Published : 21 Sep 2026, 01:21 AM
বাড্ডা গার্লস হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া সাইমা তাবাসসুমকে বিদ্যালয়ের গেট থেকে নিতে এসেছেন তার মা রিপা সুলতানা। বাসা কাছেই; দক্ষিণ বাড্ডায়, তাই কখনো মেয়েকে দিয়ে আসা বা নিয়ে আসার প্রয়োজন পড়েনি তার।
তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষিতে মানসিক অস্থিরতা থেকেই মেয়েকে নিতে আসার কথা তুলে ধরে রিপা বলেন, "আজ খুব চিন্তা হচ্ছিল, তাই নিতে এলাম, সকালে মেয়েটা রাগ হয়ে না খেয়ে চলে এল। চারপাশে এত এত অনিরাপত্তা, অনিশ্চয়তা, মেয়ে বড় হচ্ছে, রাস্তায় কী হলো, কার সঙ্গে কথা বলল, কিছু হলো না তো, এই দুশ্চিন্তাটা এখন সব সময় লেগেই থাকে।”
কুমিল্লায় স্কুলছাত্র অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় সন্তান লালন পালনের চিন্তাটা আরও বেড়ে গেল বলে মন্তব্য করেন তাবাসসুমের মা।
“একটা ফোনের জন্য ছোট ছেলেটাকে খুন করা হলো। এসব খবরে কলিজাটা কেঁপে ওঠে। তাই মেয়েকে নিতে এলাম।"
অপ্রতিমের মৃত্যুর খবর এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। শুক্রবার বিকালে মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে গিয়ে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় সে।
পরের দিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি ঝোপ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নিতেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর এ এস এম রহমতউল্লাহ ভূঁইয়া বলেছেন, একটি শিশুর বিকাশ শুধু পরিবারের একার দায়িত্ব নয়, একটি শিশু বেড়ে ওঠে সমগ্র সমাজের মধ্য দিয়ে। প্যারেন্টিংয়ের প্রশ্নটা কেবল ব্যক্তি পরিবারের সীমায় আটকে না রেখে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখা দরকার।
প্যারেন্টিং প্রসঙ্গে প্রশ্ন তোলার আগে ‘সংবেদনশীলতার’ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেছেন, যে মা সন্তান হারিয়েছেন, তাকে যদি বলি তার প্যারেন্টিং গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেটা কতটা সংবেদনশীল হবে, এটা আমার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। তবে এখানে শুধু ভিকটিমের দিকটাই নয়, যার দ্বারা ভিকটিম হয়েছে, তার প্যারেন্টিং নিয়ে কথা বলা যায়।"
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে অগাস্ট পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় মোট ২৫৪ শিশুর মৃত্যুর তথ্য আইন শালিশ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণে এসেছে।
আর পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হয়েছে।
এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হলেও ২ হাজার ৩৮ শিশু এখনও নিখোঁজ রয়েছে।
অভিভাবকের কথা
কুমিল্লায় অপ্রতিমের ঘটনার পর থেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অসংখ্য অভিভাবক। সন্তানের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা আর নজরদারির মধ্যে ভারসাম্য কোথায়, এই প্রশ্নে কথা হয়েছে আরও কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে।
দুই সন্তানকে নিয়েই একই রকম উদ্বেগে দিন কাটছে রাজধানীর মিরপুর-১২ নম্বরের বাসিন্দা ইশতিয়াক আহমেদের। তার দুই সন্তান রনি ও জনি পড়াশোনা করে মিরপুরের সাউথ পয়েন্ট স্কুলে।
বেসরকারি চাকরিজীবী এই বাবা বলেন, "কিছু দিন ধরে ফেইসবুক, সংবাদে শিশু হারানোর বিষয় দেখে আমরা খুবই চিন্তার মধ্যে আছি। কারণ আমি সকালে একজনকে স্কুলে দিয়ে অফিসে যাই। পরে ১১টার দিকে আমার স্ত্রী আরেকজনকে স্কুলে নিয়ে যায় এবং ১২টায় আগের জনের ছুটি হয়। তারপর দুজনকে একসঙ্গে করে বাসায় নিয়ে আসে।
