Published : 09 Dec 2025, 03:31 PM
আন্দোলন, ভবন ঘেরাও, সড়কে জ্বালাও পোড়াওয়ের পরও অননুমোদিত মোবাইল ফোন বন্ধ করার সিদ্ধান্তে অটল অবস্থানে আছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।
বিটিআরসির সঙ্গে মঙ্গলবারের বৈঠক ফলপ্রসু হয়নি বলে জানিয়েছেন গ্রে মার্কেটের মোবাইল ব্যবসায়ীরা। তার চান বিদেশ থেকে পুরনো ফোন আমদানি করতে; আর বিটিআরসি জানিয়ে দিয়েছে এ বিষয়ে তাদের নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেই।
দেশের অননুমোদিত মোবাইল আমদানিকারক ও বিক্রেতা এই ব্যবসায়ীরা রোববার প্রায় ১০ ঘণ্টা আগারগাঁওয়ের সড়কটি আটকে রেখে বিক্ষোভের পর মঙ্গলবার তাদের সঙ্গে সভা করার সিদ্ধান্ত দেয় বিটিআরসি।
মঙ্গলবার বেলা ১১ টায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি ভবনে শুরু হওয়া ওই বৈঠকে গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীদের সংগঠন মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশের (এমবিসিবি) ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেয়।
এই সভাকে ঘিরে বেলা ১১ টার আগে থেকেই বিটিআরসি ভবনের আশপাশে জড়ো হন মোবাইল ব্যবসায়ীরা। প্রায় তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বিটিআরসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বের হয়ে এসে মোবাইল ব্যবসায়ী নেতারা জানান বৈঠক ফলপ্রসু হয়নি।
তাদের মুল এজেন্ডা ছিল ব্যবহৃত ফোনের অনুমোদন আদায়, সে বিষয়টিতে বিটিআরসি মোটেও কর্ণপাত করেনি বলেও অভিযোগ করেন তারা।
বৈঠক শেষে ভবনের বাইরে এসে সাংবাদিকদের মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশের সহ-সভাপতি শামিম মোল্লা বলেন, “আমাদের দাবি কর্ণপাত করে নাই, আমাদের দাবি কেউ আমলে নেয় নাই। আমাদের কথা তারা বুঝে, বলার আগেই বুঝে, কিন্তু না বোঝার ভান করে। এই ভান করাটা আমরা নিতে পারছি না।”
বুধবার এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক আছে জানিয়ে সে পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন শামীম মোল্লা।
তিনি বলেন, “আপনারা কালকে পর্যন্ত শান্ত থাকেন, তারা আমাদের চোখের পানির দাম তারা দেয় নাই। আগামীকালের মিটিং পর্যন্ত আপনারা শান্ত থাকেন।”
মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশের সভাপতি মোহাম্মদ আসলাম বলেন, “আজকে আমরা যারা বিটিআরসির ডিজির সাথে বসেছি, আমাদের একমাত্র এজেন্ডা ছিল ইউজ ফোন। আমরা বলেছি, এদেশে ৭০-৭৫ শতাংশ মানুষ ইউজড ফোন কেনে, ব্যবহার করে আবার বিক্রি করে বা এক্সচেঞ্জ করে। আমরা বারবার বলেছি এই ফোন গুলোকে ক্লোন, কপি ও রিফারবিশড বলে কালিমা লেপন করছেন আপনারা। আমরা ক্লোন-কপি বেচি না, আমরা যে মালটা বিক্রি করি সেটা ধনী দেশের মানুষেরা ছেড়ে দেয়, আমরা সেটা দেশে নিয়ে এসে বিক্রি করি।
“আমরা বলেছি, আপনি বাণিজ্য নীতি যতই সহজ করেন না কেন আমাদের ইউজড ফোনের বাণিজ্য করতে দিতেই হবে। বিটিআরসি বলেছে আপাতত সেকেন্ড হ্যান্ড ফোন নিয়ে তাদের প্রিপারেশন নাই। আমরা বলেছি যেহেতু তারা এনইআইআর চালু করার জন্য নতুন ফোনের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন, পুরাতন ফোনের জন্য যে ইকুইপমেন্ট লাগে সেটার টাকা আমরা সারা দেশের ব্যবসায়ীরা সেই টাকা দিবো।”
