Published : 15 Jul 2025, 01:39 AM
বই পেতে বিলম্ব, দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতায় পড়াশোনার ক্ষতি তো আছেই; আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই পাবলিক পরীক্ষা কেন্দ্র হয়ে থাকলে সেই ক্ষতি হচ্ছে আরও দীর্ঘায়িত।
দেশের কয়েক হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই ক্ষতি সাধারণ প্রবণতা হয়ে দাঁড়ালেও তা উতরানোর কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই।
গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত এবারের এসএসসি পরীক্ষায় কেন্দ্র ছিল ৩,৭০৬টি। আর চলমান এইচএসসি পরীক্ষা হচ্ছে ২ হাজার ৭৯৭টি কেন্দ্রে। স্কুল-কলেজকে কেন্দ্র বানিয়ে এসব পাবলিক পরীক্ষা যখন চলে, একই সময়ে বাকি স্কুল-কলেজে চলে স্বাভাবিক পাঠদান।
ফলে এই দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফারাক তৈরি হচ্ছে। কেন্দ্র হওয়া প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট-কোচিং নির্ভরতা অনেক বেশি।
রাজধানীর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিদিমা তাবাসসুম সারিকা। তার মা সালমা আক্তার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার মেয়ের স্কুলে পরীক্ষার চলেছে। ফলে পরীক্ষার দিন ওদের সংক্ষিপ্তভাবে ক্লাস নেওয়া হয়েছে। অন্যান্য দিনে ক্লাস চলেছে পুরো। অন্যদিকে যেসব স্কুলে পরীক্ষার সিট পড়েনি, সেসব স্কুল পুরোদমে ক্লাস চলছে।
“চলতি বছর বই পেতে অনেকটাই দেরি হয়েছে, ফলে বাচ্চারা বেশিরভাগই পিছিয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে এসএসসি পরীক্ষার সময় যেসব বাচ্চাদের অর্ধেক ক্লাস চলছে তারা পিছিয়ে পড়ছে, যাদের পুরোদমে ক্লাস চলছে তাদের থেকে।”

বিপরীত চিত্র দেখা গেছে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস হাই স্কুলে, সেখানে এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। এ স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী রোজা ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীর আইনুনের ক্লাস চলেছে পুরোদমে।
এ দুই শিক্ষার্থীর মা তাহমিনা আক্তার রিজু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সিদ্ধেশ্বরী গার্লস হাই স্কুলে এসএসসি পরীক্ষা হয়নি। ফলে ক্লাস চলছে। কিন্তু বই পেতে তিন মাস দেরি হয়েছে। তাই সিলেবাস শেষ করতে বাচ্চারা হিমশিম খাচ্ছে। বইটা একটু আগে পেলে ভালো হত।”
শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলগুলোতে ১৮৫ দিন এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে কলেজগুলোতে ১৯০ দিন ক্লাস হওয়ার কথা। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানকে এইচএসসি ও এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র বানানো হয়েছে, সেই সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য ক্লাসের সুযোগ আরও কম।
এবার বছরের শুরুতে বই পেতে দেরি হয়েছে স্কুলের শিক্ষার্থীদের। এরপর রোজা, দুই ঈদের ছুটি ছিল সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই। এর মধ্যে দায়সারা প্রস্তুতি নিয়ে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী অর্ধ বার্ষিক পরীক্ষায় বসে ২৪ জুন থেকে।
আর চলতি বছর যে শিক্ষার্থীরা একাদশ শ্রেণিতে পড়ছেন, তাদের বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হয় ২৬ জুন থেকে। একইদিন শুরু হয় এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা, তত্ত্বীয় পরীক্ষা চলবে ১০ অগাস্ট পর্যন্ত। ফলে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহৃত কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষে মধ্য জুলাই থেকে মধ্য অগাস্ট পর্যন্ত ক্লাস ব্যাহত হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) বলছে, শিক্ষাবর্ষজুড়ে সব শিক্ষার্থীর ক্লাস নিশ্চিত করতে তারা স্বতন্ত্র পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করেছে।
অভিভাবকদের সংগঠন অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল হক দুলু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পরীক্ষার বন্ধের দিনগুলো ক্লাস পরীক্ষার পর সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে নিতে সরকার স্কুলগুলোকে আদেশ দিতে পারে। এতে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি তেমন হবে না।”

