ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ দুই প্রবেশ পথ যাত্রাবাড়ী ও গাবতলী দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। ভোগান্তিতে পড়েছেন চলতি পথের যাত্রীরা।
Published : 16 Feb 2025, 10:23 AM
মিটারের ভাড়ার অতিরিক্ত আদায় করলে জেল জরিমানার নিয়ম বাতিলের দাবিতে ধর্মঘটে নামা সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকরা রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সড়ক আটকে বিক্ষোভ করছেন।
রোববার সকাল থেকে তাদের অবরোধের কারণে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ দুই প্রবেশ পথ যাত্রাবাড়ী ও গাবতলী দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে এমন অবরোধের কারণে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়েছে বিভিন্ন সড়কে। তাতে ভোগান্তিতে পড়েছেন চলতি পথের যাত্রীরা।
সকাল ৯টার দিকে ঢাকার বাসাবো বৌদ্ধ মন্দির এলাকায় প্রায় দশ মিনিট সড়ক অবরোধ করেন অটোরিকশা চালকরা। এ সময় অন্য যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
চালকদের একজন রুহুল আমিন বলেন, "এখন যে অবস্থা, তাতে মিটারে চালাইলে আমাদের পোষায় না। এই কারণে আমরা মিটারে চালাব না। বিআরটিএ এর সিদ্ধান্ত আমরা মানি না।"
গত ১০ ফেব্রুয়ারি বিআরটিএ পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) শীতাংশু শেখর বিশ্বাসের সই করা একটি বিজ্ঞপ্তি ঢাকার পুলিশ কমিশনারের দপ্তরে পাঠানো হয়।সেখানে বলা হয়, গ্যাস বা পেট্রলচালিত ফোর স্ট্রোক থ্রি-হুইলার অটোরিকশার জন্য সরকার নির্ধারিত মিটারের ভাড়ার হারের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে মামলা করার ‘নির্দেশক্রমে অনুরোধ’ করা হল।
২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের ৩৫(৩) ধারা মনে করিয়ে দিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কোনো কন্ট্রাক্ট ক্যারিজের মালিক বা চালক রুট পারমিট এলাকার মধ্যে যে কোনো গন্তব্যে যেতে বাধ্য থাকবেন। মিটারে প্রদর্শিত ভাড়ার অতিরিক্ত অর্থ দাবি বা আদায় করতে পারবেন না। এ নিয়ম ভাঙলে আইনের ৮১ ধারা অনুযায়ী অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক এক পয়েন্ট কাটার বিধান রয়েছে।
বিআরটিএ পুলিশকে মামলা করার নির্দেশ দেওয়ার পর আন্দোলনে নামেন ক্ষুব্ধ অটোরিকশা চালকরা। রোববার সকাল থেকে শুরু হয় তাদের ধর্মঘট। এদিন বিআরটির চেয়ারম্যানের বরাবরে স্মারকলিপি দেওয়ারও কথা রয়েছে তাদের।
সড়ক অবরোধের ঘোষণা না থাকলেও সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ঢাকার শনির আখড়া, ধোলাইপাড়, গোলাপবাগ, ডেমরা, রামপুরা, কলেজগেট, আগারগাঁও, মিরপুর, মাজার রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশা চালকদের সড়ক অবরোধের খবর পাওয়া গেছে।
যাত্রাবাড়ী থানার ওসি কামরুজ্জামান তালুকদার জানান, সকাল সাড়ে ৮টার পর থেকেই সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালকরা শনির আখড়া এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবস্থান নিতে শুরু করে। এক পর্যায়ে সেখানে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
“শনিরআখড়া ও গোলাপবাগসহ কয়েকটি এলাকায় চালকরা সড়কে অবস্থান নিয়েছে। তার ফলে যাত্রাবাড়ী এলাকা হয়ে ঢাকায় কোনো যানবাহন প্রবেশ করতে পারছে না। ঢাকা থেকে কোনো যানবাহন বের হতেও পারছে না। আমরা তাদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরানোর চেষ্টা করছি।"
একই থানার এএসআই মো. শহীদ হোসেন বলেন, "রায়েরবাগ, ডেমরা রোডেও অবস্থান নিয়েছেন সিএনজি চালকরা। যাত্রাবাড়ী হয়ে ঢাকার সঙ্গে বাইরের প্রায় সকল পথই বন্ধ রয়েছে।"
