আইএমইআই বদল ৫ সেকেন্ডেই, ‘ফোন চোর ধরা জটিল হচ্ছে’

ঢাকার চারটি চক্র পাঁচ-ছয় বছরে ২০ হাজার মোবাইল ফোন চুরি বা ছিনতাই করে আইইএমআই বদলে বিক্রি করেছে, বলছে র‌্যাব।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 2 April 2024, 07:50 PM
Updated : 2 April 2024, 07:50 PM

মোবাইল ফোন হাতে পাওয়ার কয়েক সেকেন্ডেই আইএমইআই নম্বর বদলে ফেলতে সিদ্ধহস্ত তারা; এ কাজে নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করায় ফোনের এই ইউনিক নম্বর আর খুঁজে পাওয়া যায় না। যে কারণে এখন ফোন হাতছাড়া হলে তা ফিরে পাওয়া ‘খুবই দূরহ’ হয়ে পড়েছে বলে মনে করছে র‌্যাব। 

গুগলের অ্যান্ড্রয়েড প্ল্যাটফরমের ফোনগুলোর বেলায় এমনই একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সফটওয়্যার ব্যবহার করে কয়েক সেকেন্ডেই এ কাজ করতে দক্ষ হয়ে উঠেছে একটি চোর চক্রের কারিগররা। 

তবে আইফোনের ক্ষেত্রে বিষয়টি তুলনামূলক কঠিন হওয়ায় ছিনতাইকারীরা অ্যাপলের এ ডিভাইস তেমন পছন্দ করে না; হাতে পাওয়ামাত্র প্রাথমিক অবস্থাতেই মোবাইল যন্ত্রাংশের দোকানে বিক্রি করে দেয়। 

প্রায় এক হাজার মোবাইল ফোনসহ ছিনতাইকারী চক্রের ২০ জনকে গ্রেপ্তারের পর তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব জানতে পেরেছে পুলিশের বিশেষ ইউনিট র‌্যাব। 

ঢাকার কারওয়ান বাজারে নিজেদের মিডিয়া সেন্টারে মঙ্গলবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন মোবাইল চোর চক্রের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন। 

প্রতিটি মোবাইল ফোনের একটি স্বতন্ত্র শনাক্তকারী নম্বর থাকে যেটাকে বলা হচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি (আইএমইআই)। চলতি বছরেই মোবাইল ফোনের অবৈধ ব্যবহার বন্ধে জোরেশোরে মোবাইল ফোনের আইএমইআই নিবন্ধনের উদ্যোগের কথা জানানো হয় সরকারের পক্ষ থেকে।

আইইএমআই নম্বর পরিবর্তিত এমন চোরাই ফোন নিবন্ধন পাবে কি না বা সেগুলো শনাক্তের কী ব্যবস্থা, জানতে চাইলে বিটিআরসির কমিশনার (স্পেকট্রাম) শেখ রিয়াজ আহমেদ বলেন, “আসলে আইএমইআই নম্বরটা জিএসএমএ থেকে দেওয়া হয়। আমাদের দেশের যারা মোবাইল ফোন প্রস্তুতকারক আছেন তারা আইএমইআই নম্বরগুলো থোক হিসেবে জিএসএমএ থেকে কিনে আনেন। এরপর ওরা প্রতিটি হ্যান্ডসেটের একটি করে আইএমইআই নম্বর দিয়ে দেয়। 

“এখানে সফটওয়্যার দিয়ে কিছু করা যায় কী না সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আপাতত সেগুলো শনাক্ত করা না গেলেও ভবিষ্যতে এ ধরনের ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা যাবে।“ 

তিনি বলেন, “মোবাইল কোম্পানিগুলো যে আইএমইআই নম্বরের সেটগুলো বিক্রির জন্য পাঠায় সেই নম্বরগুলো তারা আমাদের জানায়। তখন আমরা সেটা আমাদের ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) সিস্টেমে অন্তর্ভূক্ত করে নিই। তাদের (চোরাই ফোন) এখানে নিবন্ধনের সুযোগটা নেই। আর আমরা যেভাবে পরিকল্পনা করছি সেটা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারলে এই ধরনের ফোন শনাক্তকরণের ব্যবস্থা থাকবে।”

