Published : 28 Apr 2026, 01:48 PM
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় যুবদলকর্মী হত্যা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রায় জালিয়াতির অভিযোগসহ পাঁচ মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের জামিন বহাল রেখেছে আপিল বিভাগ।
এর আগে হাই কোর্ট তাকে এসব মামলায় জামিন দিয়েছিল। রাষ্ট্রপক্ষ সেই জামিন বাতিলের জন্য আপিল বিভাগে আবেদন করে।
রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের ওপর শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ৫ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ মঙ্গলবার তা খারিজ করে দিলে জামিন আদেশ বহাল থাকে।
তবে আরো দুটো মামলায় গ্রেপ্তার থাকায় এখনই কারামুক্ত হতে পারছেন না খায়রুল হক।
আদালতে খায়রুল হকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী কামরুল হক সিদ্দিকী ও মোতাহার হোসেন সাজু। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল জব্বার ভূঁইয়া।
শুনানিকালে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল জামিনের বিরোধিতা করে বলেন, “খায়রুল হকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রয়েছে। তাই তাকে জামিন দেওয়া সমীচীন হবে না। তদন্ত শেষ করতে আরও ছয় মাস সময় প্রয়োজন।”
উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আপিল বিভাগ জামিন স্থগিত চেয়ে করা রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনটি খারিজ করে দেয়।
খায়রুল হকের আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, “নিম্ন আদালতে আরও দুই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, যে কারণে তিনি এখনই মুক্তি পাচ্ছেন না।”
২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১১ সালের ১৭ মে পর্যন্ত দেশের ১৯তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এ বি এম খায়রুল হক।
তার নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ ২০১১ সালের ১০ মে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেয়, যার ফলে দেশে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবৈধ হয়ে যায়।
অবসরে যাওয়ার পর ২০১৩ সালের ২৩ জুলাই তাকে তিন বছরের জন্য আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। পরে কয়েক দফা তার মেয়াদ বাড়ানো হয়।
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ১৩ আগস্ট আইন কমিশন থেকে পদত্যাগ করেন খায়রুল হক। এরপর তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের হতে থাকে।
এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে খায়রুল হককে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ওইদিন রাতেই তাকে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে যুবদলকর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদকে হত্যার ঘটনায় ওই মামলা দায়ের করা হয়।
এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় ‘পরিবর্তন ও জালিয়াতির’ অভিযোগে ২০২৪ সালের ২৭ অগাস্ট শাহবাগ থানায় মামলা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন।
একই অভিযোগে এর আগে ২৫ অগাস্ট নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় আরেকটি মামলা করেন জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও ফতুল্লা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল বারী ভূঁইয়া।
এছাড়া ‘রায় জালিয়াতির’ অভিযোগে একই দিনে (২৫ অগাস্ট) নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানায় নুরুল ইসলাম মোল্লা নামে এক ব্যক্তি আরও একটি মামলা দায়ের করেন।
অন্যদিকে বিধিবহির্ভূতভাবে প্লট জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এসব মামলায় অধস্তন আদালতে জামিন নাকচ হওয়ার পর খায়রুল হক হাই কোর্টে আবেদন করেন। গত ৮ মার্চ বিচারপতি মো. খায়রুল আলম ও বিচারপতি মো. সগীর হোসেনের হাই কোর্ট বেঞ্চ তাকে চার মামলায় জামিন দেয়। এরপর ১১ মার্চ দুদকের মামলাতেও তিনি হাই কোর্ট থেকে জামিন পান।
হাই কোর্টের দেওয়া সেসব জামিন আদেশগুলো স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করেছিল রাষ্ট্রপক্ষ, যা মঙ্গলবার খারিজ হয়ে গেল।
এদিকে হাই কোর্টে পাঁচ মামলায় জামিন হওয়ার পর জুলাই আন্দোলনের সময়কার আরো দুই হত্যা মামলায় ৩০ মার্চ তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এর মধ্যে যাত্রাবাড়ী থানায় একটি মামলা হয় মাদ্রাসা ছাত্র মো. আরিফ নিহতের ঘটনায়। ওই মামলায় খায়রুল হককে গত ১০ মার্চ গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার এসআই মাহমুদুল হাসান।
একই দিনে আদাবর থানায় দায়ে করা পোশাক শ্রমিক রুবেল হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ টিপু সুলতান।
দুই আবেদনের শুনানি করে ৩০ মার্চ ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন।