Published : 20 Jan 2026, 01:39 PM
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী (পিয়ন) জাহাঙ্গীর আলমের নামে থাকা পৌনে দুই কোটি টাকার জমি-ফ্ল্যাট জব্দের আদেশ দিয়েছে আদালত। একইসঙ্গে তার স্ত্রী কামরুন নাহারের নামে সাত ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দুদকের পৃথক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার এ আদেশ দেন ঢাকার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. সাব্বির ফয়েজ।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী রিয়াজ হোসেন জানান, জাহাঙ্গীর আলমের নামে নোয়াখালীর সদর উপজেলা ও চাটখিলের এক কোটি ৩৩ লাখ ৭৪ হাজার ৭৪০ টাকার ৩৫ শতাংশ জমি জব্দের আদেশ দিয়েছে আদালত। এছাড়া মিরপুরে ১৩৮৫ বর্গফুটের ৪১ লাখ ৮২ হাজার টাকার একটি ফ্ল্যাটও জব্দ করতে বলা হয়েছে।
আর তার স্ত্রী কামরুন নাহারের যে সাত ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করতে বলা হয়েছে, সেসবে এক কোটি তিন লাখ ৫৩ হাজার ৩৬৯ টাকা রয়েছে বলে জানান বেঞ্চ সহকারী রিয়াজ।
দুদকের সহকারী পরিচালক পিয়াস পাল জমি ও ফ্ল্যাট জব্দ এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ চেয়ে আবেদন করেন।
জাহাঙ্গীর আলমের বিষয়ে করা আবেদনে বলা হয়, তার বিরুদ্ধে ১৮ কোটি ২৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তার ব্যক্তিগত ও মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ৬২৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকার সন্দেহজন লেনদেনের তথ্য পাওয়ায় মামলা করেছে দুদক। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে জাহাঙ্গীর আলমের নামে থাকা সম্পদ জব্দ করা দরকার।
কামরুন নাহারের বিষয়ে করা আবেদনে বলা হয়, তার বিরুদ্ধে ৬ কোটি ৮০ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তার ৭টি ব্যাংক হিসাবে সঞ্চয়ী ও ডিপিএস হিসাব খুলে সবমিলিয়ে ৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য মেলায় দুদক মামলা করেছে। সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তার এসব হিসাব অবরুদ্ধ করা দরকার।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে দুর্নীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নিজের পিয়নের ৪০০ কোটি টাকার মালিক হওয়ার তথ্য দেন।
শেখ হাসিনা তার বক্তব্যের একপর্যায়ে বলেন, “আমার বাসায় কাজ করেছে, পিয়ন ছিল সে, এখন ৪০০ কোটি টাকার মালিক। হেলিকপ্টার ছাড়া চলে না। বাস্তব কথা। কী করে বানাল এত টাকা? জানতে পেরেছি, পরেই ব্যবস্থা নিয়েছি।”
সাবেক সরকারপ্রধান সেই কর্মীর নাম না বললেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাহাঙ্গীরকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এরপর তার ব্যাংক হিসাব স্থগিতের নির্দেশ আসে।
জাহাঙ্গীর আলম শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে টানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু বিভিন্ন অভিযোগ ওঠায় তাকে ওই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
শেখ হাসিনা বিরোধী দলে থাকার সময়ও জাহাঙ্গীর আলম তার ‘ব্যক্তিগত স্টাফ’ হিসেবে কাজ করেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার জন্য যে খাবার পানি বাসা থেকে নেওয়া হত, তা বহন করতেন জাহাঙ্গীর। সে কারণে তিনি ‘পানি জাহাঙ্গীর’ নামে পরিচিতি পান।
জাহাঙ্গীরের বাড়ি নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার খিলপাড়া ইউনিয়নে। তিনি এর আগে চাটখিল উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরমও তুলেছিলেন।
দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন জাহাঙ্গীর। তবে পরে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী পরিচয় দিয়ে তদবির করে তিনি ‘কোটি কোটি টাকার’ মালিক হয়েছেন এবং নোয়াখালী ও ঢাকায় ঢাকায় বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর আসে।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জাহাঙ্গীরের বিষয়ে সতর্ক করে বলা হয়, তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কোনো সম্পর্ক নেই।
জুলাইয়ের তুমুল গণআন্দোলনের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের কথা জানায় দুদক।
মামলার আগে দুদক জাহাঙ্গীরের দুর্নীতির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে।
সেখানে বলা হয়, নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার খিলপাড়া ইউনিয়নের নাহারখিল গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম নিম্নবিত্ত পরিবারের। জাতীয় সংসদে দৈনিক মজুরিতে কাজ করতেন।
তিনি অর্থবিত্তের মালিক হতে শুরু করেন ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে।
প্রতিবেদনের ভাষ্য, সবশেষ দ্বাদশ সংসদে নোয়াখালী-১ (চাটখিল-সোনাইমুড়ী) আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন।
হলফনামায় তিনি নিজের নামে প্রায় ২১ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য দেন। আর স্ত্রী কামরুন নাহারের নামে ৭ কোটি ৩০ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য দেন।
গত বছরের ৩০ জানুয়ারি জাহাঙ্গীর আলম ও তার স্ত্রী কামরুন নাহারের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয় আদালত।
শেখ হাসিনার পিয়ন সেই জাহাঙ্গীরের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
শেখ হাসিনার সেই পিয়নের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
শেখ হাসিনার পিয়ন সেই জাহাঙ্গীরের অর্থপাচার অনুসন্ধানে সিআইডি