Published : 16 Feb 2026, 12:57 AM
দীর্ঘদিনের রীতি ভেঙে এবার নতুন সরকারের শপথ বঙ্গভবনের বাইরে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার।
মঙ্গলবার বিকালে সেখানে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেবে।
মন্ত্রিসভার আগে এদিন সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ নেবেন নতুন সংসদ সদস্যরাও।
নতুন সরকারকে সাধারণত রাষ্ট্রপতি শপথবাক্য পাঠ করান এবং স্বাধীনতার পর থেকে তা বঙ্গভবনেই হয়ে আসছে। এবার স্থান বদলের মাধ্যমে সেই রীতি ভাঙতে যাচ্ছে।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ নেয় মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায়। সেই সরকারকে অস্থায়ী সরকারও বলা হয়। এরপর স্বাধীনতা যুদ্ধে জয়লাভের পর ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি শপথ নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম সরকার।
প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সেদিন শপথ নেন মন্ত্রিসভার আরও ১১ সদস্য। ঐতিহাসিক সেই শপথ হয় বঙ্গভবনে; শপথ পড়ান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।
রাজনীতিক ও সংসদ বিষয়ক বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈদ্যনাথতলার পর আর কোনো সরকারের শপথ অনুষ্ঠান বঙ্গভবনের বাইরে হওয়ার তথ্য তাদের জানা নেই।
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারও বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ নিয়েছিল।
শুক্রবার রাতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ২৯৯ আসনের মধ্যে ২৯৭টিতে জয়ীদের গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। বিএনপি ও মিত্র দলগুলো ২১২টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।
অন্যদিকে তাদের এক সময়কার মিত্র জামায়াতে ইসলামী ৬৮ আসন পেয়ে বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে। অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বাকি আসনগুলোতে জয়ী হয়েছেন।
সংবিধান অনুযায়ী, গেজেট প্রকাশের পরের তিন দিনের মধ্যে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিধান রয়েছে। যদি নির্ধারিত সময়ে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার কোনো কারণে অনুপস্থিত থাকেন,তাহলে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান।
আর নির্বাচিত হওয়ার তিন দিনের মধ্যে কেউ শপথ না পড়ালে সেক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা প্রধান বিচারপতি শপথ পড়াতে পারবেন।
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। তিনি মামলার আসামি হয়ে বর্তমানে প্রকাশ্যে নেই।
তার সঙ্গে ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব নেন শামসুল হক টুকু। তিনি মামলার আসামি হয়ে এখন কারাগারে। ফলে নতুন সংসদ সদস্যদের কে শপথ পড়াবেন, তা নিয়ে এক ধরনের জটিলতা তৈরি হয়।

রীতি অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের শপথের পর সংসদীয় দলের বৈঠকে নেতা নির্বাচন করা হয়। এরপর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নির্বাচিত নেতা রাষ্ট্রপতির কাছে দাবি উপস্থাপন করলে তাকে সরকার গঠনে আমন্ত্রণ জানানো হয়ে থাকে। এরপর নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নিয়ে থাকে।
সংসদ বিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক নিজামউদ্দিন আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সংসদ সদস্যদের জন্য সংসদ ভবনে শপথ কক্ষ থাকে। তারা সেখানেই শপথ নেন। এইবার শুধু আলাদা জায়গায় হওয়ার কথা হচ্ছে।
“শপথ সাধারণত রাষ্ট্রপতি যেখানে থাকেন, সেখানে হওয়ার কথা। বঙ্গভবন বা রাষ্ট্রপতি ভবন যেটা। এটা কখনো এই দক্ষিণ প্লাজা বা বঙ্গভবনের বাইরে হওয়ার কোনো রেকর্ড শুনি নাই। সবাই এই শপথের জন্য রাষ্ট্রপতি ভবনেই গেছেন, যখন থেকে আমার মনে আছে। রাষ্ট্রপতি শপথ বাক্য পাঠ করান, রাষ্ট্রপতি কোথাও যাবেন না। রাষ্ট্রপতি যেখানে থাকবেন সেখানেই সবাই যাবে, এটাই রীতি।”
অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল রোববার সচিবালয়ে বলেন, “দক্ষিণ প্লাজায় শপথের বিষয়ে বিএনপিই অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিল। আমার ধারণা, এই সংসদটা একটু ভিন্ন। ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ এবং এই গণঅভ্যুত্থান অনেক ত্যাগ, কষ্ট ও বেদনার বিনিময়ে এই সংসদ পেয়েছি।
“এসব কারণে সংসদটি অন্য সব সংসদের চেয়ে ভিন্ন। এই সংসদ প্রাঙ্গণে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে। জুলাই সনদ ঘিরে যে অনুষ্ঠান, সেটাও এখানে আয়োজন করা হয়েছে। সুতরাং সংসদের দক্ষিণ প্লাজাটি বিভিন্ন কারণে আমাদের কাছে স্মরণীয়। এ সংসদের পাশেই বেগম খালেদা জিয়া এবং সবার প্রিয় আমাদের ওসমান হাদির জানাজা হয়েছিল।”
সিপিবির জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, অতীতের কোনো মন্ত্রিসভার সদস্য রাষ্ট্রপতি ভবনের বাইরে শপথ নেননি। তবে শপথ কোথায় নেওয়া হচ্ছে, তার চেয়েও মানুষের রাজনৈতিক শিক্ষা আর মৌলিক অধিকার জরুরি বলে মনে করেন প্রবীণ এই রাজনীতিক।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “না, আমার মনে পড়ে না। আমার তো সেরকম মনে পড়ছে না। কিন্তু এটার ব্যাপারটাই বা তেমন কী। মাথায় সোনার মুকুট পরে শপথ নিই, আর মাথায় কাঁটা মুকুট পরে যিশু খ্রিস্টের মতো শপথ নিই, তাতে কী আসে যায়? কী পলিসিতে দেশ চালাবে; সম্পদ গরিবের কাছ থেকে বড়লোকের কাছে হস্তান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে, নাকি সেখানে সাম্য ও ন্যায়বিচারের ধারায় অগ্রসর হবে, সেটা জরুরি।”