অবমাননা আইন আদালতের ‘টুঁটি চেপে ধরতে’: হাই কোর্ট

আদালত অবমাননা আইন ২০১৩ বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 16 Nov 2022, 04:48 PM
Updated : 16 Nov 2022, 04:48 PM

সংবিধানকে উপেক্ষা করে আদালতের ‘টুঁটি চেপে ধরতে’ আদালত অবমাননা আইন-২০১৩ প্রণয়ন হয় বলে আইনটি বাতিল করে দেওয়া রায়ের পর্যবেক্ষণে মন্তব্য করেছে হাই কোর্ট।

সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে ‘আদালত অবমাননা আইন ২০১৩’ অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে নয় বছর আগে যে রায় দিয়েছিল হাই কোর্ট, সে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হলে তাতে এই মন্তব্য দেখা যায়।

রায়ে বলা হয়, “এ আইনের ৪, ৫, ৬, ৭, ৯, ১০, ১১, ১৩(২) ধারাগুলো সাধারণভাবে পড়লে মনে হবে যে, পুরো আইনটি তৈরি করা হয়েছে সংবিধানের ১০৮, ১১২ এবং ২৭ অনুচ্ছেদ উপেক্ষা করে আদালতের ক্ষমতাকে টুঁটি চিপে করা।”

১৯২৬ সালের আদালত আবমাননার আইন বাতিল করে ২০১৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি সংসদে নতুন আইন পাস করে সরকার। পরে একই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি গেজেট প্রকাশ করে এ আইনটি কার্যকর করা হয়।

কার্যকরের এক মাসের মাথায় আইনের আটটি ধারার (৪, ৫, ৬, ৭, ৯, ১০, ১১, ১৩ (২) বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দুই আইনজীবী হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন।

ওই আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ওই বছরের ৩ এপ্রিল হাই কোর্ট রুল জারি করে। রুলে চূড়ান্ত শুনানির পর একই বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর নতুন আইনটি বাতিলের পাশাপাশি পুরনো আইনটি প্রতিস্থাপন করে বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি এ বি এম আলতাফ হোসেনের হাই কোর্ট বেঞ্চ রায় দেয়।

সে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি বুধবার হাতে পেয়েছেন বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান রিট আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।

৩৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি লিখেছেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক।

রাষ্ট্রপক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করবে কি না জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, “রায়টি এখনও দেখা হয়নি। রায় দেখার পর সরকারকে এ বিষয়ে জানিয়ে তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

২০১৩ সালে এ রায় ঘোষণার পর রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে ওই সময় আবেদন করেছিল রাষ্ট্রপক্ষ। কিন্তু চেম্বার আদালত উচ্চ আদালতের রায়ে হস্তক্ষেপ না করে আবেদনটি শুনানির জন্য আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, যা এখনও বিচারাধীন রয়েছে।

প্রণীত আইনে যা ছিল

আদালত অবমাননা বিষয়ে ২০১৩ সালের আইনের ৪ ধারায় বলা হয়, নির্দোষ প্রকাশনা বা বিতরণ অবমাননা নয়। ৫ ধারায় বলা হয়, আদালতের বিচারিক কার্যধারা বা তার অংশ বিশেষ নিয়ে অথবা শুনানি শেষে আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে এমন কোনো মামলার গুণাগুণ সম্পর্কে ‘পক্ষপাতহীন ও বস্তুনিষ্ঠ’ সংবাদ প্রকাশ করলে তা অদালত অবমাননা হিসাবে গণ্য হবে না।

৬ ও ৭ ধারায় বলা হয়, কোনো ব্যক্তি অধস্তন আদালতের বিচারক সম্পর্কে ‘সরল বিশ্বাসে’ কোনো বিবৃতি বা মন্তব্য করলে অথবা আদালতের খাস কামরায় বা রুদ্ধদ্বার কক্ষে অনুষ্ঠিত বিচারিক কার্যধারা সম্পর্কে পক্ষপাতহীন ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য প্রকাশ করলে তাও আদালত অবমাননা হিসাবে গণ্য হবে না।