"ফেইসবুকে বিভিন্ন ঘটনা দেখার পর আমরা স্বামী-স্ত্রী ঠিক করেছি, বাচ্চাদের একা কোথাও ছাড়া হবে না। প্রয়োজনে বাসায় রান্না বন্ধ থাকবে, কিন্তু তারা কোথাও একা যেতে পারবে না। আরেকটা বিষয় ভাবছি স্কুলের বাস বা গাড়ি আছে, এমন স্কুলে বাচ্চাদের শিফট করাবো।"
এনজিওকর্মী সাজ্জাদের ছেলে কলেজে পড়ছেন। সন্তানকে কতটা স্বাধীনতা দেওয়া উচিত, আর কতটা নজরদারিতে রাখা উচিত, সেই সীমারেখাটা নিজেও ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।
"ছেলেটা কলেজে যায়, বন্ধুবান্ধব আছে, একা একা বাইরে যায়, এটা তো স্বাভাবিক, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এটা মানতে হয়। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আমি কি আসলেই জানি ও কার সঙ্গে মেশে? ওর ফোনে কী চলে? আজকাল ছেলেমেয়েরা মোবাইল ছাড়া থাকতেই চায় না। আমরা ছোটবেলায় মাঠে খেলতাম, এখন ওরা স্ক্রিনে বড় হচ্ছে। কার সঙ্গে কথা বলছে, কী দেখছে, এটা তো পুরোপুরি ট্র্যাক করাও সম্ভব না।
"আবার কিছু না করলে মনে হচ্ছে, বিপদ ডেকে আনছি। এই ভারসাম্যটা কোথায়, সেটাই তো এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ,শুধু আমার একার না, মনে হয় এই শহরের প্রত্যেক অভিভাবকের।"
দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে সংসার অফিস সহকারী মোবারকের। মহাখালী এলাকার একটি অফিসে স্বল্প টাকার বেতনে চাকরি করেন জানিয়ে তিনি বলেন, “তবুও বউ-বাচ্চা যা চায়, তা পূরণ করার চেষ্টা করি। কিন্তু ইদানিং আমার ছেলে বায়না ধরে, বন্ধুদের কাছে দামি মোবাইল দেখে কিনে দিতে বলে। আমি চাই ছেলে মানুষ হোক, কিন্তু কিনে তো দিতে পারি না।”
সোশাল মিডিয়ায় ‘প্যারেন্টিং’ নিয়ে সমালোচনা
অপ্রতিমের ঘটনায় সোশাল মিডিয়ায় সব থেকে বেশি প্রশ্ন উঠছে এ সময়ের 'প্যারেন্টিং' বা অভিভাবকদের সন্তান লালন-পালনের ভূমিকা নিয়ে। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ ফেইসবুকে তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের যুগে সন্তানদের মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা ও পারিবারিক সচেতনতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন।
বায়েজিদ আহমেদ নামের একজন লিখেছেন, "১৩ বছরের অপ্রতিমের ফেইসবুক আইডি আছে, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকেও তার আইডি আছে। এছাড়া সে বাইক চালানোর অনেক ছবি তার ফেইসবুক ও টিকটকে দিয়েছিল। অপ্রতিমকে অসংখ্য ছবিতে দেখা যায়, সে যাদের সঙ্গে মিশতো, তারা তার চেয়ে বয়সে বেশ বড়। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের নিচে কেউ বাইক চালাতে পারে না। অর্থাৎ ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে হলে তার ১৮ বছর অবশ্যই হতে হবে।"
তিনি আরও লিখেছেন, "অপ্রতিমের সন্দেহভাজন খুনি তুহিনের বাসা থেকে অপ্রতিমের মায়ের আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে। তুহিনের মা বলেছেন, তার ছেলের বয়স ১৯ বছর, এবং সে স্কুল থেকে ড্রপ আউট, অর্থাৎ সে পড়াশোনা করত না! পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, খুনি তুহিন কুমিল্লায় বখাটে, মাদকাসক্ত ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হিসেবে পরিচিত।
