Published : 30 Aug 2023, 01:05 AM
রাত আনুমানিক ১১টা। মিরপুরের শিয়ালবাড়ি মোড়ে দাঁড়িয়ে পুলিশের একটি টহল গাড়ি। মিরপুর-১ নম্বরের সি ব্লকে পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করলে একজন উপপরিদর্শক রাজি হন এবং গন্তব্যে রওয়ানা দেন।
পথে পুলিশের টহল গাড়ির পাশ দিয়ে দ্রুতগতিতে চলে যায় একটি মোটর সাইকেল। আরোহী ছিল তিন জন।
ইচ্ছা থাকলেও বাইক আরোহীদের পরিচয় জানতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সেই এসআই বললেন, “তাদেরকে তো ধরা যাবে না। কারণ আমাদের গাড়ির গতি বাড়ালেই ইঞ্জিনে তেল উঠে বন্ধ হয়ে যাবে।”
সন্দেহভাজনদের তাড়া করতে না পারলে কীসের ডিউটি দিচ্ছেন- এই প্রশ্নে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “কী বলব? রূপনগর থানায় পাঁচটি টহল গাড়ি আছে। একটারও অবস্থা ভালো না। এভাবেই চলে আরকি। গতি বাড়ানো যায় না। ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার গতিতে চলে গাড়িগুলো।
“পরিবহন শাখায় পাঠানো হলে একটু মেরামত করে আবার থানায় পাঠিয়ে দেয়। নতুন কোনো গাড়ি দেয় না। নতুন গাড়ি দিলে পাঁচ বছরেও তাতে হাত দিতে হত না, আর গাড়িগুলোর গতিও ভালো থাকত।”
এই অবস্থা শুধু রূপনগর থানা নয়। রাজধানীর ৫০টি থানার টহল গাড়িগুলোর অবস্থাও ‘লক্কড়ঝক্কড়’ বলে আক্ষেপ করলেন ওই এসআই।

রাজধানীর প্রায় দুই কোটি বাসিন্দার নিরাপত্তায় ৫০টি থানায় বরাদ্দ গাড়ির সংখ্যা ৩৫৭টি। সব মিলিয়ে এই মহানগরে পুলিশের গাড়ির সংখ্যা এক হাজার ৫৫৩টি।
এর মধ্যে রয়েছে বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স, রেকার, প্রিজনভ্যান, আর্মার পুলিশ ক্যারিয়ার (এপিসি), লাশবাহী ভ্যান ইত্যাদি। এসব গাড়ির মধ্যে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে ১১৫টি।
ঢাকার একটি থানার ওসি নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, অপরাধীকে ধরতে যাওয়ার মত ভালো গাড়ি তো নেই। ভিআইপি ডিউটি দিতে গেলেও বিব্রত হতে হয়।
“একবার ভিআইপি ডিউটি দেওয়ার সময় বহরের গাড়ির গতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় বহর থেকে বের হয়ে আসতে হয়েছিল। আমার থানা এলাকায় ওই বহর যাওয়ার সময় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তো আমার উপরই সব দায় বর্তাত। কিন্তু এখানে আমার তো কোনো দোষ নেই,” বলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই পুলিশ কর্মকর্তা।
তুরাগ থানার পাঁচটি টহল গাড়ির মধ্যে তিনটি লক্কড়ঝক্কড় হলেও দুটি ভালো।
এই থানার ওসি মওদুত হওলাদার বলেন, “বেড়িবাঁধে ডিউটি দিতে হলে অনেক গতির গাড়ি প্রয়োজন। কারণ এখানে দস্যুতা করে মোটর সাইকেলে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা বেশি ঘটে।”
সারাদেশে একই চিত্র
ঢাকাসহ সারাদেশে যানবাহন সংকট রয়েছে বলে পুলিশের কর্মকর্তারা জানান। থানায় ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী গাড়িও চলছে। লক্কড়ঝক্কড় গাড়িগুলোর ফিটনেস মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে আগেই।
পুলিশ সদরদপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, গত তিন অর্থবছরে ১ হাজার ১৭টি যানবাহন কেনা হয়েছে। এর মধ্যে মোটর সাইকেলই ৬৬৫টি।
সব মিলিয়ে পুলিশের গাড়ি আছে ১১ হাজার ৯২৩টি। এর মধ্যে মোটর সাইকেল ৬ হাজার ৪৪৫টি। বাকি ৫ হাজার ৪৭৮টি যানবাহন দিয়ে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করছে পুলিশ।

পুলিশের কেনাকাটা সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পুলিশের কেনাকাটা স্থগিত রাখার পর জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে অন্তত ২০০ ডাবল কেবিন পিকআপ কেনার সম্মতি পাওয়া গেছে।
জনবলের তুলনায় এখনো ৪ হাজার ৫২৯টি যানবাহনের ঘাটতি আছে বলে পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ফলে শতাধিক কর্মকর্তা পুলিশ সুপার (এসপি), অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক ও উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) হিসেবে পদোন্নতি পেলেও জিপের ঘাটতি থাকায় তাদেরকে যানবাহন বরাদ্দ দেওয়া যাচ্ছে না।
সংকটের কারণে পুলিশের অনেক কর্মকর্তাকে অনেক সময় গাড়ি ভাড়া করে বিভিন্ন স্থানে অভিযানে যেতে হয়। এছাড়া নিজ থানা এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সার্বক্ষণিক টহল দেওয়ার জন্য গাড়ি রিকুইজিশন করতে হয়। রিকুইজিশন করা ফিটনেসবিহীন লেগুনায় পুলিশের টহলদৃশ্য খুবই পরিচিত।
লক্করঝক্কর গাড়ি নিয়ে অপরাধীদের পেছনে ছুটতে অনেকটা অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন থানা কিংবা মাঠ পর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যরা।
এভাবে গাড়ি সংকটে অপারেশনাল কাজ কীভাবে সামাল দেওয়া হচ্ছে বা কাজের ব্যাঘাত ঘটছে কিনা জানতে চাইলে পুলিশে সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশন) আনোয়ার হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আরও গাড়ি ক্রয় বা গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেওয়া ছাড়াও কীভাবে সমাধান করা যায় তা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

“তবে যেসব গাড়ি রয়েছে, সেসব গাড়ি মেনটেইনেন্সে জোর দেওয়া হচ্ছে। মেরামত করেই আমাদের অপারেশনাল কাজ করতে হবে।”
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে গেলে অপ্রতুল যানবাহন নিয়ে তা কীভাবে সামাল দেওয়া যাবে জানতে চাইলে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, “রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দমনের জন্য গাড়ি নয়। অপরাধ দমনই পুলিশের কাজ।”
পুলিশের গাড়ির সংকটের কথা স্বীকার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা ঠিক পুলিশ পর্যাপ্ত গাড়ি নেই, আরো গাড়ি প্রয়োজন। তবে সরকার সব সময় কীভাবে আরো ভালো করা যায়, সেদিকে সচেষ্ট এবং সব সময় উন্নয়নের চেষ্টা করে যাচ্ছে।”
ধীরে ধীরে এই সংকট কেটে যাবে বলে মনে করেন মন্ত্রী।