ্যায় তাদের সাথে শুরু করতে।

“যেহেতু দুদেশেরই সদিচ্ছা আছে, সুতরাং এই সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ, গভীরতর ও উন্নয়নের মাধ্যমে আমাদের উভয় দেশ উপকৃত হবে।”

এদিন বিকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বিশেষ সহকারী ও দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক এইলিন লাউবাখেরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক হয়।

ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা-ইউএসএআইডির সহকারী প্রশাসক মাইকেল শিফার এবং যুক্তরাষ্ট্রের উপ-সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরিন আখতার।

আওয়ামী লীগের টানা চতুর্থ মেয়াদে সরকার গঠনের পর এটি যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের প্রথম সফর। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী আলোচনার পর পৃথকভাবে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান এবং এইলিন লাউবাখের।

এর আগে সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করে ইউএসএআইডির সহকারী প্রশাসক মাইকেল শিফারের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদল।

আলোচনায় র‌্যাবের উপর নিষেধাজ্ঞা, মিয়ানমারে যুদ্ধ, রোহিঙ্গা সংকট, গাজা ও ইউক্রেইনের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদ চৌধুরীকে ফেরানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ।

তিনি বলেন, “আমরা কীভাবে আমাদের সম্পর্কটাকে আরও গভীরতর করতে পারি এবং সম্পর্কের নতুন যুগ কীভাবে শক্তিশালী করতে পারি, সে নিয়ে আলোচনা করেছি।

“তারাও আমাদের সাথে গভীর সম্পর্ক, আমাদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চায়। এবং সেই সম্পর্ক উন্নয়ন করার লক্ষ্যেই কিছুদিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছিলেন এবং সেই চিঠিতে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় করার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ ব্যক্ত করেছিলেন।”

Image

পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে রোববার বিকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল।

গত ৭ জানুয়ারির ভোটে ২২৩টি আসনে জিতে টানা চতুর্থবারের মত সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। এ নির্বাচন নিয়ে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের একাংশ সন্তোষ প্রকাশ করলেও ভোট ‘সুষ্ঠু হয়নি’ বলে বিবৃতি দেয় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য।

এরপর ৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহের কথা জানান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।

সেই চিঠির প্রতিউত্তরের একটি কপি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের কাছে দেওয়ার কথা জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান হোয়াইট হাউজে ওই চিঠির মূল কপি পৌঁছে দেবেন।

ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতি এবং রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের ভোগান্তি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা তুলে ধরে হাছান বলেন, “গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার ব্যাপারে আমি তাদের সাথে আলোচনা করেছি।

“রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ যে আজকে আমাদের সবাইকে ভোগাচ্ছে এবং কোভিড মহামারীর পর এই যুদ্ধ হঠাৎ করে বেধে যাওয়া, সেটি আমাদের জন্য, সবার জন্য একটি হতাশার বিষয় ছিল; এই বিষয়গুলো আলোচনা করেছি।”

মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের ফাঁকে ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠকের প্রসঙ্গেও আলোচনা হওয়ার কথা বলেছেন হাছান মাহমুদ।

এ বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সাথে আমরা আলোচনা করেছি। আমরা বলেছি যে, আমাদের যে অবস্থানটা জেলেনস্কিকে জানিয়েছি, সেগুলিই তাদেরকে জানিয়েছি।”

‘গণতন্ত্র-মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়নি’

ঢাকায় শ্রম অধিকারকর্মী এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে এবারও পৃথকভাবে আলোচনায় বসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল। ওই দুই বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে সাংবাদিকরা জানতে চান, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না।

জবাবে হাছান মাহমুদ বলেন, “সেগুলো নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। নির্বাচন নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি, মানবাধিকার ইস্যুতেও কোনো আলোচনা হয়নি।”

সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শ্রম অধিকার নিয়েও বিস্তারিত কোনো আলোচনা হয়নি।

বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “সেটি কীভাবে বাড়ানো যায়, আমাদের উন্নয়ন অভিযাত্রায় কীভাবে তারা আরও বেশি সহায়তা করতে পারে, সে নিয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি।”