"প্রশ্ন হল, আপনার সন্তান কার সঙ্গে ঘুরে? যার সঙ্গে ঘুরে, তার ব্যাকগ্রাউন্ড কী? সে কি মাদকাসক্ত? নাকি বখাটে? নাকি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য? সেই খোঁজ নেওয়া কিন্তু আপনার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।"
অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনার পর অভিভাবকদের আরও সতর্ক হওয়ার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন।
রোববার এক ফেইসবুক পোস্টে তিনি বলেন, "সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, তার বন্ধু সার্কেল কেমন, সেটার খোঁজখবর রাখা আমাদের প্রত্যেক বাবা-মায়ের দায়িত্বও বটে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকার একমাত্র সন্তান অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড সেটি আমাদের আরও স্মরণ করিয়ে দেয়।"
অন্তর মাশঊদ নামের একজন লিখেছেন, "অপ্রতিমের ঘটনায় 'সঠিক প্যারেন্টিং' এর প্রয়োজনীয়তা আবারও নতুন করে ভাবিয়ে তুলুক অভিভাবকদের।"
অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় পুলিশ এক তরুণ ও দুই কিশোরকে গ্রেপ্তার করেছে; যাদের সঙ্গে তার ‘অসম বয়সি বন্ধুত্ব’ ছিল বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান পুলিশ সুপার।
এই তথ্য সামনে আসার পর প্রশ্নটা আর শুধু অপ্রতিমের পরিবারকে ঘিরে থাকছে না। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কাদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, সেই খোঁজ রাখার দায়িত্ব যতটা ভিক্টিমের পরিবারের, ঠিক ততটাই অভিযুক্তদের পরিবারেরও।
একজন কিশোর বা তরুণ কীভাবে এত বড় সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ল, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে উঠে আসছে তাদের নিজেদের বেড়ে ওঠা, পারিবারিক তদারকি আর প্যারেন্টিংয়ের প্রসঙ্গও।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
শুধু আইনি বা অপরাধ তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ নয়, প্যারেন্টিংয়ের মনস্তাত্ত্বিক দিক নিয়েও কথা বলা জরুরি মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
প্যারেন্টিংয়ের মনস্তাত্ত্বিক দিকটা কেমন হওয়া উচিত, এ বিষয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাউফুন নাহারের সঙ্গে।
তিনি বলেন, "প্যারেন্টিং এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৩ বছর বয়সে শিশুদের মধ্যে বড়দের মতো চলাফেরার একটা তাগিদ তৈরি হয়, কিন্তু একই সময়ে তাদের ব্রেইন ডেভেলপমেন্ট তখনো পরিপূর্ণ হয় না। কোনো সিদ্ধান্ত হেলদি না আনহেলদি, সেই বিচার-বিবেচনার সক্ষমতা তৈরি হতে ১৮-১৯ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। অথচ এই বয়সেই শিশু বড়দের মতো স্বাধীন চলাফেরা করতে চায়। আর এখানেই বাবা-মার টিনএজ প্যারেন্টিং দক্ষতার প্রয়োজন হয়।"
রাউফুন নাহারের ভাষায়, প্যারেন্টিং একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। গর্ভাবস্থার যত্ন থেকে শুরু করে নবজাতক লালন-পালন, এরপর শিশুর নিজস্ব পরিচয় গড়ে ওঠার পর্যায় পেরিয়ে কৈশোরে পৌঁছায়।
"কিশোর বয়সে শিশুদের মধ্যে ‘পিয়ার প্রেশার’ কাজ করে, তারা তাদের গ্রুপের মতো হতে চায়। এই সময় অনেক বাবা-মা ভারসাম্য রাখতে পারেন না, ফলে শিশুর সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে যায়।"
সামাজিক প্রভাবের কথা তুলে ধরে রাউফুন নাহার বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ার সহজলভ্যতা একটি 'ম্যাস ম্যাডনেস' তৈরি করেছে, যেখানে অধিকাংশ মানুষ অবচেতনভাবেই ফেইসবুক-টিকটকে সময় দিচ্ছে, এটা শুধু কোনো একজন কিশোরের একক সমস্যা নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রবণতা।
