Published : 24 Dec 2025, 03:04 PM
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠানের ঘোষিত তারিখ যাতে পেছানো না হয় সেই দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি।
বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কথা বলছিলেন দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
সকালে এনসিপির একটি প্রতিনিধি দল আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করে। এ সময় যুগ্ম সদস্য সচিব জহিরুল ইসলাম মূসা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “বুধবার দেশে একটা ইভেন্ট ঘটতে যাচ্ছে। ৩ তারিখে আরেকটি দল সমাবেশের ডাক দিয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় এদিকে হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিচার প্রক্রিয়া এখনও সম্পন্ন হয়নি।
“দেশের যে অস্থিতিশীল অবস্থা রয়েছে, ইসিকে বলেছি ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের ইলেকশনের যে ডেট ঘোষণা হয়েছে সে তারিখেই যেন ইলেকশনটা সম্পন্ন করতে পারি। এবং এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের কি পদক্ষেপ রয়েছে আমরা জানতে চেয়েছি।”
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ইসি তাদেরকে জানিয়েছে, তারা তিনবাহিনী প্রধানের সঙ্গে কথা বলেছে।
“তাদের সে সক্ষমতা রয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনটা আয়োজন করতে চাচ্ছেন।”
এনসিপির পক্ষ থেকে ইসিকে যা বলা হয়েছে সে বিষয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “আমরা বলেছি- এই ঘোষিত যে ডেট রয়েছে এর পরবর্তীতে যাতে না পেছায়। যাতে ইলেকশনটা যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হয়। কারণ, আওয়ামী লীগ বিভিন্ন ওয়েতে এবং ভারত বাংলাদেশ অস্থিতিশীল করে ইলেকশনটাকে পেছানোর চেষ্টা করছে। সেক্ষেত্রে ইলেকশন না পেছায়, যথাসময়ে ইলেকশন হয়। সে বিষয়ে আমর ইলেকশন কমিশনের কাছে জানতে চেয়েছি, তারা সে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা দিয়েছে।”
প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জটিলতা হচ্ছে, তা জানানো হয়েছে বলেও জানিয়েছেন এনসিপির এই নেতা। তিনি বলেন, গণভোটের প্রচারণা অপর্যাপ্ততার কথাও তুলে ধরা হয়েছে বৈঠকে।
বৈঠকের বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব জহিরুল ইসলাম মূসা বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সাথে বৈঠকে তাদের পাঁচটি বিষয় নিয়ে মোটামুটি আলোচনা হয়েছে।
তার মধ্যে নির্বাচনি ব্যবস্থা নিয়ে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রার্থী ও দলের আচরণবিধি প্রতিপালন, বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রতিকারের ব্যবস্থা, প্রবাসী ভোটারের রেজিস্ট্রেশন ও গণভোটসহ সামগ্রিকভাবে ভোটের পরিবেশ।
তফসিল ঘোষণার পরে আগাম প্রচার সামগ্রী সম্ভাব্য প্রার্থী, দল ও প্রশাসনের মাধ্যমে সরানোর উদ্যোগে সাধুবাদ জানিয়েছে দলটি।
মূসা বলেন, “তারপরও বিশেষ করে বড় রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা পোস্টারিং করেছিলেন, সেসবের সবগুলো তারা অপসারণ করেননি এবং অনেক জায়গায় নতুন করে পোস্টার লাগানো হয়েছে সেগুলো আমরা কমিশনের নজরে এনেছি। কমিশন এটি সিরিয়াসলি নিয়েছেন।”
জরিমানা, শাস্তির আওতায় আনার পাশাপাশি এ নিয়ে প্রচারের অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে মূসা বলেন।
এনসিপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা আচরণবিধি অনুসরণ করছে জানিয়ে মূসা বলেন, “অন্য সব দলের প্রতিও যেন একইভাবে আচরণবিধি প্রয়োগ করা হয়। কোনো দলই এখন নির্বাচনী প্রচারণার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অন্য কোনো অনুষ্ঠানের নাম দিয়ে, সামাজিক বা অন্য কোনো অনুষ্ঠান করে দলের প্রচারণা করতে যেন না পারে- সে বিষয়ে সজাগ থাকার জন্য বলা হয়েছে।”
আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আমলে এনে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার সুবিধার্থে হটলাইন বা অন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায় এনসিপি নেতারা।
সিইসির সঙ্গে বৈঠকে আরও যা আলোচনায় এসেছে
ভোটের তারিখ ঠিক রাখলেও মনোনয়নপত্র জমা থেকে তফসিলের বিভিন্ন তারিখের (মনোনয়ন জমা, বাছাই, প্রত্যাহারের সময় পুনর্বিবেচনার) বিষয়ে ইসির কাছে বিবেচনার অনুরোধ জানায় এনসিপি।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমার শেষ সময়, বাছাই হবে ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ হবে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “আমাদের ওনারা অনেকগুলো তারিখ দিয়েছে, ডেট দিয়েছে যে কবে আমরা মনোনয়ন আবেদন জমা দিব কবে তুলব তো সেই বিষয়গুলো ওনাদের রিথিকিং করা যায় কি না সেটা নিয়েও আমরা ওনাদেরকে ভাবনার জন্য আজকে অনুরোধ জানিয়েছি।”
হ্যাঁ ভোটের পক্ষে এনসিপি
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “আমরা ইতিমধ্যে দেখতে পেয়েছি একটি দলের পক্ষ থেকে 'না' ক্যাম্পেইনের কর্মসূচি চালু হয়েছে। আমরা ইসিকে বলেছি, আপনারা একটু খোঁজ নিবেন; যাতে বাংলাদেশ যাতে কোনভাবেই পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা যারা করছে তারা সে সুযোগটা না পায়।”
গণভোটে জনগণকে হ্যাঁ এর পক্ষে থাকার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, “আপনারা গণভোটে 'হ্যাঁ'-এর পক্ষে থাকবেন যাতে আমরা একটি সুন্দর বাংলাদেশ দেখতে পারি এবং সংস্কারটা বাস্তবায়ন করতে পারি।”
‘না’ ভোটের ক্যাম্পেইনের পক্ষের দলটির বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক কারো নাম নেন নি।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “যারা রুট লেভেলে আমাদের কাছে অনেক ডকুমেন্টস আসতেছে আমরা সেগুলো নিয়ে প্রেজেন্ট হব। আপনারা একটু খোঁজ নিবেন কারা করতেছে। আমরা সেই দলটার নাম না বললাম। কারণ আমরা বর্তমান যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি রয়েছে সম্প্রীতি এবং সংহতিতে সকল দল মিলে কাজ করতে চাচ্ছি।”
নাম বলে আক্রমণাত্মক বক্তব্যের শিকার হতে চায় না এনসিপি।
তিনি বলেন, “আমরা যদি একটি দলের সেই নামটা বলি, তারা হয়তো বিরূপ অথবা নিজেদের জায়গায় এটা গায়ে নিয়ে তারা আমাদের উপরে আক্রমণাত্মক বক্তব্য ছাড়বেন। সেজন্য আমরা আপনাদেরকেও রিকোয়েস্ট করব আপনারা একটু খোঁজ নেন কারা এটা করছে।”
ভোট নিয়ে উদ্বেগ, নিরাপত্তা জোরদারের আশ্বাস
নির্বাচন নিয়ে এনসিপির কোন সন্দেহ, উদ্বেগ রয়েছে কী না জানতে চান সাংবাদিকরা।
এর জবাবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “উদ্বেগ আছে আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা। একজন প্রার্থী অলরেডি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। আমাদের যারা প্রার্থী রয়েছেন আমরা তাদেরকে বলেছি যে আপনারা নির্বাচন কমিশনের যে বিধিমালাগুলো রয়েছে সেগুলো মেনে চলবেন এবং সাথে সাথে নির্বাচন কমিশনকেও বলেছি যে সকল দলের প্রার্থীদের যাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।”
নির্বাচন কমিশনের ব্যাপক নিরাপত্তা উদ্যোগ থাকলেও প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “এই যে নির্বাচন কমিশনের চারিদিকে কর্ডন তৈরি করা হয়েছে ক্যান্টনমেন্টের মতন; কিন্তু যারা প্রার্থী রয়েছে অন্যান্য জায়গায় রাজনৈতিক অফিসগুলো রয়েছে সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নাই। আমরা বলেছি আপনি যদি নিরাপত্তা না দিতে পারেন তাহলে আমরা ইলেকশনে এটা কিভাবে করব? সেক্ষেত্রে তারা আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছেন তারা নিরাপত্তার চাদর আরো বাড়াবেন।”
নিরাপত্তা জোরদারে তিন বাহিনী এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর মিটিংয়ের নির্দেশনার কথা ইসি তুলে ধরেছেন বলে জানিয়েছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
