Published : 02 May 2026, 10:16 PM
সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট সাময়িকভাবে কিছুটা সামাল দেওয়া গেলেও আন্ত জ্বালানি মজুদের সক্ষমতা নিয়ে সতর্কবার্তা এসেছে ঢাকায় আয়োজিত একটি ওয়েবিনার থেকে।
শনিবার আয়োজিত এই ওয়েবিনারে বর্তমান জ্বালানি সংকটের নানা দিক উঠে এসেছে জ্বালানি, কৃষি, ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের বক্তব্যে।
জ্বালানি পণ্য বিপণন কোম্পানি ট্রেড সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহমুদুল হক বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের সামান্য পরিবর্তনও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করছে।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার, পিপিআরসি আয়োজিত ‘আজকের এজেন্ডা: জ্বালানির ফাঁদে বন্দি অর্থনীতি?’ শীর্ষক ওয়েবিনারে তিনি বলেন, “আর্ন্তজাতিকভাবে প্রতি ব্যরেলে ৫ ডলার করে বাড়লে আমাদের ৪০০-৫০০ ডলার বেড়ে যায়। এই বাড়তি আর্থিক চাপ পুরো জাতীয় অর্থনীতির ওপরই আসলে পরার কথা। এটাকে খেয়াল রেখে আমাদের বিকল্পগুলো চিন্তা করতে হবে।”
মাহমুদুল হকের মতে, জ্বালানির উৎসের বৈচিত্র্যকরণ এখন জরুরি।
তিনি বলেন, “আমাদের তো আগে ‘মিডল ইস্টে’ ছিল, কিন্তু এখন অন্য জায়গাতেও সেই ‘সোর্সিংটা’ বাড়ানো যায় কিন না।”
অনলাইনভিত্তিক এই আলোচনা অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান।
পাম্পে ভিড়, ‘প্যানিক বায়িং’
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, যুদ্ধ শুরুর কয়েকদিন পর থেকেই পাম্পগুলোতে চাপ বাড়তে থাকে।
তিনি বলেন, “(মার্চের) চার তারিখ থেকে আমাদের পাম্পগুলোতে হুমড়ি খেয়ে সব লোকজন পড়লেন। গাড়ি, মোটরসাইকেল দীর্ঘ লাইন...আমরা যে সাধারণত আমাদের স্বাভাবিক সময়ে যে বিক্রি তার প্রায় আড়াই গুণ হয়ে গেল।”
নাজমুল হক বলেন, শুরুতে এটি ছিল পুরোপুরি ‘প্যানিক বায়িং’; পরে রেশনিংয়ের আলোচনা এবং দাম বাড়ার আশঙ্কায় ‘হোল্ডিং টেন্ডেন্সি’ তৈরি হয়। মোটরসাইকেল চালকেরা ট্যাংক ভরে তেল নেওয়ার পর আবার ফিরেও আসছিলেন, আবার বিভিন্ন দোকানে খুচরা বিক্রির জন্যও তেল মজুদ করা হচ্ছিল।
তিনি বলেন, “আমি বলতেছিলাম যে সাপ্লাই বাড়াতে হবে।”
তার দাবি, দাম বাড়ানোর পরও লাইন কমেনি; কিন্তু পরে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের সরবরাহ বাড়ানোর পর পরিস্থিতি উন্নত হয়।
তবে তিনি জানান, ঢাকার চিত্র বদলালেও বাইরে এখনও চাপ রয়ে গেছে। “ঢাকার বাইরে... লাইন আছে। কিছু কমেছে।”
‘মজুদ সক্ষমতা বড় সীমাবদ্ধতা’
পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও সাবেক জ্বালানি সচিব এ কে এম জাফরুল্লাহ খান বলেন, সংকটের পেছনে কয়েকদিনের ‘মিসম্যানেজমেন্ট’ কাজ করেছে। চাহিদা বেড়ে যাওয়া, একই যানবাহনের বারবার তেল নেওয়া, কোথাও কোথাও কালোবাজারির প্রবণতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় চাপ মিলেই পরিস্থিতি জটিল হয়।

তিনি বলেন, “আমাদের মজুদ ক্ষমতা কি পরিমাণ আছে, কত দিনের জন্যে আমরা মজুদ রাখতে পারি এই প্রশ্নটা উঠছে। জ্বালানির এই দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করে আজ হোক কাল হোক বাড়াতেই হবে, আর এই প্রক্রিয়া চলবেই। কিন্তু যতই দাম বাড়ুক বা কমুক, আমাদের দরকার নিরবিচ্ছিনভাবে সরবরাহ করা।”
তার মতে, ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা। আর সেজন্য মজুদ সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয় রিফাইনারি ইউনিট দ্রুত চালু করার কথাও বলেন তিনি।
কৃষিতে ডিজেলের চাপ বাড়ছে
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এম এ সাত্তার মণ্ডল বলেন, কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ বাড়ায় ডিজেলের ওপর নির্ভরতা দ্রুত বাড়ছে। সেচ ছাড়াও নানা কৃষিযন্ত্রে ডিজেল লাগে।
তিনি বলেন, “প্রায় ৪২ লক্ষ ডিজেল ইঞ্জিন কৃষিতে বিভিন্নভাবে, কেবল সেচ নয়, কৃষি সেক্টরে এমন ছোট বড় ইঞ্জিন চলছে। আমি মনে করি আগামী দিনে কৃষি খাতে এসব যন্ত্রের সংখ্যা বাড়বে এবং ওই অনুপাতে ডিজেলের চাহিদাও বাড়বে ও ব্যবহারও বাড়বে।”
শিল্পে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি দরকার
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আনোয়ার উল আলম পারভেজ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত নীতির ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, “আমি মনে করিযে, আগামীতে ইরান ও ইউএস এর যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদে চলে যাচ্ছে, এবং বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি খাতকে নিরাপদ করার জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি নীতি নিতে হবে।”
কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র, গ্যাস সরবরাহ, সার উৎপাদন ও শিল্পের সক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনার কথাও বলেন তিনি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও গ্যাস কূপ খননে জোর
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক সমাধানের পথ হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং গ্যাস কূপ খননের ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, “আমাদের এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসগুলো কাজে লাগাতে হবে। আর গ্যাসের ক্ষেত্রে কুপ খননে জোর দিতে হবে।”
‘মধ্যমেয়াদি কার্যক্রম জোরালো না হলে সংকট ফিরবে’
সমাপনী বক্তব্যে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সংকটকে শুধু তাৎক্ষণিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি মধ্যমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমাদের আলোচনায় উঠে এসেছে যে বর্তমানে জ্বালানির সংকট চলছে, যা আমরা মোকাবেলাও করছি, কিন্তু সেই সাথে ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া, সার্বিকভাবে আমদানি ইত্যাদি যদি আমরা মধ্যমেয়াদি কার্যক্রম আরো জোড়ালোভাবে করতে না পারি তবে এ সংকটটা আরো গভীরভাবে থেকে যাবে। হয়ত বার বার ফিরেও আসবে।”