ধোলাইপাড় এলাকায় অটোরিকশা চালকদের অবরোধের কারণে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন শ্যামপুর থানার ওসি মো. শহীদুল ইসলাম।
তিনি বলেন, "সড়কের দুই পাশেই যান চলাচল বন্ধ।"
যাত্রাবাড়ীতে দেখা গেল মানুষ দূরপাল্লার বাস থামিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। কোনো রকমে গুলিস্তানে পৌঁছাতে চাইছেন তারা।
সকাল ৯টা থেকে ঘণ্টাখানেক কাজলা মোড়ে দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো মোটরসাইকেল ভাড়া করতে পারেননি আবু তালেব। দুয়েকটা ভাড়ার মোটরসাইকেল পেলেও মহাখালীর ভাড়া চাইছিলেন ৮০০ টাকা, যেখানে অন্য সময় ৩০০-৩৫০ টাকায় যাওয়া যায়।
পরে পাটুরিয়ার একটি বাসে কোনোমতে ঝুলে গাবতিলির ভাড়া দিয়ে তিনি চানখার পুল নামেন।
অটোরিকশা চালকদের অবরোধের কারণে রামপুরা এলাকায় সড়ক বন্ধ থাকার তথ্য দিয়েছেন রামপুরা থানার ওসি আতাউর রহমান আকন্দ।
তিনি বলেন, "রামপুরা বেটারলাইফ হাসপাতালের সামনে সকাল ৭টার পর থেকেই তারা জড়ো হয়। ঘণ্টাখানেক আমরা তাদের আটকে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছি। এখন রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ।"
শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মোহাম্মদ গোলাম আজম বলেন, "কলেজগেট এলাকায় সোহরাওয়াদী হাসপাতালের সামনের দুই পাশের সড়কই বন্ধ করে দিয়েছে সিএনজি চালকরা। ঢাকার অন্যান্য এলাকায়ও অবরোধের খবর আসছে।"
মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে সড়ক অবরোধের কথা জানিয়েছেন পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ মাকছুদের রহমান।
তিনি বলেন, "মিরপুর-১৪ নাম্বারে বিআরটিএ অফিসের সামনে, দারুস সালামের গাবতলী মাজার রোড, ভাসানটেক এলাকায় সড়কে তারা নেমেছিল। কয়েকটা জায়গায় তারা কিছুক্ষণ অবস্থান নিয়ে বক্তব্য দিয়ে সড়ক ছেড়ে দিয়েছে।"
ঢাকার মিরপুরের অটো রিকশাচালক হযরত আলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "মিটারে না গেলে জরিমানা করবে পুলিশ। জেলে দেওয়ার কথাও বলতেছে। এইজন্য আজ ধর্মঘট। গাড়ি বাইর করি নাই।"
গাবতলী মাজার রোডের সেকেন্ড কলোনির বাসিন্দা ভাড়ার গাড়িচালক আশরাফ আলী জানান, সকালে অটেরিকশা চালকরা মাজার রোড এলাকায় অবরোধ করে পুরা গাবতলী অচল করে দেয়। ফলে ঢাকার দিকে কোনো গাড়ি ঢুকতে পারছে না।
অটোরিকশা চালকদের নেতা মো. দুলাল বললেন, তারা মহল্লা ও এলাকাভিত্তিক আন্দোলন করছেন। যার যেখানে স্ট্যান্ড তারা সেখানেই কর্মসূচি শুরু হচ্ছে।
আগারগাঁওয়ে পথ আটকে অটোরিকশা চালকদের আন্দোলনে শামিল করতে দেখা গেল কয়েকজন চালককে। তারা সেখানে যাত্রী নামিয়ে দিয়ে অটোরিকশাগুলোকে একপাশে জড়ো করছিলেন।
সেখানকার নেতা মোহাম্মদ দুলাল বললেন, "আমরা কই থিকা এই জেল জরিমানার টাকা দিমু। মালিকেরা জমা কমায় না, সংসার খরচ বাড়তি ড্রাইভাররা কই থিকা এই টাকা যোগাড় করব।"
একটি অটোরিকশায় মাকে নিয়ে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে যাচ্ছিলেন নাহিদুজ্জামান। তাকে আগারগাঁও বিজ্ঞান জাদুঘরের সামনে নামতে বাধ্য করা হয়।
নাহিদুজ্জামান বলছিলেন, “আমার মা হাঁটতে পারে না। সামান্য একটু রাস্তা, আপনারা যেতে দিন। পরে অটোরিকশা চালকেরা তাকে একটি রিকশা ডেকে দেন।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বাংলাদেশ অটোরিকশা, হালকা যান পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক রোববার সকালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রোববার বিআরটিএতে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি আছে। রাস্তা বন্ধ করার কথা না।
"চালকরা গাড়ি বন্ধ রেখে বিআরটিএ-তে স্মারকলিপি দিতে আসবে। আসার সময় হয়ত রাস্তায় কোথাও তারা অবস্থান করেছে। আমরা বেলা ১১টায় বিআরটিএ এর সিদ্ধান্ত বাতিল করার জন্য স্মারকলিপি দেব।"