তিনি বলেন, "বাবা-মা নিজেরা সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত থেকে সন্তানকে মোবাইল থেকে দূরে থাকতে বললে সন্তান স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে।"
দায় ও দায়িত্বের প্রশ্নে তিনি অ্যাটাচমেন্ট থিওরির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, মা-বাবা-সন্তানের বন্ধন কয়েক ধরনের হতে পারে। যেমন নিরাপদ বন্ধন, যেখানে সন্তানকে পরিবেশ অন্বেষণের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি নজরেও রাখা হয়। হেলিকপ্টার প্যারেন্টিংয়ের মতো ওভারপ্রোটেক্টিভ বন্ধন; সম্পূর্ণ উদাসীন বন্ধন এবং পারিবারিক সহিংসতা-ট্রমাজনিত ডিসঅর্গানাইজড বন্ধন রয়েছে।
তিনি বলেন, "অনিরাপদ বন্ধন সাধারণত তখনই তৈরি হয়, যখন বাবা-মা নিজেরাই মানসিক অস্থিরতা, টেনশন বা ট্রমার মধ্য দিয়ে যান। প্যারেন্টিংয়ে ভুল হতেই পারে, পারফেক্ট প্যারেন্টিং বলে কিছু নেই। মূল প্রশ্ন হলো, আমি সন্তান বড় করার জন্য মানসিকভাবে সক্ষম কিনা এবং আমার সেই দক্ষতা আছে কিনা।"
অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ চাইলে তিনি বলেন, "দুটো দিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, নিজে মানসিকভাবে স্থিতিশীল কিনা তা খেয়াল রাখা এবং সেই বিবেচনায় প্যারেন্টিংয়ের দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া। দ্বিতীয়ত, সন্তান পালনের জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করে ধৈর্য নিয়ে তা চর্চা করা।"
কুমিল্লার এই হত্যাকাণ্ড কি কি কোনো ঘটনা, নাকি একটা বৃহত্তর প্রবণতার অংশ; কিংবা বাংলাদেশে কিশোর অপরাধ পরিস্থিতিতে পরিবারের ভূমিকার চিত্র কেমন হওয়া উচিত, সেসব বিষয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনের সঙ্গে।
তিনি বলেন, "অপ্রতিম ১৩ বছরের বালক। সে কার সঙ্গে মিশছে, সেটা তার মা-বাবার জানা উচিত ছিল। যাদের সঙ্গে মিশত, তারা যদি সুস্থ, ভারসাম্যপূর্ণ পরিবারের সন্তান না হয়ে মাদক বা অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকে, তাহলে সেই ছেলের হয় নিজের বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, নাহলে ভিকটিম হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এখানে আমরা দেখলাম, সে ভিকটিম হয়েছে।"
বয়ঃসন্ধিকালীন মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই বয়সে হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে শিশুদের মনোযোগ ঘরের বাইরে চলে যায়, তারা সহজেই ফ্যান্টাসি বা হিরোইজমের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং নতুন বন্ধু-পরিবেশে জড়িয়ে পড়ে। এই সময়ে অভিভাবকদের সন্তানের 'সঙ্গীদের পরিবার-পটভূমি' সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
ঘটনার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে তিনি তুলে ধরেন ভোগবাদ ও পুঁজিবাদের প্রভাব।
তার ভাষায়, "সমাজে এখন কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করা হচ্ছে, যা আসলে মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন নয়। আইফোনের মত জিনিসকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই লোভ ও আকাঙ্ক্ষাই অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের জন্ম দেয়।"
