রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক মুক্তির বার্তা বিশ্বে তুলে ধরেছি: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে বন্ধুপ্রতিম দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সঙ্গে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা আরও দৃঢ় হয়েছে এবং সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 23 Feb 2024, 06:12 AM
Updated : 23 Feb 2024, 06:12 AM

সম্প্রতি মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক মুক্তির বার্তা তুলে ধরার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা জানাতে শুক্রবার সকালে গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে এসে প্রধানমন্ত্রী লিখিত বক্তব্যে বলেন, “মিউনিখে আমার এই ফলপ্রসূ সফরের ফলে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের শান্তি, সার্বভৌমত্ব ও সর্বাঙ্গীন নিরাপত্তার প্রতি অঙ্গীকার বলিষ্ঠ রূপে প্রতিফলিত হয়েছে।

“দেশের আকার নয় বরং নীতির শক্তিতেই যে মানবতার রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক মুক্তি, এবারের সম্মেলনে আমি এই বার্তাই বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছি। পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে বন্ধুপ্রতিম দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সঙ্গে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা আরও দৃঢ় হয়েছে এবং সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়েছে।”

মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে অংশ নিতে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি জার্মানিতে যান শেখ হাসিনা, ফেরেন ১৯ ফেব্রুয়ারি সকালে।

সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকজন বিশ্ব নেতার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয় এই সফরে।

জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলৎজ, ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুতে, আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ, কাতারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান আল থানি এবং ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটি ফ্রেডরিকসেনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন শেখ হাসিনা।

এই সফরে বিভিন্ন আলোচনায় শেখ হাসিনা রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ বন্ধ এবং গাজায় হামলা বন্ধের আহ্বান জানান।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং যুক্তরাজ্যের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এবং জার্মান ফেডারেল অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন মন্ত্রী সভেনজা শুলজেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত করেন।

মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা জানাতে শেখ হাসিনা বলেন, “এটি সমকালীন ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার স্বার্থে উচ্চ-পর্যায়ের নিয়মিত আলোচনার একটি শীর্ষস্থানীয় ফোরাম হিসেবে বিবেচিত। এ বছরের ফোরামে ৩৫ জনেরও বেশি রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান অংশগ্রহণ করেছেন। বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আঞ্চলিক সংঘাত, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, নিউক্লিয়ার নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু নিরাপত্তা, তথ্য নিরাপত্তা, পানি নিরাপত্তা, অভিবাসন, সাপ্লাই চেইন, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মহামারি ইত্যাদি বিষয়ে এবারের ফোরামে আলোচনা করা হয়।”

অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা-নিষেধাজ্ঞার বিরূপ প্রভাবের বিষয়টি বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি গাজা ও বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে চলমান যুদ্ধ-বিগ্রহ, অবৈধ দখলদারিত্ব এবং নিরস্ত্র মানুষ বিশেষ করে মহিলা ও শিশুদের অমানবিক হত্যার কবল থেকে মুক্ত করে সকলপ্রকার যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ করার জোর আহ্বান জানাই।

“আর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা-নিষেধাজ্ঞা বিরূপ প্রভাব যে যুদ্ধক্ষেত্র থেকেও বহুদূর পর্যন্ত অনুভূত হয়, এ বিষয়ে আমি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। এ প্রসঙ্গে আমি অর্থহীন অস্ত্র প্রতিযোগিতার সমাপ্তি ঘটিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় রসদ ও অর্থায়ন সহজলভ্য ও কার্যকর করার জন্য সকলকে অনুরোধ করি। মানবতার অস্তিত্বের সংকটকালে ক্ষুদ্র স্বার্থ যে শুধু অনর্থই বয়ে আনে- এই রূঢ় বাস্তবতা আমি সকলের সামনে তুলে ধরি।”

Also Read: নতুন সরকার গঠনের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

শেখ হাসিনা মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে ‘ফ্রম পকেট টু প্ল্যানেট: স্কেলিং আপ ক্লাইমেট ফাইন্যান্স’ শীর্ষক একটি প্যানেল আলোচনায় ছয়টি প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং তা মোকাবিলায় অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহ্বান জানাই। আমি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সমস্যা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অর্থায়নের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনার জন্য বিশ্বের সকলকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানাই।

“জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বহুবিধ নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবেলায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ও জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থায়নের পরিমাণ বৃদ্ধি, প্রতিশ্রুত অর্থের বাস্তবিক হস্তান্তর, ঝুঁকিপূর্ণ দেশ সমূহের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করার উপর আমি বিশেষভাবে জোর দেই। জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলায় আমি ধনী দেশসমূহের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে পারস্পরিক অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতার ভিত্তিতে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানাই।”

কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে শেখ হাসিনা বলেন, “পারস্পরিক ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, এলএনজি সরবরাহ প্রভৃতির পাশাপাশি রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই ও দ্রুত সমাধানে কাতারের অব্যাহত সমর্থনের ব্যাপারে তিনি আশ্বস্ত করেছেন। গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সহিংসতা বন্ধে একযোগে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেও আমরা আলোচনা করি।”

বিশ্ব ব্যাংকের ডেভেলপমেন্ট পলিসি অ্যান্ড পার্টনারশিপের সিনিয়র ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যাক্সেল ভ্যান ট্রটসেনবার্গের সঙ্গে আলোচনার বিষয়বস্তু জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশ ও বিশ্ব ব্যাংকের ৫০ বছরের অংশীদারত্বের প্রেক্ষাপটে আমি মধ্যম আয়ের দেশভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অবদানের আলোকে বর্তমান অর্থবছরে বাজেট সহায়তা হিসেবে বিশ্ব ব্যাংক হতে অঙ্গীকারকৃত ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দ্রুত ছাড়ের আহ্বান জানাই।

“পাশাপাশি আমি জোরপূর্বক স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের সাহায্যার্থে এবং এই সমস্যার বিরূপ প্রভাবে আক্রান্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে প্রদত্ত ৭০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়ন সহায়তার জন্যও তাকে ধন্যবাদ জানাই। বাংলাদেশের উচ্চ-মধ্যম আয় ও উচ্চ-আয়ের দেশের পর্যায়ে উত্তীর্ণ হবার কাঙ্ক্ষিত পথে বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আমাকে আশ্বস্ত করেন।”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গ্যাব্রিয়েসুসের স্বাস্থ্য খাতে, বিশেষ করে মৌলিক স্বাস্থ্য সেবায় বাংলাদেশের অর্জনের ভূয়সী প্রশংসা করেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “বিশ্বের বাকি দেশসমূহকে বাংলাদেশের কমিউনিটি ক্লিনিক মডেল অনুসরণ করার বিষয়ে অনুপ্রাণিত করার জন্য আমাকে অনুরোধ করেন। আলোচনাকালে আমি বর্তমান সরকারের সেকেন্ডারি ও টার্শিয়ারি স্বাস্থ্যসেবা, টিকা উৎপাদন, অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ, নার্সিং ও অন্যান্য স্বাস্থ্যখাতে মানব সম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে গৃহীত পদক্ষেপসমূহের কথা উল্লেখ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তা আশা করি।

“এ বিষয়ে মহাপরিচালক আমাকে আশ্বস্ত করেন এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির দ্রুত সমাপনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সমর্থন কামনা করেন।”

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে মিয়ানমার ও মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বিষয়েও পারস্পরিক মতবিনিময় করার কথাও জানান শেখ হাসিনা।

সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।

লিখিত বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রীর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই সংবাদ সম্মেলন বরাবরের মতোই রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার হয়।