সরকারের পক্ষ থেকে বারবারই বলা হচ্ছে, কোনো নজরদারি না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসায়ীরা ‘চোরাই, নিম্নমানের ও পুরনো ফোন রিফারবিশ করে’ বাজারে নতুন করে বিক্রি করছেন। এগুলো গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা। সরকারের এসব অভিযোগ ব্যবসায়ীরা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করলেও এখন তারা বলছেন বিদেশ থেকে পুরনো ফোন আমদানির সুযোগ দিতেই হবে।
বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এনবিআরের সাথে 'শেষ বৈঠক' জানিয়ে এর পরে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মোহাম্মদ আসলাম।
আগামী ১৬ ডিসেম্বর দেশে কার্যকর হতে যাচ্ছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্ট্রার বা এনইআইআর। মোবাইল হ্যান্ডসেট নিবন্ধনের এই বাধ্যবাধকতা কার্যকর হওয়ার পর কেবল সরকার অনুমোদিত বৈধ হ্যান্ডসেটই নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকতে পারবে।
তবে ১৬ ডিসেম্বরের আগে নেটওয়ার্কে সচল থাকা কোনো হ্যান্ডসেটই বন্ধ করা হবে না বলে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে।
আর মাত্র আট দিন বাকি থাকলেও এখনো সরকারের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় আসতে পারেননি হ্যান্ডসেট বাজারের বড় অংশীদার ‘গ্রে মার্কেটে’র ব্যবসায়ীরা।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মোবাইল আমদানিতে শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে তার পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, কয়েকশ কোটি টাকার অবিক্রিত ফোন রয়েছে তাদের হাতে। পুরনো ফোনের যে ব্যবসা তারা এতদিন ধরে রমরমা চালিয়ে এসেছেন সেটিও ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছে বলে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
সরকারি হিসেবেই দেশের বর্তমান হ্যান্ডসেটের বাজারে গ্রে মার্কেটের হিস্যা ৬০ শতাংশের বেশি। আর গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা বলে থাকেন, তাদের হিস্যা ৯০ শতাংশের বেশি।
দেশে স্মার্টফোন আসার পর থেকে গত এক যুগের বেশি সময় ধরে সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নাকের ডগায় গড়ে ওঠা এই বাজার এখন বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। ঢাকা শহরে বড় বড় সব বিপণী বিতানে রয়েছে তাদের সুসজ্জিত ‘শো রুম’।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও এনইআইআর চালুর চেষ্টা করে পরে পিছু হটে টেলিকম খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। এবারও সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় মাঠে নেমেছে ‘গ্রে মার্কেট’।
তাদের ভাষ্য, ‘গুটি কয়েক লোককে সুবিধা দিতে’ গ্রে মার্কেটের কয়েক লাখ লোকের রুজি-রুটি নিয়ে টান দিচ্ছে সরকার। গ্রে মার্কেটে ‘টানা পার্টির’ হ্যান্ডসেটের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে দেশের বাজারে দাম বেড়ে যাওয়াসহ ‘মনোপলি’র শঙ্কাও করছেন এনইআইআর এর বিরোধিতাকারী গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা।
অন্যদিকে বিটিআরসি এবার এনইআইআর চালু করতে জোট বেঁধেছে দেশীয় মোবাইল ফোন উৎপাদনকারীদের সঙ্গে। মোট ১৭টি কোম্পানি এখন দেশে ফোন তৈরি করছে। তাদের কাছ থেকেই টাকা নিয়ে এই দফায় এনইআইআর বাস্তবায়নে নেমেছে সরকার।
সরকার ও দেশীয় উৎপাদনকারীদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা যেন বৈধ পথে মোবাইল আমদানি করতে পারে, সেই সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হবে। পাশাপাশি দেশের বাজারে এরই মধ্যে যে ফোনগুলো এসেছে, সেগুলো বৈধ করার ব্যবস্থা করা হবে।