আর ৯ ধারায় বলা হয়, এ আইনের অধীন শাস্তিযোগ্য নয় এমন প্রকাশনা বা কাজ এ আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য হবে না।

অন্যদিকে ১০, ১১ ও ১৩ (২) ধারায় সরকারি কর্মচারীদের আদালত অবমাননা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে।

এতে বলা হয়, কোনো কর্মকর্তা রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন, বিধিমালা, সরকারী নীতিমালা অনুসরণ করে কোনো পরিপত্র, প্রজ্ঞাপন বা স্মারক জারি করলে বা এবং আদালতের কোনো রায়, আদেশ বা নির্দেশ ‘যথাযথ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও’ বাস্তবায়ন বা প্রতিপালনে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ তোলা যাবে না।

তাতে আরও বলা হয়, আদালত অবমাননার মামলায় জড়িত কোনো সরকারি কর্মকর্তা অপসারিত হলে বা অবসরে গেলে আদালত তাকে অবমাননার দায় থেকে অব্যহতি দিতে পারবে। এছাড়া আদালত অবমাননার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত কেউ আপিলে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইলে আদালত তার দণ্ড মওকুফ বা হ্রাস করতে পারবে।

রায়ে যা বলা হল

সরকারি কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের স্বার্থে এ আইন করে তাতে সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে বৈষম্য করা হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।

“এটা খুবই আশ্চর্যজনক যে অভিযুক্ত ধারাগুলোর মূল বিষয় হল- দেশের অন্যান্য নাগরিকদের উপেক্ষা করে সরকারি কর্মচারি এবং সাংবাদিকদের রক্ষা করা, যা সম্পূর্ণ বৈষম্যমূলক।”

সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টকে আদালত অবমাননার বিচারের ক্ষমতা দেওয়া হলেও এ আইনের ‘অপ্রত্যাশিত ধারাগুলো’ আদালতের ক্ষমতাকে খর্ব করার জন্য করা হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।

সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী’। আর ১১২ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় সীমানার অন্তর্ভুক্ত সকল নির্বাহী ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ সুপ্রীম কোর্টের সহায়তা করিবেন’।

রায়ে বলা হয়েছে, অথচ আইনটির ১০ ধারার মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের আদালতের আদেশ উপেক্ষা করতে স্পষ্ট সমর্থন দেওয়া হয়েছে। ‘সরল বিশ্বাসের’ আড়ালে আদালতের আদেশ না মানায় উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এটি কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক চেতনা হতে পারে না।

‘অবাধ স্বাধীনতা বলতে স্বাধীনতার অনুপস্থিতিকে বোঝায়’ এমন দার্শনিক উক্তি তুলে রায়ে আরও বলা হয়েছে, “কোনো বাধ্যবাধকতা বা সীমাবদ্ধতা ছাড়া স্বাধীনতার মানে হচ্ছে স্বাক্ষর করে কারও হাতে ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়ে দেওয়া।”

সরকারি কর্মচারী ও সাংবাদিকদের আদালত অবমাননার অভিযোগ থেকে বাঁচাতে বা রক্ষা করতেই এই ধারাগুলো আইনে সন্নিবেশ করা হয়েছে মন্তব্য করে রায়ে বলা হয়, সংবিধানের ২৬(১), ২৭ ও ১০৮ অনুচ্ছেদের সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। মূলত এটি বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদেরও লঙ্ঘন।

“তাই এই ধারাগুলো অবৈধ এবং বাতিল ঘোষণা করা হলো। আর এই ধারাগুলো ছাড়া যেহেতু পুরো আইনটি অর্থহীন অপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে, তাই ‘আদালত অবমাননা আইন, ২০১৩’ আইনটি বাতিল করে ‘আদালত অবমাননা আইন, ১৯২৬’ আইনটি পুনঃস্থাপন করা হল।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক