Published : 11 Feb 2025, 07:29 PM
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া মামলার মধ্যে ৩/৪টির রায় চলতি বছরের অক্টোবরের মধ্যে পাওয়ার আশা করছেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়ার সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও তাদের ‘সহযোগী’ কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশের বিচার এ সময়ের মধ্যে শেষ হবে।
আইন উপদেষ্টা জানান, এই আদালতে ৩০০টির বেশি অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। প্রসিকিউশন টিম যাচাই বাছাই করে ১৬টি মামলা দায়ের করেছে। চারটি মামলার তদন্ত কাজ এই মাসেই শেষ হচ্ছে। অভিযোগ গঠন করার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ শুরু হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষশক্তির বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধগুলোর বিচারকাজে ধীরগতি নিয়ে চলমান সমালোচনার জবাব দিতে সচিবালয়ে নিজ মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন এই উপদেষ্টা।
আন্তর্জাতিক আপরাধ আদালতের বিচার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি আসিফ নজরুল আইন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারকাজ শুরু হওয়ার পর আসামি পক্ষকে তিন সপ্তাহ সময় দিতে হয় প্রস্তুতির জন্য। সে হিসেবে সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়াটা শুরু হবে ঈদের পর এপ্রিল মাস থেকে।
উপদেষ্টা বলেন, “এই আদালতে অব্যাহতভাবে শুনানি হয় বলে এসব মামলার রায় পরবর্তী চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে অর্থাৎ এপ্রিল থেকে শুরু করে পরবর্তী চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে প্রদান করা যাবে বলে আমরা আশা করি।
“এই হিসাবে অক্টোবরের মধ্যে ৩/৪টা মামালার রায় পেতে যাচ্ছি বলে আশা করি। চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম সাহেবের সঙ্গে কথা বলে আমার এমনটাই ধারণা হয়েছে। এসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ শীর্ষস্থানীয় নেতা ও কর্মকর্তা আসামি হিসাবে রয়েছেন।”
বিচারকাজে বিলম্ব হচ্ছে বলে প্রচলিত ধারণার জবাবে আইন উপদেষ্টা বলেন, “শেখ হাসিনা জামায়াত ও বিএনপির নেতাদের বিচারকাজগুলো সম্পন্ন করতে প্রতিটি মামলায় গড়ে আড়াই বছর সময় লাগিয়েছিলেন। সেখানে এই আদালতে তার অর্ধেকেরও কম সময় লাগছে।”
প্রসিকিউশন টিম দিনে রাতে প্রচুর কাজ করছে তুলে ধরে তিনি বলেন, “আগে যে বিচারকাজগুলো হয়েছিল, সেই ঘটনাগুলো ছিল অনেক আগের। আর এখন যে বিচার হচ্ছে এর এতো বেশি সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে যে এক বছরের মধ্যে প্রথম কয়েকটা রায় পাওয়া যাবে।”
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংগঠিত হত্যার ঘটনায় সাধারণ আদালতে করা মামলাগুলোর বিষয়ে আইন উপদেষ্টা বলেন, “সাধারণ ক্রিমিনাল কোর্টের যে মামলাগুলো হয়েছে সেগুলোর বিচার হয়তো একটু বিলম্ব হবে।”
ওই মামলায় যারা আসামি তাদের প্রত্যেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মামলায়ও রয়েছেন তুলে ধরে তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মামলায় যদি রায় পেয়ে যাই তাহলে সাধারণ কোর্টের মামলার রায় পেতে বিলম্ব হলেও আমাদের হতাশার কোনো কারণ নেই।”
সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট ও গায়েবি মামলা
বিগত সরকারের আমলে সাইবার নিরাপত্তা আইনে করা মামলাগুলো দ্রুত প্রত্যাহার করা হবে তুলে ধরে আইন উপদেষ্টা বলেন, সেই আইনের অধীনে মতপ্রকাশকে অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে যে মামলাগুলো করা হয়েছে প্রথমে সেগুলো প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
বিগত সরকারের আমলে এরকম ৩৯৬টি মামলা করা হয়েছিল তুলে ধরে আসিফ নজরুল বলেন, এসব মামলার মধ্যে আইন মন্ত্রণালয় সরকারি কৌঁসুলিদের মাধ্যমে ৩৩২টি প্রত্যাহার করেছে। ৬১টি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী তিন/চার কার্যদিবসের মধ্যে সেগুলো প্রত্যাহার হয়ে যাবে।
“তিনটি মামলা প্রত্যাহার করতে পারব না, কারণ এটা উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে স্থগিত রয়েছে। যাদের নামে মামলা তাদেরকে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে এই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করিয়ে আনতে হবে।”
১৬ হাজার গায়েবি মামলা প্রত্যাহার হচ্ছে
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিরোধী পক্ষকে দমন ও হয়রানির জন্য যেসব গায়েবি মামলা হয়েছিল সেগুলো ধাপে ধাপে প্রত্যাহার শুরু হচ্ছে, বলেছেন উপদেষ্টা। এক্ষেত্রে দেরির কারণও তুলে ধরেন তিনি।
আসিফ নজরুল বলেন, “পিপি (সরকারি কৌঁসুলি) নিয়োগ শেষ করে কাজ শুরু করেছি মাত্র দুইমাস আগে। এতো অল্প সময়ের মধ্যে হাজার হাজার লাখ লাখ মামলা আইডেনটিফাই করা খুবই কষ্টকর। ১৬ হাজার ৪২৯টি মামলা প্রত্যাহারের জন্য তালিকা করা হয়েছে। এক হাজার ২১৪টি মামলা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে প্রত্যাহার করা হবে।”
দেরির কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, “প্রতিটি মামলার রেকর্ড ঘেঁটে দেখতে হয় যে এটা জেনুইন না গায়েবি মামলা, নাকি কারচুপি করে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তির মামলা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তির মামলা আমি তো প্রত্যাহার করতে পারি না। ফলে প্রতিটা কেইস রেকর্ড দেখে দেখে কনফার্ম হতে হচ্ছে।”
মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে বলেছেন আইন উপদেষ্টা।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সহজ হচ্ছে
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি জটিলতা নিরসনে আইন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, “এতে জনভোগান্তি অনেকাংশেই কমে যাবে।
“এখন প্রবাসী ভাই-বোনদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট না থাকলে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদন করতে পারেন না। সংশোধিত বিধিমালার আলোকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট না থাকলেও, বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত ব্যক্তির পাসপোর্টে ‘নো ভিসা রিকোয়ার্ড’ লেখা থাকলে কিংবা তার জন্মসনদ থাকলে বা জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেই বিদেশ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদন করতে পারবেন।”
বিদ্যমান সমস্যার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এখন প্রবাসী কেউ যদি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিতে চান তাহলে তার পাসপোর্ট থাকতে হয়। বৈধ পাসপোর্ট। বিদেশে অনেকের পাসপোর্টের মেয়াদ থাকে না আবার প্রবাসীদের সন্তানদের অনেকেই বাংলাদেশি পাসপোর্ট গ্রহণ করেন না। তাদের পক্ষ থেকে পাওয়ার অ্যাটর্নি করার ক্ষেত্রে অনেক জটিলতা হয়।
“এ ব্যাপারে আমাদের কাছে অনেক অভিযোগ আসতে থাকে। আমরা কনসার্ন অথরিটিগুলোকে রাজি করিয়েছি। ইতোমধ্যেই আমরা বিধিমালার সংশোধনী এনেছি।”