পরীক্ষার ফাঁকে ক্লাস চালানোর নির্দেশনা মানছে না সবাই
দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাড়ে ২৯ হাজারের কিছু বেশি। এর মধ্যে সরকারি স্কুলের সংখ্যা ৬৮৪টি। এমপিওভুক্ত স্কুল আছে সাড়ে ১৭ হাজারের বেশি। নয় হাজারের বেশি মাদ্রাসা এবং ২,২২২টি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় যে ৩৭০৬টি কেন্দ্র ছিল, তার প্রতিটির অধীনে ছিল তিন থেকে পাঁচটি স্কুল।
কোন স্কুলে পরীক্ষা কেন্দ্র ছিল এবং কোনগুলোতে ছিল না, সে তথ্য জানা নেই বলে জানান আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কমিটির আহ্বায়ক এবং ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার। তার ভাষ্য, “পরীক্ষা কমিটি ভেন্যু কেন্দ্র ঠিক করে।”
চলমান এইচএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পোষাবে কী করে- এমন প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষা বোর্ডগুলোর মোর্চা আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক খন্দোকার এহসানুল কবির বলেন, “যেসব দিনে পরীক্ষা থাকবে- ওই দিনগুলোতে কেন্দ্র কলেজগুলোর ক্লাস বন্ধ রাখতে হবে; তবে যে দিনগুলোতে পরীক্ষা নেই ওই দিনগুলোতে কেন্দ্র কলেজগুলো নিয়মিত ক্লাস নিতে পারবে।”
এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রগুলোকে পরীক্ষার দিন ছাড়া অন্যান্য দিনে ক্লাস চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
অধ্যাপক খন্দোকার এহসানুল কবির বলেন, “এসএসসি পরীক্ষা হয় ১৫ কার্যদিবস। পরীক্ষার দিনগুলো ছাড়া মাঝখানের দিনগুলোতে যেন ক্লাস চালানো হয়, সে বিষয়ে সবগুলো কেন্দ্রকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেভাবেই স্কুলগুলো ক্লাস নিয়েছে।”
তবে কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত সব স্কুল এসএসসি পরীক্ষার ফাঁকে ফাঁকে ক্লাস চালাতে পারেনি।
ধানমন্ডি কামরুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষার পুরো সময় ক্লাস বন্ধ ছিল।
ওই স্কুলের সহকারী শিক্ষক মাসুমা খানম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের এখানে তো পরীক্ষার সেন্টার, ক্লাস হবে কী করে?”
নওগাঁর মান্দা এস সি মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে পরীক্ষার দিনগুলোতে ক্লাস বন্ধ থাকলেও অন্যদিনে পাঠদান হয়েছে।
স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পরীক্ষা যে দিনগুলোতে নেই, সে দিনগুলোতে ক্লাস চালিয়েছি। প্রথমে পরীক্ষার দিনগুলোতে দুপুর ২টার পর ক্লাস চলানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাচ্চারা দুপুরে ক্লাস করতে অসুবিধা বোধ করছিল।
“তাই আগের পরিকল্পনা থেকে সরে এসে যে দিনগুলোতে এসএসসি পরীক্ষা নেই, ওই দিনগুলোতে স্কুলের শিক্ষার্থীদের ক্লাস আমরা চালিয়েছি।”
রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে এসএসসি পরীক্ষার দিনগুলোতে অর্ধেক ক্লাস নেওয়া হয়েছে। আর যেসব দিনে পরীক্ষা নেই, সেসব দিনে পুরো ক্লাস চলেছে।
সিদ্ধেশ্বরী গার্লস হাই স্কুলে এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র ছিল না। ফলে পরীক্ষার পুরো সময়জুড়ে এ স্কুলে ক্লাস চলেছে।

স্বতন্ত্র পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ
পুরো শিক্ষাবর্ষজুড়ে সব শিক্ষার্থীর ক্লাস নিশ্চিত করতে স্বতন্ত্র পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনে সম্প্রতি সুপারিশ করছে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)।
অধিদপ্তরের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিভিন্ন সময় আমরা ও আমাদের পরিদর্শকরা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করতে গিয়ে দেখি, পরীক্ষার জন্য ঠিকভাবে ক্লাস হচ্ছে না। কোথাও পরীক্ষা চলছে, কোথাও ক্লাস হচ্ছে। এতে উপস্থিতি পাওয়া যায় না ঠিকভাবে।
“তাই স্বতন্ত্র পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। যদিও এটা সরকারি সিদ্ধান্তের বিষয়। কারণ পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের একটা ব্যয় আছে।”
তিনি বলেন, “আমরা প্রাথমিকভাবে সব জেলার সদর উপজেলায় স্বতন্ত্র পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করেছি। পর্যায়ক্রমে সব উপজেলাতে এ কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। আমাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, ৩ হাজার শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে- এমন কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।
“যে কেন্দ্রগুলোতে এসএসসি, এইচএসসি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষা, বিসিএসসহ জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার আয়োজন করা যাবে। ফলে শিক্ষার্থীদের ক্লাস ব্যাহত হবে না।”
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর খালি জমিতে বা সরকারি জমিতে এ কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে বলে সুপারিশে বলা হয়েছে।
এদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ৬৪ জেলায় স্বতন্ত্র পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। গত ২৪ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের ২৬৮তম সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বলছে, স্বতন্ত্র পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষা এবং পিএসসিসহ অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হবে।
“পরীক্ষা চলাকালীন দীর্ঘ সময় ক্লাস বন্ধ থাকে এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটে। স্বতন্ত্র পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করা হলে সেশনজট কমে আসবে। স্বতন্ত্র পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সার্বিক সহায়তা পাওয়া যাবে।”

স্বতন্ত্র পরীক্ষা কেন্দ্র কি হবে?
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ করে থাকে।
অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী আলতাফ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “৩ হাজার পরীক্ষার্থী একসঙ্গে পরীক্ষা দিতে পারবে, এমন কেন্দ্র স্থাপনে জমি ছাড়াই ৫ কোটি টাকা খরচ হবে।”
এ হিসাবে ৪৯৫টি উপজেলায় স্বতন্ত্র পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনে খরচ হবে ৩ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা।
স্বতন্ত্র পরীক্ষা কেন্দ্র নির্মাণের সুপারিশ শিক্ষা মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করবে কি না তা নিয়ে কর্মকর্তারা কথা বলতে চাননি। তাদের ভাষ্য, ব্যয়বহুল এ উদ্যোগের বিষয়ে কেবল শিক্ষা উপদেষ্টাই ভালো বলতে পারবেন।
শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরারের বক্তব্য জানতে একাধিক দিন যোগাযোগ করেও তার সাড়া মেলেনি।