Published : 22 Apr 2026, 11:20 PM
বৈশাখের দ্বিতীয় সপ্তাহর শুরু থেকেই মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ চলছে দেশের দশ জেলার উপর দিয়ে। তীব্র গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা রাজধানীসহ সারাদেশে।
গরমে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শ্রমজীবী এবং নানা প্রয়োজনে রাস্তায় বের হওয়া সাধারণ মানুষ। একটু ছায়া ও স্বস্তির খোঁজে মানুষ ‘হাহাকার’ করলেও, আপাতত গরম কমার সুখবর নেই আবহাওয়া অধিদপ্তরের কাছে।
আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল রাজশাহীতে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
বুধবার দুপুরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেল গরমে তাদের দুর্ভোগ আর কষ্টের চিত্র।
রোদে পুড়ে ‘অঙ্গার’ হওয়ার দশা দেখা গেছে নির্মাণ শ্রমিক ও রিকশাচালকদের। তবু যেন জিরিয়ে নেওয়ার ফুরসত নেই। তীব্র তাপ উপেক্ষা করেই তাদের রাস্তায় নামতে হচ্ছে।
শান্তিবাগ এলাকায় কাজ করতে করতে ঘেমে ‘একাকার’ নির্মাণ শ্রমিক মোহাম্মদ হানিফ বললেন, “চামড়া তো পুইড়া তামা হয়া গেল! রোদের তাপে হাত-পা চলে না। কিন্তু কাম না করলে ভাত জুটবো না। এই গরম জীবনডাই শ্যাষ কইরা দিতাছে।”
একই অবস্থা রিকশাচালক জাহিদুলের। ঘামে ভেজা শরীরে তিনি বলেন, “যত রোদই থাকুক, প্যাডেল মারা থামাইলে তো পেট চলবো না। অসহ্য গরম লাগে, তাও রাস্তা ছাড়ার উপায় নাই। একটু যে জিরামু, ওই সুযোগও নাই।”

প্রচণ্ড রোদে গণপরিবহনও যেন হয়ে উঠেছে ‘গ্যাস চেম্বার’। যারা নিয়মিত বাসে যাতায়াত করেন, তাদের দুর্ভোগের সীমা নেই।
মৌচাক থেকে বাসে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী দিদার খান বলেন, “বাসের ভেতরটা একে তো মুড়ির টিন, তার ওপর এই গরমে সিটে বসে থাকা দায়। মনে হচ্ছে ওভেনের ভেতর ঢুকে আছি।”
সংবাদকর্মী মোস্তাফিজুর রহমান মগবাজার থেকে বাসে ওঠার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, “সারাদিন রোদে পুড়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে হয়, আবার বাসের ভেতরের অনেকগুলো ফ্যান অকেজো। দীর্ঘ জ্যামে যখন বাস আটকে থাকে, তখন ভেতরের ভ্যাপসা গরমে মনে হয় প্রাণটা এখনই বেরিয়ে যাবে। সাধারণ মানুষের এই দুর্ভোগ, না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।”
মালিবাগে মুদি দোকানি আইয়ুব চৌধুরীর বলেন, “দোকানের ভেতর কোনো ভেন্টিলেশন নাই। ফ্যান চললেও মনে হয় আগুনের হলকা দিতাছে। গরমে দমটা আটকায়ে আসে।”
একই স্থানে রাস্তায় কলা বিক্রি করা মোহাম্মদ অলি বলেন, “রোদের তাপে কলার রঙ জ্বইলা যাইতেছে। কাস্টমার দেইখা নিবার চায় না, মনে করে ভেজাল আছে।”
মাছ বিক্রেতা মো. শাহীন বললেন, “মাছ তো বরফে রাখলেও গরমে টিকে না। বরফ গইলা মাছের গা শুকায়ে যায়। তাজা মাছও এখন মরার মত দেখায়।”
গরমে শ্রমজীবীদের পাশাপাশি চরম কষ্টে আছে বৃদ্ধ ও শিশুরা। মহাখালী এলাকায় লোকাল বাস থেকে নামার পর কথা হয় খাদিজা আক্তার নামে এক মায়ের সঙ্গে। তার কোলে ৯ মাসের শিশু আনিকা।
খাদিজা বলেন, “এইটুকু বাচ্চা এত তাপ সইবে কীভাবে? বাচ্চাটা সারাক্ষণ ঘামছে আর কান্নাকাটি করছে। ওর কষ্ট দেখে আমার নিজেরও কলিজা ফেটে যায়।”
এদিকে তীব্র গরমে শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের একমাত্র স্বস্তির জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাস্তার পাশে বিক্রি করা বরফশীতল বিভিন্ন ধরনের শরবত ও আখের রস। রাস্তার পাশে খোলা অবস্থায় বিক্রি করা এসব শরবতে পানিবাহিত রোগের শঙ্কা থাকলেও দেদারসে তা বিক্রি চলছে।

মহাখালী রেলগেট এলাকায় বায়তুল মাহফুজ জামে মসজিদের সামনে আখের রস বিক্রেতা তাইফুর বলেন, গরমের কারণে তার বিক্রি বহুগুণ বেড়ে গেছে। মানুষজনকে রস দিয়ে কুলাতে পারছেন না।
গরমে বোতলের পানিরও বিক্রি বেড়েছে। এক ভ্রাম্যমাণ পানি বিক্রেতা বলেন, গরম যত বাড়তেছে, পানির চাহিদাও তত বাড়ছে। এখন ঠাণ্ডা পানি ছাড়া পাবলিকের চলেই না।
আবহাওয়া অফিস বলছে, বুধবার রাজশাহী জেলায় বয়ে যাচ্ছে ‘তীব্র তাপপ্রবাহ’। এছাড়া রাজশাহী বিভাগ, খুলনা বিভাগসহ ঢাকা, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, দিনাজপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষীপুর, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলার উপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে।
তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম হলে তাকে ‘মৃদু তাপপ্রবাহ’ ধরা হয়। ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রির কম তাপমাত্রাকে ‘মাঝারি’, ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রির কম তাপমাত্রাকে ‘তীব্র’ এবং ৪২ ডিগ্রির ওপরে উঠলে তাকে ‘অতি তীব্র’ তাপপ্রবাহ বলা হয়।
কবে নাগাদ বৃষ্টি হতে পারে? প্রশ্ন শুনে আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক বললেন, “এই তাপপ্রবাহ বৃহস্পতিবারও অব্যাহত থাকতে পারে। আপাতত ঢাকায় বৃষ্টির তেমন সম্ভাবনা নেই। তবে ২৬ তারিখের দিকে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।”
বুধবার সন্ধ্যার বুলেটিনে আবহাওয়া অফিস বলেছে, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টি হতে পারে।

দেশের অন্যত্র আকাশ অস্থায়ীভাবে মেঘলা এবং আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। সারাদেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সবাইকে সচেনতন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন শিশু, ষাটোর্ধ্ব বয়সী মানুষ, গর্ভবতী এবং যারা ক্যানসার, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভুগছেন।
“তাপপ্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী হলে রোগব্যাধির প্রকোপ বেড়ে যায়। বিশেষ করে খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষেরা চরম ঝুঁকিতে থাকেন।”
গরমে হিট স্ট্রোকসহ নানা ধরনের ঝুঁকি মোকাবেলায় এ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, “হাসপাতালগুলোকে আগে থেকে প্রস্তুত রাখতে হবে। রাস্তায় কেউ হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত বা অজ্ঞান হয়ে গেলে পথচারীরা কীভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দেবেন, সে বিষয়ে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে।”