কিশোর অপরাধ (জুভেনাইল ডেলিংকুয়েন্সি) প্রতিরোধে করণীয় নিয়ে তিনি বলেন, এটি প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং সবশেষে আইন-প্রশাসন সবাইকে একসঙ্গে সক্রিয় হতে হবে।
তার ভাষায়, "পরিবার যদি না পারে, তাহলে কমিউনিটি ক্লিনিকে সাইকিয়াট্রিস্ট কাউন্সেলিং করতে পারেন। সমাজসেবা অধিদপ্তরে প্রবেশন অফিসারও আছেন, তবে সেই ব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট সক্রিয় নয়। তবে এতে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পরিবারের, অভিযুক্ত কিশোরের পরিবার যদি তাকে সঠিক পথে আনতে পারত, তাহলে হয়ত এ ঘটনা ঘটত না।"
আসকের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান বলেন, "নিখোঁজ হওয়ার পর কোনো শিশুর মরদেহ উদ্ধার হলে ঘটনাটিকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিশুটি কীভাবে নিখোঁজ হলো, তাকে উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, কোনো অবহেলা বা সমন্বয়হীনতা ছিল কিনা এবং অপরাধের সঙ্গে কারা জড়িত, এসব বিষয় নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের আওতায় আনতে হবে।"
‘শিশুর নিরাপত্তা শুধু পরিবার দেবে না, সমাজ দেবে, রাষ্ট্র দেবে’
শুধু তদন্ত বা জবাবদিহিতা নয়, দীর্ঘমেয়াদে শিশু সুরক্ষায় সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত ভূমিকার কথা বলেছেন সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর এ এস এম রহমতউল্লাহ ভূঁইয়া।
তিনি বলেন, “একটি শিশুর বিকাশ শুধু পরিবারের একার দায়িত্ব নয়, একটি শিশু বেড়ে ওঠে সমগ্র সমাজের মধ্য দিয়ে। এ ধরনের নৃশংস পরিস্থিতির শিকার শিশুদের বিষয়ে সব মহলকে খতিয়ে দেখার আহ্বান জানাচ্ছি। শিশুর নিরাপত্তা শুধু পরিবার দেবে না, সমাজ দেবে, রাষ্ট্র দেবে। সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।"
প্যারেন্টিং প্রসঙ্গে প্রশ্ন তোলার আগে ‘সংবেদনশীলতার’ কথা তুলে ধরেন তিনি।
তার ভাষায়, "যে মা সন্তান হারিয়েছেন, তাকে যদি বলি তার প্যারেন্টিং গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেটা কতটা সংবেদনশীল হবে, এটা আমার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। তবে এখানে শুধু ভিকটিমের দিকটাই নয়, যার দ্বারা ভিকটিম হয়েছে, সেও কিন্তু একজন শিশু। এই বিবেচনায় প্যারেন্টিং নিয়ে কথা বলা যায়।"
তিনি বলেন, প্যারেন্টিংয়ের প্রশ্নটা কেবল ব্যক্তি পরিবারের সীমায় আটকে না রেখে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখা দরকার।
"আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে শুধু প্যারেন্টিং নয়, সামাজিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও একটা অবক্ষয় ঘটেছে, এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।"
শিক্ষাব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, "গত কয়েক বছরে স্কুলে সময় কমানো হয়েছে, খেলাধুলা ও বিকাশমূলক কর্মকাণ্ডে শিশুদের সময় কমে গেছে। পাশাপাশি মা-বাবাদের ব্যস্ততাও বেড়েছে। শিশু মাঠে থাকবে, ক্লাসরুমে থাকবে, পরিবারে থাকবে, এটাই মূল জায়গা। কিন্তু এখন শিশুরা বেশি সময় কাটাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়, যা নিয়ে আমাদের ভাবার দরকার আছে।"
অনলাইন নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, "সোশ্যাল মিডিয়াকে আমরা এই যুগে অস্বীকার করতে পারব না, তবে অনলাইন সেফটি বিষয়ে বাবা-মা ও শিশুদের সচেতন করে তোলা জরুরি। শিশুকে স্কুল, খেলাধুলা, বই পড়া ও গল্প বলার অভ্যাসে ফিরিয়ে আনাটাই আমার কাছে প্যারেন্টিংয়ের একটা রূপ।"