মিয়ানমার, রোহিঙ্গা সংকট ও নিরাপত্তা

মিয়ানমারের যুদ্ধ ও তার প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা ঝুঁকির পাশাপাশি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরানোর বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হওয়ার কথা জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

মিয়ানমার পরিস্থিতির কারণে বঙ্গোপসাগর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো উদ্বেগ আছে কি না, এমন প্রশ্নে হাছান বলেন, “মিয়ানমার পরিস্থিতির কারণে আমাদের এখানে যে নিরাপত্তা সমস্যা তৈরি হয়েছে, এটা তো সঠিক। মিয়ানমার থেকে ৩৩০ জন নিরাপত্তা বাহিনীর, বিশেষ করে সীমান্তরক্ষী এবং আর্মির- তারা এখানে পালিয়ে আসছিল, তারা ফেরতও নিয়ে গেছে।

“এবং সেখানে যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি, আরাকান আর্মির সাথে যে সরকারি বাহিনীর যে সংঘাত, সেই সংঘাতের কারণে আমাদের এখানে যে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, সেটি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি।”

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “তাদেরকে ধন্যবাদ জানিয়েছি যে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে তারা ক্রমাগতভাবে মিয়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগ করছে এবং রোহিঙ্গাদেরকে এখানে যে আশ্রয় দিয়েছি, সেক্ষেত্রে তারা নানাভাবে সহায়তা করছে। সে বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি।”

প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সহযোগিতার বিষয়ে এক প্রশ্নে হাছান মাহমুদ বলেন, “রোহিঙ্গারা সসম্মানে, সব ধরনের অধিকারসহ মিয়ানমারে ফেরত যাওয়াই যে একমাত্র সমাধান, এটির ব্যাপারে তারা একমত। এ নিয়ে আমরাও একমত।”

নিরাপত্তা ইস্যুতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “নিরাপত্তা ইস্যুতে আমাদের বহুমুখী সহায়তা আছে। আমরা বহুক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও আমাদের অভিন্ন অবস্থান রয়েছে, সেটা নিয়েও আলোচনা করেছি।”

সামরিক সহযোগিতার অংশ হিসাবে জিসোমিয়া এবং আকসা নামে দুটি চুক্তি করার কথা বলে আসছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।

এ দুই চুক্তি নিয়ে রোববার আলোচনা হয়েছে কি না, এ প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তি নিয়ে আলোচনা করিনি। তবে জিসোমিয়াকে আমরা বিবেচনা করছি, আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি।”

‘র‌্যাবের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ দফা পর্যবেক্ষণ’

গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে এলিট ফোর্স র‌্যাবের উপর যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হওয়ার কথা বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “র‌্যাবের কার্যক্রমের বিষয়ে পাঁচটি পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সেগুলো বিস্তারিত পেলে কাজ করা হবে।

“র‌্যাবের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি। তারা পাঁচটা পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, সেই পর্যবেক্ষণগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি। তারাও এটি কীভাবে উঠানো যায়, সে নিয়ে কাজ শুরু করেছেন; তারা কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। সেগুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি।”

পর্যবেক্ষণের বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “পর্যবেক্ষণগুলো আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। তারা বিস্তারিত দেবে, ওটা র‌্যাবের কাছে দেবে। যখন আমরা পাব, তখন সেটি নিয়ে আমরা কাজ করব।”

আরেক প্রশ্নে হাছান মাহমুদ বলেন, “ওরা পাঁচটা পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। আমরা পর্যবেক্ষণগুলো বিস্তারিত পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি।”

যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদ চৌধুরীর ফেরানোর বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হওয়ার কথা জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “(যুক্তরাষ্ট্রের) বিচার বিভাগে বিষয়টি আছে। আমাদেরকে যেটা জানিয়েছে- বিচার বিভাগকে তারা বলেছে, তারা বিচার বিভাগ থেকে একটা সিদ্ধান্ত চেয়েছে।”