Published : 21 Aug 2023, 03:27 PM
রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার একটি ভবন থেকে পড়ে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া এক তরুণীর মৃত্যুর পর পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন তার বাবা।
তার অভিযোগ, তার মেয়ে একটি অপরাধের শিকার হয়েছিলেন। থানায় মামলা করার পর তদন্ত কর্মকর্তার ‘উৎপাতে’ সে আত্মহত্যা করেছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে পল্লবী থানা পুলিশ বলছে, মেয়েটি ‘দুর্ঘটনাবশত’ ছাদ থেকে পড়ে মারা গেছে।
আফরোজা আক্তার মিমি নামের ২১ বছরের ওই তরুণী মিরপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা প্রকৌশলে পড়ছিলেন।
তার বাবা আফসারউদ্দীন বলেন, তার মেয়ে এক ব্যক্তির প্রতারণার শিকার হয়ে গর্ভপাতে বাধ্য হন। এরপর পল্লবী থানায় ধর্ষণ ও ভ্রুণ হত্যার অভিযোগে মামলা করেন তারা।
“সেই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিভিন্ন সময় ফোন করে টাকা চাইত। আমার মেয়েকে ফোন করে তার সঙ্গে অন্য পুরুষদের জড়িয়ে চার্জশিট দেওয়ার ভয় দেখাত। এসব কারণেই মেয়েটা গত রোববার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করছে।”
তবে মিমি আত্মহত্যা করেছেন– এ কথা মানতে রাজি নয় পুলিশ।
পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মেজবাহউদ্দীন বলেন, “মেয়েটি ছাদ থেকে দুর্ঘটনাবশত পড়ে মারা যেতে পারে। তখন সেখানে ১৩-১৪ বছরের একটি মেয়ে ছিল, যে অন্য বাসার গৃহকর্মী। এছাড়া সিসি ক্যামেরাতেও বিষয়টি ধরা পড়েছে।”
সোমবার সকালে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে মিমির বাবা মো. আফসারউদ্দীনের সঙ্গে কথা হয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
তিনি বলেন, “আমরা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করতে চাই। কিন্তু পুলিশ চাপ দিচ্ছে অপমৃত্যু মামলা করার জন্য। গতকাল দুপুরে মারা গেছে আমার মেয়ে, এখনো মর্গে সুরতহালের কাগজ পাঠায়নি পুলিশ। সে কারণে লাশের ময়নাতদন্ত হচ্ছে না। আমরা দাফনও করার জন্য নিয়ে যেতেও পারছি না।”
বাবার অভিযোগ
ব্যবসায়ী আফসারউদ্দীন জানান, গত বছর মেহেদি হাসান জনি নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তার মেয়ের পরিচয় হয়।
“জনি ‘নায়িকা’ বানানোর লোভ দেখিয়ে ওর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। এক পর্যায়ে ডিওএইচএস এলাকাতেই ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকতে শুরু করে।”
আফসারউদ্দীন বলছেন, মিমি ও জনির বিয়ে হয়নি, কেবল এফিডেফিট করেছিলেন তারা। চলতি বছর তার মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা হলে জনি তাকে ‘গর্ভপাত ঘটাতে বাধ্য করেন’।
এরপর মিমি অসুস্থ হয়ে পড়লে গত মে মাসে তাকে বাসায় নিয়ে যান আফসারউদ্দীন। পল্লবী থানায় ধর্ষণ ও ভ্রুণ হত্যার অভিযোগে মামলা করেন তিনি।
আফসারউদ্দীন বলেন, মামলা করার পর পুলিশ জনিকে গ্রেপ্তার করে। ১৭-১৮ দিন পর জামিনে বের হয়ে জনি আবারও ‘উৎপাত’ শুরু করে।
“এরমধ্যেই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই মোবারক আলী টাকা চাওয়া শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ৫০ হাজার টাকা দিতে রাজি হই আমরা। তিন কিস্তিতে ৩২ হাজার টাকা পরিশোধও করি। তবুও এসআই মোবারক বিভিন্ন সময় আমার মেয়েকে ফোন করে টাকা না দিলে খারাপ রিপোর্ট দেওয়ার হুমকি দিত।”
এই বাবার অভিযোগ, তার মেয়েকে ফোন করে তার সঙ্গে ‘আরও অনেক পুরুষের সম্পর্ক রয়েছে’ বলে চার্জশিট দেওয়ার হুমকি দিতেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা।
“পুলিশের এই উৎপাতেই আমার মেয়েটা আত্মহত্যা করছে, ছাদে উঠে লাফ দিছে। এখন আমি আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলা করতে চাই। কিন্তু দেখেন কালকে দুপুরে ও মারা গেছে, আজকে পর্যন্ত পুলিশ লাশের সুরতহাল রিপোর্টটা দিচ্ছে না।”
আফসারউদ্দীন বলেন, “মেয়ে যখন মানসিকভাবে অনেক অসুস্থ হয়ে পড়ল, তখন আমি ওকে মেন্টাল হাসপাতালে রেখে আসলাম। মামলার সাক্ষী দিতে হবে, এটা-সেটা বলে পুলিশই আবার ডেকে আনালো। এরপর আমরা আর ওকে ট্রিটমেন্টে দিতে পারিনি। মেয়েটা আমার শেষ পর্যন্ত মরেই গেল।”
পুলিশের ভাষ্য
আফসারউদ্দীনের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই মোবারক আলী টেলিফোনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ভাই শোনেন, আমার টার্গেট হচ্ছে মামলা ডিটেক্ট করা। উনি এখন বিপদে আছেন তো, অনেক কিছুই বলছেন। আমি এ বিষয়ে আর কিছু বলতে চাই না। সাক্ষাতে কথা হবে।”
যোগাযোগ করা হলে পল্লবী জোনের সহকারী কমিশনার শাহীদুল ইসলাম বলেন, “মেয়েটি একটি ঘটনার শিকার। সেই মামলার তদন্ত চলছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন না আসার কারণে তদন্ত কাজে সমাপ্তি টানা যাচ্ছে না।”
তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বাদীর পরিবারকে টাকার জন্য চাপ এবং মিথ্যা অভিযোগপত্র দেওয়ার হুমকির অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে শাহীদুল ইসলাম বলেন, “তদন্তকারী কর্মকর্তার বিষয়ে কোনো অভিযোগ এলে আমরা কর্মকর্তা বদলে দিই। আপনার কাছে এখন যে কথা শুনছি, বাদীর পরিবারের কেউ আমাকে বা আমার ডিসি স্যারকে একবার জানালে আমরা অন্য কাউকে তদন্ত করতে বলতাম।
“তারা কেউ লিখিত বা মৌখিকভাবে জানালেও চলত। তবে অভিযোগ যখন উঠেছে, তখন নিশ্চই তা খতিয়ে দেখা হবে। যথাযথ তথ্য-প্রমাণ পেলে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য পুলিশের জনসংযোগ বিভাগ এবং মিরপুর বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন শাহীদুল।
অভিযোগগুলো জানিয়ে পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ কমিশনার জসীমউদ্দীন মোল্লার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, “এরকম বিষয় তো আমি শুনিনি। বিষয়টা জটিল। আমাকে জেনে জানাতে হবে।”
পুরনো খবর
পুলিশের অভিযানের মধ্যে তরুণীর আত্মহত্যার ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা