Published : 10 Apr 2026, 11:01 PM
রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের ষষ্ঠ তলার লিফটের দরজা খুলতেই দেখা গেল সামনের পুরো জায়গা জুড়ে বিছানা পাতা; ছোট ছোট শিশুদের কারো শরীরে চলছে স্যালাইন, কারো নাকে নল।
ওয়ার্ড আর বারান্দায় জায়গা না পেয়ে লিফটের সামনে ফাঁকা জায়গাটিতে শিশুদের নিয়ে আসন পেতেছেন অভিভাবকরা। অপরিষ্কার জায়গা আর দুর্গন্ধ ছড়ালেও উপায় না পেয়ে সেখানেই থাকছেন তারা।
ঢাকার মহাখালীর সাততলা বস্তির পাশে এ হাসপাতালটিতে শয্যা মোট ১০০টি। তবে শুক্রবার দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, রোগী ভর্তি প্রায় দেড়শ।
হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে রোগীর চাপ থাকলেও ছুটির দিনে চিকিৎসকদের দেখা না পাওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আর বর্জ্য অব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন অভিযোগ করছেন রোগীর স্বজনরা।
সাপ্তাহিক ছুটির দিনের দুপুরে হাসপাতালটির জরুরি বিভাগের সামনে দেখা যায় লম্বা লাইন। সেখানে কেবল একজন চিকিৎসক রোগী সামলাচ্ছিলেন।
হাসপাতালটিতে জলাতঙ্ক ও অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধির চিকিৎসা হলেও বেড়েছে হামের রোগী। ছুটির দিনে কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে দেখা যায়নি হাসপাতালটিতে। ফলে শুক্রবার হাম বা এর লক্ষণ নিয়ে সেখানে কতজন ভর্তি, সেই তথ্যও মেলেনি।

জরুরি বিভাগে থাকা উর্মি নামে এক চিকিৎসক বলেন, “আজ (শুক্রবার) কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তা নেই। আগামীকাল বা রোববারে আসলে এসব তথ্য জানতে পারবেন। আর সব রোগীদের ব্যাপারে আমারও জানা নেই।”
‘জায়গা না পেয়ে বারান্দায় এসেছি’
চাঁদপুর থেকে হামে আক্রান্ত মেয়েকে নিয়ে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এসেছেন সোহাগ প্রধান। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটমকে তিনি বলেন, “আমার মেয়ে ঈদের আগে থেকে অসুস্থ ছিল। শুরুতে স্ক্যাবিস ও অ্যালার্জি ছিল। কিছুদিন পর থেকে অনেক জ্বর ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।
“শুরুতে চাঁদপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে হাম হয়েছে বলে জানায়। তারপর তারাই ঢাকায় রেফার করে।”
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের রোগীর চাপ বাড়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “শুরুতে শিশু হাসপাতালে গিয়ে কোনো জায়গা পাইনি। পরে এখানে (সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল) এসেও জায়গা না থাকায় বারান্দায় বসেছি। কারণ বাচ্চাকে সুস্থ করে তুলতে হবে।
“তবে এখানে নিয়মিত ফ্লোর পরিষ্কার করা হয় না। আমরা নিজেরাই জায়গা একটু ভালো করে নিয়ে বিছানা পেতেছি।”

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের ষষ্ঠ তলার ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ২৯টি বেডের মধ্যে হামের জন্য ডেডিকেটেড ২৪টি। সেখানে দায়িত্বরত সিনিয়র এক স্টাফ নার্স ওয়ার্ড ও বারান্দা মিলে ৪২ জন হামের রোগী ভর্তি থাকার তথ্য দিয়েছেন।
হাসপাতালটির ষষ্ঠ তলায় বছর না পেরোনো মেয়েকে নিয়ে থাকছেন কেরাণীগঞ্জের অনিতা বর্মন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটমকে তিনি বলেন, “এক সপ্তাহ আগে প্রচণ্ড জ্বর ও গায়ে র্যাশ দেখা দেয় মেয়ের। শুরুতে দুদিন স্থানীয় ডাক্তারের চিকিৎসা নিয়ে গত বুধবার এখানে এসেছি।
“হাসপাতালে আসার পর কোনো বেড ফাঁকা ছিল না, তাই বারান্দায় বিছানা পেতে রয়েছি। যদিও এখানে থাকা খুব কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।”
আনিছুল হক নামে একজন বলেন, “নাতির জ্বর ও সর্দি কিছুদিন থেকে যাচ্ছেই না। বুধবার শরীরে র্যাশও দেখা যায়। তাই গতকাল (বৃহস্পতিবার) বাধ্য হয়ে এই হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। তবে এখানে কোনো বেড ফাঁকা নাই। ফলে বারান্দায় বেড করে চিকিৎসা নিচ্ছি।”

‘অপরিচ্ছন্নতা ও চিকিৎসক সংকট’
হাসপাতালটির নার্স ও চিকিৎসকরা বলছেন, সেখানে সকালে শিফটের তিনজন ও বিকালের শিফটে তিনজন করে চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করেন।
তবে এক রোগীর স্বজন বলেন, “আজ (শুক্রবার) সকালে ডাক্তার আসার কথা থাকলেও তিনি সম্ভবত আসেনি। সিনিয়র এক সিস্টার শুধু রাউন্ড দিয়ে সবাইকে দেখে গেছেন।”
আরেক রোগীর স্বজনও ডাক্তারের দেখা না পাওয়ার অভিযোগ করেন। বিকালের শিফটে তিনজন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও শুক্রবার বিকাল ৩টার দিকে দুইজন চিকিৎসককে দেখা গেছে।
জরুরি বিভাগের চিকিৎসক উর্মি বলেন, “আমাদের এখানে জনবল সংকট রয়েছে। এ ছাড়া ডাক্োররা সবাই ঠিকমতই আসেন।”
এদিন হাসপাতালটির মেঝেতেই মেডিকেল বর্জ্য ফেলে সেগুলো বাছাই করছিলেন বাচ্চু নামে পরিচ্ছন্ন কর্মী।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমি এভাবেই প্রতিদিন সব তলার এসব নিয়ে এসে বক্সে উঠাই। সকালে গাড়ি এসে এসব নিয়ে যায়।”
নাম প্রকাশ না করে একজন সিনিয়র নার্স বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের এখানে সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী এখন প্রতিদিন আসেন। ছাড়পত্র পেয়ে চলেও যান।
“অনেক রোগী যাওয়ার সময় তাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র ফেলে যান। আর একজন মাত্র ক্লিনার আছেন, যিনি দিনে দুই বেলা এসব পরিষ্কার করেন। আরো বেশি জনবল থাকলে হাসপাতালের অবস্থা আরো ভালো হবে।”
হাসপাতালের ফ্লোর পরিষ্কার করা হয় না অভিযোগ করে এক রোগীর স্বজন বলেন, “বাজে গন্ধও আসে, দেখার কেউ নাই। দুদিন আগে এখানে আসার পর বিষয়টি নার্সদের জানালে তাদের সঙ্গে আমার ঝগড়াও বাঁধে।”