আইএমইআই বদলাতে ৫ সেকেন্ড

র‌্যাবের কর্মকর্তা খন্দকার মঈনের ভাষ্য, গ্রেপ্তারদের মধ্যে দেলোয়ার ও আবুল মাতুব্বর এতটাই দক্ষ যে তারা মোবাইল ফোন চুরি করার পর অল্প সময়ের মধ্যেই কোনো ক্ষেত্রে চার-পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে আইএমইআই নম্বর পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। 

“তাদের সঙ্গে কথা বলে আমরা যেটা জেনেছি তাদের চুরি করার পদ্ধতিও অভিনব। আর তারা যেহেতু খুব আধুনিক একটি পদ্ধতি (সফটওয়্যার) ব্যবহার করে আইএমইআই নম্বর পরিবর্তন করে ফেলছে কাজেই ফোন হারিয়ে গেলে সেটা পাওয়া খুবই ডিফিকাল্ট।“ 

তিনি বলেন, ভুক্তভোগীরা ফোনের আসল আইইএমআই নম্বর দিয়ে জিডি বা মামলা করেন। কিন্তু সেটা বদল হয়ে যাওয়ায় সেটি উদ্ধার বা চোরদের ধরার উপায়ই থাকছে না। 

“এজন্য আমাদের সকলকে সতর্ক থাকতে হবে। একবার আইএমইআই পরিবর্তন করার পর আগের আইইএমআই নম্বরটাও আর পাওয়া যায় না। আমরা পরিবর্তিত নম্বরটারই তখন দেখতে পাই। এমনকি তারাও (অভিযুক্তরা) একবার আইইএমআই বদলে ফেলার পর পুরনো নম্বর বের করে দিতে পারে না।” 

র‌্যাবের মুখপাত্র বলেন, এ চক্রের অন্যতম নেতা দেলোয়ারের কাছ থেকে প্রায় ৩০০ স্মার্ট ফোন ও ১৮০টি ফিচার বা বাটন ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। সে গুলিস্তানকেন্দ্রিক চক্রের নেতা। তারা গত পাঁচ-ছয় বছরে ২০ হাজার মোবাইল ফোন চুরি ছিনতাই করে আইইএমআই পরিবর্তন করে বিক্রি করেছে। চক্রের ২০ জনের মধ্যে নয়জন র‌্যাব ও পুলিশের হাতে এর আগেও গ্রেপ্তার হয়েছে।

“চক্রের কয়েকজন নিজেরা ফোন ছিনতাই করে। পাশাপাশি চক্রের অন্য সদস্যরা ছিনতাই বা চুরি করা ফোনগুলো কেনে। অল্প সময়ে আইইএমআই নম্বর পরিবর্তন করে তারা ভালো ফোনগুলো মোবাইল মেরামতের দোকানে দিয়ে ৫০০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করে। আর যেগুলো একটু খারাপ সেগুলো গুলিস্তানসহ বিভিন্ন মার্কেটের সামনে টেবিলের ওপরে নিয়ে বিক্রি করা হয়। মানুষ এই ফোনগুলো কেনেনও।” 

আইফোনগুলো তারা দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয় এরকম কথা বাজারে প্রচলিত আছে। সে বিষয়ে তারা কিছু বলেছে কি না জানতে চাইলে র‌্যাব কর্মকর্তা মঈন বলেন, “আমরা যে কয়টা স্মার্টফোন পেয়েছি সবই অ্যান্ড্রয়েড। তারা বলেছে, আইফোনের আইএমইআই পরিবর্তন করা তুলনামূলক খরচ বেশি, কারণ যারা এটা করতে পারেন তাদের চার্জ বেশি। সে কারণে আইফোন তারা পেলে মোবাইল মেরামতির দোকানে প্রাথমিকভাবেই বিক্রি করে দেন।”