“উনারাও বলেছেন সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন, আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছেন যে উনারা নিরাপত্তা দিবেন এবং সবাইকে যাতে এ ধরনের হাদি ভাইয়ের মতো যাতে কোন হত্যাকাণ্ডের কেউ শিকার না হতে হয় সে বিষয়ে তারা যথেষ্ট পদক্ষেপ নিবেন।”
'সঠিক টাইমে নির্বাচন হতে হবে'
এক প্রশ্নের জবাবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “আপনারা দেখেছেন যে হাদি যে হত্যাকাণ্ডটা সেখানে আওয়ামী লীগের অনেক সংশ্লিষ্টতা যার নাম এসেছে। তারা চাচ্ছে যাতে এই ইলেকশনটা যদি পিছিয়ে দেওয়া যায়, বাংলাদেশ অস্থিতিশীল হয় তখন তারা বিশ্ববাসীকে দেখাবে যে বাংলাদেশ একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে রয়েছে। আমরা ওই সুযোগটা দিতে চাচ্ছি না। যাতে সঠিক টাইমে নির্বাচনটা হয়।”
তিনি জানান, এনসিপির প্রার্থীরা সবাই শাপলা কলিতে নির্বাচন করবে। এ দলের কেউ ধান অথবা অন্য প্রতীকে ইলেকশন করবে না।
“যদি কারো সাথে আসন সমঝোতা হয় অথবা আলোচনাও যদি হয় সেটাতে আমরা শাপলা কলিতেই ইলেকশন করব। ইলেক্টোরাল অ্যালায়েন্সের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জায়গায় কথা চলমান রয়েছে।”
দলগুলোকে নিজস্ব স্বকীয়তা কেউ বিকিয়ে না দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।
ইসির সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জানান, নির্বাচন কমিশনের কিছু ‘বিশৃঙ্খলা রয়েছে’।
তিনি বলেন, “যেমন আমরা বলেছিলাম এখানে ফ্যাসিজমের অনেক দোসর রয়েছে। সেই বিষয়গুলো আমাদের চলমান আছে। …অনেকগুলা বড় দল যারা গায়ের জোরে অনেকগুলা প্রোগ্রাম করছে; সেখানে তো উনারা গিয়ে ওই দলগুলোর প্রোগ্রাম স্টপ করায়ে দিতে পারবে না।”
ইসির যথেষ্ট 'সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান' এনসিপি
তিনি বলেন, “যার জন্যই তো হত্যাকাণ্ডটা হয়েছে নিরাপত্তা চাদর না থাকার কারণে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের উপরে আমরা এই বিষয়টা বারবার ওনাদের উপরে বলতে চাচ্ছি যাতে ১২ তারিখে উনারা ইলেকশন করতে অর্থাৎ ১২ তারিখে যদি ইলেকশন করতে হয় ফেব্রুয়ারির, তাহলে নির্বাচন কমিশনে আরও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এটা দ্বিপাক্ষিকভাবে একটা আলোচনাটা হতে হবে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলেরও সহযোগিতা প্রয়োজন, উনাদেরও সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন,। উনারা বলছে উনাদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।”
তিনবাহিনীর প্রতি আস্থা রেখে এনসিপিও আশ্বস্ত হয়েছে বলে জানান নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
তিনি বলেন, “সিকিউরিটির জায়গা থেকে যেহেতু তিন বাহিনী এসেছে, আমাদের দেশপ্রেমিক বাহিনীর উপরে আমরা আস্থা রাখতে চাচ্ছি। ওটা থেকে আমরা সিকিউরিটিটা নিয়ে কিছু আশ্বস্ত হয়েছি। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিভিন্ন জায়গায় আমাদের যারা প্রার্থী তারা মনোনয়ন ফরম তুলছেন সেখানে কিন্তু বিশৃঙ্খলা দেখতে পাচ্ছি আমরা। “
সক্ষমতার পরিচয় দিলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সুন্দরভাবে করা ‘সক্ষম হবে’ বলে মনে করেন তিনি।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “আশঙ্কা তো বাংলাদেশে রয়েছে। কিন্তু সেই আশঙ্কাটা মানিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে ইলেকশন কমিশনের কাছে বলেছি যাতে ফেব্রুয়ারি ১২ তারিখে আমরা ইলেকশনটা করতে সক্ষম হই। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন এমন কোন ছোট ভুল করে না থাকে যাতে এই ভুলের কারণেই ১২ তারিখ থেকে পিছিয়ে যায়। ফলে আমরা নির্বাচন কমিশনে অনেকগুলো আশঙ্কা আমরা দেখতে পেয়েছি। সেগুলো বিষয়ে আমরা ওনাদেরকে সতর্ক করেছি, অ্যালার্ট করেছি।”